০২.
ছোটসাহেবের খাটের নীচে অনেকগুলো প্ল্যাকার্ড। চারফুট কাঠের খুঁটিতে নানা রকম ঘোষণা:
(১) সস্তায় কালো মেঘেদের আড়ং ধোলাই করে সাদা করা হয়। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
(২) উচিত মূল্যে সাদা, কালো, ডোরাকাটা, ছাড়া ছাড়া বাচ্চা মেঘ বিক্রয়। গ্যারান্টি এক বছর।
(৩) বৃষ্টিভেজা রোদ প্রতি এক হাজার বর্গফুট একশো টাকা। আশ্বিন মাসে শতকরা পঁচিশ টাকা কমিশন।
এই রকম সব পোস্টার বা প্ল্যাকার্ড, এগুলো আসলে সবই বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপনের পিছনে একটা কারণ আছে।
মাসখানেক আগে ভাঁড়ার ঘরে মাটির জালা থেকে রান্নার চাল বার করতে গিয়ে দুর্গারানী দেখে মা লক্ষ্মী প্রায় বাড়ন্ত, যার অর্থ হল খাওয়ার চাল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।
এদিকে তখনও ভাদ্র মাস পড়েনি। তারপরে আশ্বিন আছে, কার্তিক আছে, তারপর মাঠের ধান উঠবে গোলায়। অবশ্য দুর্গারানীর সংসারী বুদ্ধি ভালই আছে। বাড়ির চারপাশে পুরনো কালের অনেকগুলো নারকেল গাছ আছে। সেগুলো থেকে নারকেল পাড়িয়ে পুজোর বাজারে বেচলে ভাল দাম পাওয়া যায়। তা দিয়ে চাল কেনা যাবে। কিন্তু সেখানে ছোটসাহেবের বাধা রয়েছে।
গাছ থেকে নারকেল কাটায় ছোটসাহেবের খুব আপত্তি। কারণ এই নারকেলের লোভ দেখিয়েই আকাশের এ মাথা ও মাথা থেকে লোভী মেঘদের তিনি ডেকে আনেন। নারকেল না থাকলে তারা আসবে না।
গত বছর নারকেল বেচা নিয়ে খুব চেঁচামেচি হয়েছিল। ফুচু মানে ছোটসাহেবকে কোলেপিঠে করে বড় করেছে দুর্গারানী। এই এতখানি বয়েসেও কিন্তু সে পুরোপুরি সাব্যস্ত মানুষ হয়নি। তার ইচ্ছে করে না ফুচুর সঙ্গে ঝগড়া করতে। না হলে ঝগড়া করতে দুর্গারানী কখনও পিছ-পা নয়, এ গাঁয়ের সাতপাড়ার লোক সেটা জানে।
আর ঝগড়া করেই সে এই চৌধুরী বাড়ির চৌহদ্দি, নারকেল গাছ, ফলের বাগান, ভদ্রাসন এমন। কী অবশিষ্ট জোতজমি এতদিন রক্ষা করেছে। গোপালগ্রামের পাঁচজনে জানে দুর্গারানী না থাকলে চৌধুরীদের ছোটসাহেব কবে ইছামতীর গাঙের জলে ভেসে যেত।
সুতরাং দুর্গারানী ঠিক করেছে এবার নারকেল বেচা বাদ যাক। মজা পুকুর পাড়ে একটা আদ্যিকালের বুড়ো কাঁঠাল গাছ আছে। এখন ভাল করে কাঁঠালও আসে না। কঁঠালের মুচি কালো হয়ে শুকিয়ে পড়ে যায়। সেই গাছটা দরকার হলে বেচবে। আজকাল কাঁঠাল কাঠের খুব দাম।
এ বাড়িতে অবশ্য পুরনো আমলের খাট-পালঙ্ক, চেয়ার-টেবিল অনেক রয়েছে। সবই মেহগনি বা শাল কঁঠালের মতো দামি এবং একালে দুষ্প্রাপ্য কাঠের।
এ ছাড়াও আছে তামার পুজোর বাসান, খোদ বেনারসের। আর ইসলামপুর, খাগড়া আর কাগমারির কাঁসা পিতলের থালা-বাটি, গেলাস কলসি, পানের ডাবর, হুঁকোর ঘটি? অনেক রয়েছে। কাঠের সিন্দুকে সব থরে থরে সাজানো আছে।
