এদিকে ছাদের নীচে ঠাকুরদালানের বাগানে শ্বেতকাঞ্চন আর টগরের সাদা ফুল থই থই করছে। ঘোর বর্ষার শেষে শ্বেত গন্ধরাজ ফুলের ঝাড়ে হঠাৎ রীতিমতো হইচই, কয়েকশো গন্ধরাজ ফুটেছে, তার সৌরভ এই খোলা ছাদে ছড়িয়ে পড়েছে।
দূরে হাটখোলার অশ্বত্থ গাছের দুটো বড় ডালের ফাঁক দিয়ে সূর্য উঠে এসেছে। আবছা গোলাপি বর্ণের রোদ আস্তে আস্তে সাদা হচ্ছে।
দুর্গারানী এত শত বোঝে না, বোঝার দরকারও নেই। কিন্তু সে বুঝতে পারে বর্ষাকালের শেষে এটা একটা আশ্চর্য সকাল।
আরেকটা ব্যাপার হয়েছে।
দুর্গারানী আজ তার বদ্ধমূল ধারণা বদল করতে চলেছে। মেঘ বাতাস-রোদ ওসবের ওপর ছোটসাহেবের ক্ষমতা জারির ব্যাপারটা সে পাগলামি বলেই এতকাল মনে করেছে। আজ বর্ষা শেষের এই সুনীল সুপ্রসন্ন ভোরবেলা তার মনে হল ছোটসাহেব ভুল বলেনি। যা বলেছিল, আজ সকালে অন্তত অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে।
অবশ্য ছোটসাহেবের পাগলামির কম দাপট এতকাল তাকে সামলাতে হয়নি।
কী খটমট সব মন্ত্র ছোটসাহেবের, সেগুলো দুর্গারানী মনে রাখতেও পারে না, বলতেও পারে না, কিন্তু না বললে চলবে না।
গত সপ্তাহে একদিন ভরদুপুরবেলা ঝমঝম করে বৃষ্টি এল। ছোটসাহেব দালানের বড় ঘরের খাটে গা এলিয়ে শুয়ে আছেন। সারা সকাল প্রচুর ধকল গেছে তার, গোটা দশেক অবাধ্য দেবদারু চারাকে উঠ-বোস করিয়েছেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে দেখলেন ঝমঝম বৃষ্টি নেমেছে। এই সময়ে বৃষ্টি নামাটা ছোটসাহেবের মোটেই পছন্দ হয়নি। দেবদারুর বাচ্চাগুলোকে শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন আছে, কঠোর রোদে ওগুলোকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। অসময়ে বৃষ্টি এসে তাও সব ভেস্তে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে দুর্গারানীকে তলব। সবে সে ভাতঘুমে মাদুরের ওপরে কাত হয়ে পড়েছিল। তাকে বলা হল, মন্ত্র বল। আর সে যে কী মন্ত্র!
রসগোল্লা চমচম।
যায় রে বৃষ্টি ঝমঝম ॥
রসগোল্লা চমচম।
যায় রে বৃষ্টি কমকম ॥
রসগোল্লা চমচম।
আয় রে রোদ গমগম ॥
রসগোল্লা চমচম।
ছোটসাহেব মেঘের যম ॥
রসগোল্লা চমচম।
মেঘের বংশ হল খতম ॥
দুর্গারানীর গেঁয়ো উচ্চারণে এই দারুণ পদ্য সাপুড়ের সাপ খেলানোর কিংবা ওঝার ভূত নামানোর মন্ত্রের মতো শোনাচ্ছিল।
কিন্তু সেদিন কিছুতেই কিছু হয়নি। মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে দুর্গারানীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। একশো আটবার মন্ত্র পড়তে হয়েছিল তাকে। কিন্তু তাতেও বৃষ্টি থামেনি। বরং আরও জোরে এসেছে।
ছোটসাহেব কিন্তু তাতে মোটেই দমেননি। দুর্গারানীকে বললেন, তুমি এত জোরে জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মন্ত্রগুলো বললে যে মেঘগুলো সব ভয় পেয়ে গেল। একসঙ্গে সব দৌড়ে পালাচ্ছে। তাই বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে।
দুর্গারানী জানে এসব বাজে কথা। যত সব পাগলামি ছোটসাহেবের। দূর আকাশের ওপারে মেঘেদের নিজের দেবতা আছে, তারা গোপালগ্রামের ছোটসাহেবের মন্ত্র মানতে যাবে কেন?
