আর দেরি করলেন না তিনি। ঝড়ের বেগ একটু কমে এসেছে। সামনে নালাটা এক লাফে পার হয়ে, এ বয়েসে ঝোড়ো হাওয়ায় যতটা জোরে ছোটা যায় ঠিক ততটা জোরে ছাতাটার পশ্চাদ্ধাবন করলেন। খুব বেশি দূর যেতে হল না, দেখা গেল কিছু দূরে ছাতাটা মাঠের মধ্যে মুখ থুবড়িয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে ছুটতে অসুবিধে হচ্ছিল, দুয়েকবার হুমড়ি খেয়ে পড়েও গিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাতাটা ধরতে পেরেছিলেন।
একটু পরে ঝরঝর করে বৃষ্টি এল, ছাতাটা পেয়ে জ্ঞানবাবুর খুবই উপকার হয়েছিল। ছাতাটা মাথায় দিয়ে রেড রোডে একবার হাত তুলতেই পর পর তিনটে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে গেল, সবাই ভেবেছে তিনি কোনও ট্রাফিক কনস্টেবল।
সে যা হোক, প্রথম ট্যাক্সিতে চড়ে তিনি যখন কাঁকুড়গাছি পৌঁছালেন সে বেচারি ট্যাক্সিওলা কিছুতেই ভাড়া নিতে চায় না।
০৪. বিবরণী
জ্ঞানবাবুর সংগৃহীত প্রতিটি ছাতার পেছনে এই রকম রোমাঞ্চকর ইতিহাস আছে।
তিনি ছাতা সংগ্রহ করেননি এমন জায়গা এই শহরে বিরল। তিনি বৃষ্টি ভেজা বড়দিনের মধ্যরাতে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের উপাসনাগৃহ থেকে ছাতা সরিয়েছেন। মহামান্য হাইকোর্টের বিচারকদের প্রবেশপথ থেকে, রাজভবনের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান থেকে, এমনকী লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান কর্তার চেম্বারের সামনের অফিস ঘর থেকে ছাতা সংগ্রহ করেছেন।
প্রতিটি ছাতার গায়ে আলপিন দিয়ে ছোট ছোট কাগজের স্লিপ লাগানো আছে। সেই সব স্লিপগুলিতে কবে, কীভাবে ছাতাগুলি সংগৃহীত হয়েছে এবং সম্ভব হলে পূর্বতন মালিকের নাম ঠিকানা ইত্যাদি লেখা আছে।
দুয়েকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যাক,
(এক) তালিকা নং লেডিস-৭
লেডিস ছাতা। পুরনো বিলিতি জিনিস। ২৪ শে ডিসেম্বর ১৯৯৬, রাত বারোটা, সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল থেকে সংগৃহীত। সম্ভবত কোনও বুড়ি মেমসাহেবের ছাতা।
(দুই) তালিকা নং জেন্টস-২০
জেন্টস ছাতা, প্রায় নতুন, মাঝারি মানের। ২৭শে মার্চ ১৯৯৬, দুপুরবেলা লালবাজার গোয়েন্দা দপ্তর থেকে সংগৃহীত। মালিক পিক-পকেট সেকশনের বড়বাবু।
এই রকম সব বিবরণ। এত সংক্ষেপে সব কিছু জানা যায় না, যেমন লালবাজার থেকে চুরি করে আনা ছাতাটি।
সেবার এক মাসের মধ্যে পর পর তিন বার পকেটমার গেল জ্ঞানবাবুর। দুপুরে খেয়ে-দেয়ে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন, ট্রামে, বাসে সারা শহরে চক্কর দেন। উদ্দেশ্য একটাই, যদি কেউ কখনও ভুলে গাড়ির মধ্যে ছাতা ফেলে নেমে যায় তবে তখনই সেটা হস্তগত করে পরের স্টপেজে নেমে যাওয়া।
কিন্তু সে বার ওই এক মাসে একটিও ছাতা সংগ্রহ করতে পারলেন না, অথচ তিন বার পকেট মারা গেল। শেষ বার যখন পকেট মারা গেল ঠিক লালবাজারের সামনে বাস থেকে নামার সময়, জ্ঞানবাবু সরাসরি লালাবাজারের মধ্যে ঢুকে গেলেন।
তারপর একে ওকে জিজ্ঞাসা করে, দুয়েকটা বাধা পেরিয়ে সরাসরি গোয়েন্দা প্রধানের ঘরে।
গোয়েন্দা প্রধান যখন শুনলেন যে জ্ঞানবাবু একজন প্রাক্তন অধ্যাপক, তিনি তাকে যথেষ্ট খাতির। করলেন। এবং যখন শুনলেন যে এক মাসের মধ্যে তিনবার পকেটমারি হয়েছে যথেষ্ট সহানুভূতি জানালেন, তারপর বেল বাজিয়ে সেপাইকে ডেকে বললেন, ওই যিনি পিকপকেট করেন, তাঁকে একটু ডাকো।
পিকপকেট করার লোক লালবাজারের মধ্যেই রয়েছে এটা জেনে জ্ঞানবাবু স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কী অবস্থা হয়েছে দেশের!