টুকটুক করে, একটা দুটো করে এসব জিনিস চুরিও যাচ্ছে। কিন্তু প্রাণ থাকতে, নিজের হাতে। দুর্গারানী এসব বেচবে না, কারণ সে নিজের চোখে এ বাড়িতে এসবের ব্যবহার দেখেছে। তার কেমন একটা ভুল ধারণা, আবার হয়তো কোনও সময় খুব হইচই হবে, লোকজন, ভুচুর বউ, ফুচুর বউ, তাদের ছেলেমেয়ে, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনে ভর্তি হয়ে আবার বাড়ি গমগম করবে।
কিন্তু এসব কবে হবে দুর্গারানী তা ভাবতে পারে না। এ ব্যাপারে ছোটসাহেবের দায়িত্ব তো কিছু কম নয়। এই যে চাল ফুরিয়ে গেছে, ছোটসাহেবের তো কিছু করা উচিত। সে-ই বাড়ির কর্তা, তাকেই তো করতে হবে। বাড়িতে কম করেও পাঁচটা মুখ। ছোটসাহেব, দুর্গারানী, দুটো কুকুর, আর বাজারের এক ভিখিরি রাতে বারান্দায় শোয়। তাকেও দুবেলা খেতে দিতে হয়।
ছোটসাহেবকে দুর্গারানী ধরল, ভাঁড়ারে চাল ফুরিয়েছে।
অবস্থাটা বিপজ্জনক বুঝে ওড়ানোর চেষ্টা করলেন ছোটসাহেব, তার আমি কী করব?
দুর্গারানী বলল, তুমি করবে না তো কে করবে? তোমারই বাড়ি। তুমিই বাড়ির কর্তা।
ঘাড় চুলকিয়ে ছোটসাহেব স্বীকার করলেন, সেটা ঠিক, কিন্তু এ সম্বন্ধে আমি কী করতে পারি?
দুর্গারানী বলল, উপার্জন।
ছোটসাহেব আকাশ থেকে পড়লেন, উপার্জন? আমি কী করে উপার্জন করব? আমি তো কোনও কাজ পারি না। কিছুই জানি না।
তুমি শুধু মেঘ চরাতে জানো। এই কথা বলে গজগজ করতে করতে দুর্গারানী ছুতোর পাড়ার দিকে চলে গেল কাঁঠালগাছটা বিক্রির ব্যবস্থা করতে।
মেঘ চরাবার কথাটা কিন্তু ছোটসাহেবের মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। সত্যিই তো, আর কিছু না হোক আমি তো মেঘের ব্যবসা করতে পারি।
তারপর গত একমাস ধরে ছোটসাহেব বসে বসে কাঠের খুঁটিতে হেঁচা বাঁশের বেড়ার টুকরো কেটে কেটে লাগিয়ে এই প্ল্যাকার্ডগুলো বানিয়েছেন। বাজার থেকে ফুলস্ক্যাপ কাগজ কিনে এনে আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছেন, তারপর লালনীল কালি দিয়ে একের পর এক মেঘের বিজ্ঞাপন লিখেছেন। তার হাতের লেখা চমৎকার। বড় বড় হরফে প্ল্যাকার্ডে ফুটে উঠেছে:
যদি চাই ছোট মেঘ,
নাই কোনও উদ্বেগ।
সস্তায় ঝুড়ি ঝুড়ি,
আশি টাকা এক কুড়ি।
ছোট মেঘের বিজ্ঞাপন এরকম হালকা ভাষায় লেখা। হালকা জিনিস, সস্তা দাম।
বড় মেঘ একেকটার দাম হাজার টাকা। এর বিজ্ঞাপনটা গুরুগম্ভীর ভাষায় অনেক মাথা খাটিয়ে ছোটসাহেবকে রচনা করতে হয়েছে:
প্রকৃত বড় মেঘ পূজা মণ্ডপের সামিয়ানার চেয়েও
বৃহৎ আকারের। প্রতিটির মূল্য দুই হাজার টাকা।
