মন্ত্রিমহোদয় ক্ষীণ আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু এ ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
ছত্র বর্ধন
এ গল্প পাঠ করে নায়কের নাম কেউ যদি দেন ছত্র বর্ধন, আপত্তি করা যাবে না। জ্ঞান বর্ধন তাঁর আসল নাম, এরকম একটা নাম অবশ্য সচরাচর দেখা যায় না।
ভদ্রলোকের নামের প্রথমাংশের পুরোটা যে কী জ্ঞানব্রত না জ্ঞানেন্দ্রনাথ, নাকি অন্য কিছু, সে বিষয়ে কোনও খোঁজখবর নিইনি। কারণ এখন তাকে ছত্র বর্ধন বলাই উচিত।
সে যা হোক, জ্ঞান বর্ধন এক ভদ্রলোকের পুরো নাম। ভদ্রলোক আবার জীবন যাপন করেন ছাতা সংগ্রহ করে। তিনি তার জীবনের প্রথম ছাতাটি উপহার পেয়েছিলেন। তার বিদায় সংবর্ধনা সভায়। এবং দুঃখের বিষয়, সেই ছাতাটি তিনি সেই দিনই বাড়ি ফেরার পথে বাসে হারিয়ে ফেলেন।
তারপর থেকে জ্ঞানবাবু সর্বত্র তার সেই হারানো ছাতাটিকে খুঁজে যাচ্ছেন এবং এই কাজেই তার অবসর জীবন ব্যয় করছেন।
অবশ্য হারানো ছাতাটি না পাওয়ায় সে স্থানে অন্য যে কোনও ছাতাই, সম্ভব হলে, সংগ্রহ করা তার এখন একমাত্র কাজ।
একটু পেছন থেকে বলি। জ্ঞান বর্ধন লেখাপড়া জানা লোক। কলকাতায় কলেজে অধ্যাপনা করতেন তিনি, তার বিষয় ছিল দর্শন শাস্ত্র। কিন্তু তার ছাত্র সংখ্যা যখন কমতে কমতে প্রায় শূন্যে গিয়ে দাঁড়াল, তিনি অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে দিলেন, নেহাতই আত্মসম্মান বোধ থেকে।
এই ছাত্র কমতির ব্যাপারে জ্ঞানবাবুর ব্যক্তিগত কোনও ত্রুটি ছিল না। বরং তিনি খুব মনোযোগী এবং ছাত্রপ্রিয় অধ্যাপক ছিলেন। ফাঁকি-টাকি দেওয়া তিনি মোটে জানতেন না। ছাত্রদের ভালবেসে তিনি পড়াতেন, ছাত্ররা তাকে ভালবাসত।
কিন্তু দেশ থেকে দর্শন পড়ার চল উঠে গেল। খারাপ-ভাল সব ছাত্র-ছাত্রীই এখন বিজ্ঞান পড়তে চায়। বিজ্ঞান, এঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি নিদেন পক্ষে অর্থনীতি, পরিসংখ্যান বা রাষ্ট্রনীতি।
আগে তবু দু-চারজন করে ছাত্র হচ্ছিল ক্লাসে, কিন্তু শেষে একেবারে কমে গেল। জ্ঞানবাবুর অবশ্য পাকা চাকরি, ছাত্র না থাকলেও তার চাকরি যেত না। কিন্তু জ্ঞানবাবু একটু খামখেয়ালি মানুষ। দর্শনের অধ্যাপকেরা এমন হয়। তিনি বিনা কাজের, বিনা পরিশ্রমের এই চাকরি একদিন ধুত্তোরি বলে ছেড়ে দিলেন। তখন তাঁর সাতচল্লিশ বছর বয়েস।
এটা পাঁচ বছর আগের কথা। এখন জ্ঞানবাবুর বয়েস বাহান্ন। জ্ঞানবাবু বলেন, তিপান্ন, যা বাহান্ন তাহা তিপান্ন।
তা, অবসর গ্রহণ করার পরে, বিশেষত জীবনের প্রথম ছাতাটি প্রথম দিনেই হস্তচ্যুত হয়ে যাওয়ার পর থেকে, যেন-তেন প্রকারে ছাতা সংগ্রহ করা প্রাক্তন অধ্যাপক জ্ঞান বর্ধনের জীবনের ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
০২. খেপিপিসি