একটু পরে প্যান্ট হাওয়াই শার্ট পরা এক মধ্যবয়েসি ভদ্রলোক এলেন। তিনি পিকপকেট করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে অবশ্য পরিষ্কার হল ব্যাপারটা, ইনি পিকপকেট করেন মানে ইনি পিকপকেট শাখায় ভারপ্রাপ্ত অফিসার।
গোয়েন্দা প্রধান অফিসারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতেই জ্ঞানবাবু বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে, তাকে বলা হল পিকপকেট সেকশনে অপেক্ষা করতে। সামনেই বড় ঘরের একপাশে পিকপকেট সেকশন। ঘর প্রায় খালি, শুধু দরজার পাশে দুজন রোগা, কালো, সন্দেহজনক চেহারার লোক দাঁড়িয়ে আর সামনের টেবিলের পাশে কাঠের আলমারির গায় একটা ছাতা দাঁড় করানো রয়েছে।
বিন্দুমাত্র বিচার বিবেচনা না করে ছাতাটি শক্ত করে বাগিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন জ্ঞানবাবু।
চুলোয় যাক পকেটমার ধরা। সস্তার প্লাস্টিকের মানিব্যাগে ছিল তো মোট পাঁচ টাকা ষাট পয়সা। তার চেয়ে এই ছাতা ঢের ভাল।
০৫. সমাধান
এই রকম সব ঘটনার ফিরিস্তি লম্বা করে লাভ নেই। সে খুব একঘেয়ে হয়ে যাবে।
আসল কথা এই যে ছাতা সংগ্রহের রোমাঞ্চকর কাজটা ভালই উপভোগ করছিলেন জ্ঞানবাবু। অবসরের দিনগুলি শুয়ে বসে না কাটিয়ে মোটামুটি উত্তেজনার মধ্যে কাটিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি।
মাসে-দুমাসে একটা ছাতা সংগ্রহ করতে পারলেই হল। সব দিনেই ছাতা পাওয়া যাবে এমন কোনও কথা নেই। চাকরিতেও তাই, মাসে একদিন মাইনা হয়, কিন্তু কাজ করতে হয় সবদিনই।
সে যা হোক আজ বছর দুয়েক হল খুব মন্দা চলছে ছাতা সংগ্রহে।
লোকজন খুব সেয়ানা হয়ে গেছে। ছাতা ব্যাগের মধ্যে পুরে বাসে-মিনিবাসে যাতায়াত করে। শিশুরা বর্ষাতি পরে। তাদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে চকলেট দিয়ে ছাতা হাতাবার সুযোগ নেই।
আজকাল প্রাণপণ প্রয়াস করেও একটা ছাতা দখলে আনা যায় না।
এই তো সেদিন হাতের মধ্য থেকে একটা ছাতা ফসকিয়ে গেল। সে আফসোস জ্ঞানবাবুর এখনও যায়নি।
