জ্ঞানবাবু রেগে গেলেন, এসব আমি ঢের জানি। প্যারীচরণ সরকারের ফাস্ট বুক, সেকেন্ড বুক আমিও পড়েছি। কিন্তু একটা কথা আমি শেষবারের মতো তোমাকে বলছি, আমি তোমার ভাই নগেন নই। আমি জ্ঞান, তোমার ভাইপো।
এ কথা শুনে খেপিপিসি হেসে ফেললেন, জ্ঞান আসবে কোথা থেকে? সে তো বিলেত গেছে মেম বিয়ে করার জন্যে।
জ্ঞানবাবু রাগ করতে পারেন না। খেপিপিসির এ কথাটা অর্ধেক সত্যি। এম.এ. পাশ করার পরে ভাল স্কলারশিপ পেয়ে চার বছর বিলেতে গবেষণা করেছেন তিনি, কিন্তু মেম বিয়ে করেননি।
জ্ঞানবাবুর মনে আছে, তিনি যখন বিলেত থেকে ফিরেছিলেন, তখন খেপিপিসি সানিপাতিক জ্বরে প্রলাপ বকছেন। তার ফিরে আসার কথা খেপিপিসির স্মৃতিতে কোনও রকম দাগ কাটেনি।
সে যাই হোক, জ্ঞান-নগেনের অসম লড়াইতে বহুবার রণে ভঙ্গ দিয়ে জ্ঞানবাবু খেপিপিসির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। আজকাল আর পিসি তাঁকে নগেন বলে ডাকলে তিনি বিশেষ প্রতিবাদ করেন না।
০৩. ছত্র বর্ধন
হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিতে গেলে অনেকে অসুবিধেয় পড়ে, আর্থিক টানাটানি দেখা দেয়। কিন্তু জ্ঞানবাবুর কোনও অসুবিধেই হয়নি। প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদিতে কলেজ থেকে কিছু নগদ টাকা। পেয়েছিলেন। পেনশন পাননি, শুনেছেন পাবেন, অবশ্য তা নিয়ে জ্ঞানবাবু মোটেই মাথা ঘামান না।
কাঁকুড়গাছিতে পুরনো বাংলা ইটের ভাঙা দেয়াল দিয়ে ঘেরা তাদের প্রাচীন বসতবাটি। সে। বাড়িতে একতলা, দোতলায় সামনের দিকে ঘরে ঘরে ভাড়াটে। পেছনের দিকে দোতলায় জ্ঞানবাবু থাকেন, একতলায় থাকেন খেপিপিসি। সামনের দিকের আট-দশ ঘর ভাড়াটে কম-বেশি যা ভাড়া দেয় তাতেই পিসি-ভাইপোর মোটামুটি চলে যায়।
বাড়িটা পুরনোকালের। খাট পালঙ্ক, চেয়ার-আলমারি, কাঁসা পিতলের বাসন-কোসন, বেলজিয়াম গ্লাসের দামি আয়না, এসবও অনেক। কিন্তু সেসব ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে, চুরি হয়ে গেছে।
এ বাড়ির সামনে আর পিছনে কয়েকটা থাম বাঁধানো গাছ আছে। কয়েকটা সুপুরি গাছ, দুটো নারকেল গাছ। পুরনোকালের একটা আমলকী গাছ আকাশ ছাড়িয়ে উঠে গেছে।
এসব ছাড়াও চিলেকোঠা ঘরে আছে খারাপ-ভাল, আস্ত-ভাঙা চৌত্রিশটা ছাতা। এর মধ্যে তেইশটা ছাতা পুরুষদের, যাকে বলে জেন্টস ছাতা। আটটা লেডিস ছাতা। আর তিনটে কমন ছাতা, পুরুষ-মহিলা যে কারও হতে পারে। এসব ছাড়াও আরও গোটা পাঁচেক বেবি ছাতা আছে, রং-বেরঙের, যেগুলো এই হিসেবে ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয়নি।
এত সব ছাতার মধ্যে একটা রয়েছে ট্রাফিক কনস্টেবলের ছাতা, উপরে সাদা, নীচে কালো, দুরকম কাপড় লাগানো আছে। এ ছাতাটি যখন সংগ্রহ করেন সেদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে জ্ঞানবাবুর। মাত্র দুবছর আগের কথা।