জ্ঞানবাবুর অবশ্য চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে কোনও ঝুঁকি ছিল না। তিনি সংসারী মানুষ নন, বিয়ে-থা করেননি। তিন কুলে তার একমাত্র বুড়ি পিসিমা ছাড়া কেউ নেই।
বুড়ি পিসির নাম খেপি। ছোটবেলা থেকেই তিনি খ্যাপাখ্যাপা। কবে নাবালিকা বয়েসে বিয়ে হয়েছিল, কবে শ্বশুরবাড়ি থেকে বিধবা হয়ে পিত্রালয়ে, মানে জ্ঞানবাবুদের এই কঁকুড়গাছির পুরনো বাড়িতে, চলে এসেছিলেন সেসব ইতিহাসের বিষয়। তারপর একটা মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। মন্বন্তর, দেশভাগ কত কী।
খেপিপিসি চার ভাইবোনের মধ্যে ছিলেন অগ্রজা। জ্ঞানবাবুর বাবা নগেন্দ্র বর্ধন খেপিপিসির থেকে মাত্র এক বছর ছোট ছিলেন। খেপিপিসি ছাড়া এখন আর কেউ বেঁচে নেই।
বছর তিরিশের আগে নগেনবাবু একবার কী একটা কাজে দিল্লি গিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি এক পথ-দুর্ঘটনায় মারা যান।
এর অনেক আগেই অবশ্য জ্ঞানবাবুর মা মারা গিয়েছেন। বাবা-মা দুজনেই মারা যাওয়ার পরে একমাত্র ওই খেপিপিসি ছাড়া জ্ঞানবাবুর নিজের বলতে কেউ রইল না।
এদিকে হয়েছে কী, নগেনবাবু যে মারা গেছেন, এ কথা খেপিপিসি কোনও দিনই বিশ্বাস করেননি। তিনি মনে করেন তার ভাই নগেন এখনও বেঁচে আছেন।
সম্প্রতি বছর দশেক খেপিপিসি ভাইপো জ্ঞানকেই তাঁর ভাই নগেন বলে ভাবেন। জ্ঞানবাবুর সঙ্গে কথা বলতে হলে পিসি তাঁকে নগেন নামেই সম্বোধন করেন।
প্রথম প্রথম জ্ঞানবাবু পিসিকে অনেক রকম বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, পিসি আমি কিন্তু বাবা নই। আমি হলাম জ্ঞান, তোমার ভাইপো। বাবা ছিল নো জ্ঞান, অর্থাৎ জ্ঞান নয়, নগেন।
তারপর একটু থেমে পিসিকে বলেছেন, পিসি, তুমি ইংরেজি জানো তো? নো মানে জানো তো?
খেপিপিসি হেসে ফেলেছেন, বলেছেন, তুই কী যে বলিস নগেন, আমি আর তুই এক সঙ্গে লিচুতলার ইস্কুলে পড়েছি, তোর মনে নেই? সেই যে শ্যাম মাস্টার, ইয়া গোঁফ, নাক ভরতি নস্যি, মুখ ভরতি দোক্তাপান।
জ্ঞানবাবু প্রতিবাদ করেছেন, আমি তোমার ভাই নগেন নই। আমি কোনও শ্যাম মাস্টারের কাছে। কখনও পড়িনি। আমি প্রথম থেকে হেয়ার স্কুলে পড়েছি।
খেপিপিসি বলেছেন, তোর কিছুই মনে নেই নগেন। এই তো সেই সেদিনের কথা আমি, তুই, বিন্দু, মধু সবাই মিলে শেলেটবই নিয়ে লিচুতলায় শ্যাম মাস্টারের ইস্কুলে যেতাম। ওই যে ইয়েস-নো কী বললি, তার চেয়ে অনেক বেশি–বি-এল-এ ব্লে, সি-এল-এ ক্লে, তারপর বি-আই-টি-ই বাইট, সি-আই-টি-ই সাইট, কে-আই-টি-ই কাইট কত কঠিন কঠিন ইংরেজি পড়েছি।
এবার একটু ভেবে নিয়ে খেপিপিসি বললেন, সত্যি তোর কিছু মনে নেই নগেন? সব কিছু ভুলে গেছিস, আচ্ছা বল তো, রাস্তায় একটি খোঁড়া লোকের সঙ্গে আমার দেখা হইয়াছিল, ইংরেজি কী?
