ছাতার সন্ধানে সেদিন ফুলবাগানের মোড়ে ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে চতুর্দিকে খেয়াল রাখছিলেন। এই সময়ে একটা প্রাইভেট বাস থেকে নামতে গিয়ে একটা ভীষণ মোটামতন লোক চিৎপটাং হয়ে রাস্তায় পড়ে গেল। তাঁর হাতে ধরা একটা ছাতা ছিটকিয়ে কয়েক হাত দূরে চলে গেল।
মুহূর্তের মধ্যে তীব্র ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ছাতাটি তুলে নিয়ে জ্ঞানবাবু সামনের দিকে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন।
কিন্তু কোনও লাভ হল না। ওই রকম মোটা মানুষ যে অমন দ্রুত ছুটতে পারেন সেটা ভাবা কঠিন। জনারণ্য ভেদ করে পর্বত প্রমাণ শরীর নিয়ে ভদ্রলোক ছুটে এসে জ্ঞানবাবুর পথ রোধ করে দাঁড়ালেন এবং বিনা বাক্যব্যয়ে এক ঝটকায় ছাতাটি কেড়ে নিলেন।
জ্ঞানবাবুর সেই প্রথম ধরা পড়া। এর পর থেকে তিনি মনমরা হয়ে আছেন। ছাতা সংগ্রহে উৎসাহ পাচ্ছেন না।
এদিকে কী করে অবসর জীবনের নিষ্কর্মা দিনগুলি কাটাবেন সেটা যেমন একটা বড় সমস্যা, তেমনিই আবার এই কয় বছরে ছাতা হাতানো একটা নেশার মতো হয়ে গেছে। অবশেষে অনেক ভেবে একটা সমাধান বের করেছেন জ্ঞানবাবু।
ছাতা সংগ্রহের কাজ এখনও চলবে। তবে বাড়ির বাইরে নয়। তাই বলে ভাড়াটেদের ছাতায় হাত দেবেন না। ধরা পড়লে, সে খুব লজ্জার ব্যাপার হবে।
এখন সম্বল খেপিপিসি। জ্ঞানবাবু খেপিপিসিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার ছাতা ছাড়া কষ্ট হয়।
পিসি অবাক, আমি তো বাড়ির মধ্যে থাকি। আমি ছাতা দিয়ে কী করব?
জ্ঞানবাবু বললেন, আজকালকার লোকে বাড়ির মধ্যেও ছাতা ব্যবহার করে, অনেক বাড়ির ছাদ দিয়ে এত জল পড়ে। আমাদেরও তো পুরনো বাড়ি। আমি তোমাকে একটা ছাতা কিনে দেব।
পিসি বললেন, তোর দোতলায় জল পড়তে পারে, আমার একতলায় তো জল পড়বে না। তা তুই যখন বলছিস, দিস। একটা ছাতা কিনে দিস।
বাজার থেকে ছাতা কিনে এনে পিসিকে দিয়ে জ্ঞানবাবু বললেন, খুব সাবধান। আজকাল চারদিকে খুব ছাতা চোর হঠাৎ নিয়ে না চলে যায়।
ছাতা পেয়ে খেপিপিসি খুব খুশি। বললেন, আমার কাছ থেকে ছাতা চুরি করবে এমন চোর এখনও জন্মায়নি। তারপর ছাতাটা খুলে জ্ঞানবাবু পিসির হাতে দিতে তিনি সেটা মাথায় দিয়ে বললেন, কী ভাল লাগছে ছাতা মাথায় দিয়ে, মনে হচ্ছে শ্যামামাস্টারের ইস্কুলে যাচ্ছি। আচ্ছা নগেন, তুই বলতো ছাতার ইংরেজি কী?
জ্ঞানবাবু যথারীতি প্রতিবাদ করলেন, আমি নগেন নই। আমি শ্যামামাস্টারের কাছে পড়িনি। আমি পড়েছি হেয়ার স্কুলে।
.