চৈত্রের শেষ৷ গনগনে গরমে কলকাতা জ্বলছে। বাতাসে পিচ গলার গন্ধ। তখন বিকেল প্রায় পাঁচটা।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরিতে গিয়েছিলেন জ্ঞানবাবু। পড়াশুনো করা যতটা উদ্দেশ্য তার চেয়ে বেশি উদ্দেশ্য হল ছাতা হাতানো।
ছাতা হাতানোর পক্ষে পাঠাগার, সভাকক্ষ, চায়ের দোকান খুব সুন্দর জায়গা। বৃষ্টির দিনে বিয়েবাড়ি বা শ্রাদ্ধবাসরেও উটকো ছাতা পাওয়া যায়।
কিন্তু আজ ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরি ঘর থেকে বিফল মনমরা হয়ে জ্ঞান বর্ধন বেরিয়ে এলেন। কী রকম সাংঘাতিক বুদ্ধি করেছে লাইব্রেরি, এখন আর ছাতা, ব্যাগ ইত্যাদি পাঠাগারের ভেতর নিয়ে যাওয়া যায় না। গেটের পাশে দারোয়ানের ছোট কাঠের ঘরে জমা রেখে যেতে হয়, তার বদলে টোকেন দেয়, ফিরে যাওয়ার সময়ে টোকেন দিয়ে জিনিসপত্র ফেরত নিতে হয়।
অনেকক্ষণ লোলুপ দৃষ্টিতে দারোয়ানের ঘরের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন অধ্যাপক জ্ঞান বর্ধন। কত সুন্দর, কত বাহারি সব ছাতা। কিন্তু তার নিজের কোনও টোকেন নেই, এই একটি ছাতাও তার নয়।
রগচটা গরম ছিল সারাদিন। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে থিয়েটার রোডে তিনি দেখলেন আকাশ কেমন যেন আধা কালো৷ সূর্য কিংবা রোদ স্পষ্ট নয়, কিন্তু উত্তাপ এখনও খুব চড়া, কেমন ধোঁয়াটে চারধার, শীতের সকালের মতো।
জ্ঞানবাবু অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি জানেন, এ হল ঝড়ের পূর্বাভাস। তিনি দ্রুতপদে পশ্চিম মুখে হাঁটতে লাগলেন। চৌরঙ্গি আর থিয়েটার রোডের মোড় পেরোলে বিড়লা তারাঘরের সামনে বাস স্টপ, সেখান থেকে কাঁকুড়গাছির মিনিবাস পাওয়া যাবে। বাড়ি ফিরতে দেরি করলে চলবে না, সন্ধ্যা হয়ে গেলে খেপিপিসি উথাল পাতাল করেন।
বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে ঝড়টা হইহই করে এসে গেল। প্রচণ্ড বেগে দমকা হাওয়া আর সেই সঙ্গে ধুলোবালি, ঝরা পাতা। ফুটপাথের পাশে পর পর কয়েকটা বাদাম গাছ আছে, তারই আড়ালে আশ্রয় নিলেন জ্ঞানবাবু।
ঠিক এই সময়েই তিনি দেখলেন বিড়লা তারাঘরের সামনে ট্র্যাফিক স্ট্যান্ডের কনস্টেবলের ছাতাটা তার হাত থেকে ছিটকিয়ে হাওয়ায় উড়ে মধ্য ময়দানের দিকে ভো-কাটা-ভো ঘুড়ির মতো চলে গেল।
বাতাসের তোড় দেখে কনস্টেবল ভদ্রলোক ছাতাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন, সেই সময়েই এই দুর্ঘটনা। প্রথমে তিনি টের পেলেন না ছাতাটা ঠিক কোন দিকে উড়ে গেল। ভ্যা বাঁচাকা খেয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন।
বাদাম গাছের আশ্রয় থেকে জ্ঞানবাবু ছাতাটাকে লক্ষ রাখছিলেন। কোনাকুনি ভাবে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে ছাতাটা উড়ে যাচ্ছে।