ছোটসাহেবকে গ্রামসুদ্ধ নোক ওই ছোটসাহেব নামেই ডাকে কিন্তু দুর্গারানী বলে ফুচু। জমিদারি নেই, সেই কবে চলে গেছে। তবু জমিদার বাড়ি আছে। সেই পোড় ইট বের হওয়া, পলেস্তারা খসা দালানের, প্রাচীন জমিদার বংশের শিবরাত্রির সলতে, এই ফুচু তথা গজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী।
এ বাড়িতে এই রকমই সব নাম। কাগজপত্রে, সরকারি দলিলে যিনি কীর্তিনারায়ণ, ফুচুর বা ছোটসাহেবের যিনি প্রণম্য পিতামহ তাঁকে তাঁর মা-পিসিরা ডাকতেন কচু বলে। তাঁর ছেলে রায়সাহেব গর্জন নারায়ণ, বাড়ির মধ্যে তাঁর নাম ছিল ঘেঁচু। তিনিই ভুচু-ফুচুর বাবা।
এসব দুর্গারানীর শিশুকাল থেকে দেখা।
ছোটসাহেবের ঘটনাটাও দুর্গারানী ভালই জানে। ছোটসাহেবের দাদার ডাকনাম ছিল ভুচু। কিন্তু এই ভুচু নামটা চলেনি। ছোটবেলায় ভুচুর গায়ের রং এতটাই ফরসা ছিল যে লোকের মুখে মুখে তার নাম হয়ে গিয়েছিল সাহেব।
সাহেবের থেকে ছোটসাহেব তিন বছরের ছোট। ছোটসাহেবের গায়ের রং মোটেই ফরসা নয়, আর দশজন গাঁয়ের লোকের মতো গায়ের রং তার। কিন্তু দাদার সুবাদে তার ক্ষেত্রেও ফুচু নামটা চলেনি। কী করে যে হল ব্যাপারটা বলা কঠিন। আস্তে আস্তে ফুচু ছোটসাহেব হয়ে গেলেন।
এদিকে আসল সাহেব বড় হয়ে লেখাপড়া করে সেই যে বিলাত গেলেন, আর ফিরলেন না। আগে মাঝে মধ্যে দু-একটা রঙিন ছবিওলা চিঠি আসত। আজ আট-দশ বছর তাও আসে না।
ছোটসাহেবের দাদা সেই প্রথম সাহেব এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন, বেঁচে আছেন কিনা সেটাও কেউ জানে না। গ্রামের মানুষও তাকে আর খেয়াল রাখেনি।
এ বাড়িতে একসময় তোকজন গমগম করত। দুর্গারানীর সব মনে আছে। এগারো বছর বয়েসে সে বিধবা হয়েছিল। তার পরের বছরেই তার বাবা এসে তাকে এ বাড়িতে রেখে যায়।
সাহেব, ছোটসাহেবের বাবা রায়সাহেব ঘেচু তাকে খুব ভালবাসতেন। তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে সেই যেদিন আশ্রয়ের খোঁজে সে এ বাড়িতে ঢুকেছিল, তারপর একদিনের জন্যেও এ বাড়ির বাইরে থাকেনি।
দুর্গারানীর চোখের সামনে ভুচু-ফুচুর মা মারা গেলেন, বিধবা পিসি, খুড়ি কেউ বেঁচে রইল না।
বাড়িতে নায়েব-গোমস্তা-মুনিষ ছিল। গোয়াল ভর্তি গোরু ছিল। একদিন জমিদারি উঠে গেল। তার পরে সবই ধীরে ধীরে চলে গেল।
এখন এই পুরনো ভাঙা বাড়িটা আছে। তাও ভয় হয়, কবে না মাথার ওপরে ভেঙে পড়ে। অল্প কিছু ধানজমি আছে, কয়েকটা ফলগাছ, একটা পুকুর। এতেই দুর্গারানীর আর ছোটসাহেবের কষ্টেসৃষ্টে কেটে যায়।