খেপিপিসি এখন আনন্দে ছাতা মাথায় দিয়ে উঠোনে পাক খাচ্ছেন, আর সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে জ্ঞান বর্ধন মনে মনে কৌশল করতে লাগলেন কত তাড়াতাড়ি পিসির ছাতা হস্তগত করা যায়। অবশ্য জ্ঞানবাবু ভাল লোক। পিসিকে বঞ্চিত রাখবেন না। একটা ছাতা সরাতে পারলেই, তাকে আরেকটা ছাতা কিনে দেবেন।
ছোটসাহেব
শরৎকালের কোনও কোনও বিকেলে বেগমবাহার ঘুড়ির কাটাকুটির মতো সাদা মেঘ আর কালো মেঘ ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে।
সহসা হু হু করে বাতাস আসে। কোন দিক থেকে আসবে বোঝা কঠিন, সাদাকালো মেঘগুলো ক্রমাগত দিক বদল করে। এদিকেরটা ওদিকে যায়, ওদিকেরটা এদিকে আসে।
গোপালগ্রামের ছোটসাহেব তাঁদের দোতলা বাড়ির ভাঙা ছাদে উঠে একটা অদৃশ্য লাটাই হাতে মেঘগুলোকে কন্ট্রোল করেন। কখনও সুতো ছাড়ছেন তো ছাড়ছেনই। একটা বেয়াদপ সাদা মেঘকে কখনও মণ্ডলপাড়া ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা তারপর ধানক্ষেত, বালির চর, খেয়াঘাটের ওপর দিয়ে ইছামতী নদী পার করিয়ে দেন।
আবার একটু পরেই একটা নাদুসনুদুস কালো মেঘকে মাথার ওপর টেনে আনেন। মেঘটা বড়সড়, মোটা-সোটা হলে কী হবে ভারি ভিতু, ছোটসাহেবের হাতে পড়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।
ছোটসাহেবের মনটা খুব নরম। ভিতু মেঘটার কান্নাকাটি দেখে সেটাকে অব্যাহতি দেন, বলেন, যা, ছেড়ে দিলাম। এখন কিছুক্ষণ আমগাছের মাথায় যা, তারপর হাজিপাড়া হয়ে চলে যাবি।
আবার একেকসময় খুব কড়া ভাবে শাসন করেন গোলমেলে মেঘগুলোকে। গতকাল বিকেলে কোনও কারণ নেই, পরিষ্কার আকাশে হঠাৎ কোথা থেকে দুটো কালো মেঘ এসে মোষের মতো শিং উঁচিয়ে একেবারে মাথার ওপরে রামরাবণের যুদ্ধ শুরু করে দিল।
এদিকে পরশুদিনই সকালবেলা কাজের মাসি দুর্গারানীকে ছোটসাহেব বলেছিলেন কালকের দিনের জন্যে মেঘগুলোকে তাড়িয়েছি। দুর্গাদি, তুমি কাল ময়লা বাসি কাপড়জামা সব কেচে দাও। আমার মশারিটাও কেচে দিও। আর ছাদের ওপরে আচার, কাসুন্দি, ডালের বড়ি সব রোদে শুকোতে দাও।
দুর্গারানী ছোটসাহেবকে ছোটসাহেবের জন্ম ইস্তক দেখে আসছে। ছোটসাহেবের কথায় রোদ উঠবে, বৃষ্টি হবে না–এমন সব কথা বিশ্বাস করার পাত্রী সে নয়। কিন্তু ছোটসাহেবের কথামতো কাজ না হলে ঝামেলা হবে, এ কথা দুর্গারানী হাড়ে হাড়ে জানে।
সাত-সকালে উঠে জামাকাপড় ছেড়ে স্নান করে দুর্গারানী ছাদে উঠে আচারকাসুন্দি সব রোদে দিয়েছিল। এসব কাজ শুদ্ধভাবে করতে হয়, না হলে আচার-টাচার সব পচে যায়।
ভোরবেলা ছাদে উঠে কিন্তু দুর্গারানীর মন প্রসন্ন হয়ে গিয়েছিল।
ফুরফুরে নীল আকাশ। সাদা বা কালো বা ঘেঁড়া ছেঁড়া কোনও রকম মেঘই আকাশে নেই। পুব দিক থেকে থেমে থেমে হালকা বাতাস বইছে। নীলকণ্ঠ ফুলের একটা বুড়ো লতাগাছ উঠোন থেকে ছাদে উঠেছে, তার সবুজ পাতা ঢেকে গেছে নীল ফুলে, সেগুলো হালকা হাওয়ায় তির তির করে কাঁপছে। পুজো এসে গেছে। দূরে কোথায় ডাক বাজছে।
