ব্যাপারটা বুঝতে দ্বিতীয় ডেপুটির একটু সময় লাগল। তাঁর দ্বিধান্বিত মুখভঙ্গি দেখে সাত্যকি পাল বুঝিয়ে বললেন, এই নতুন চেয়ারটার সঙ্গে আমি কেমন আটকিয়ে গেছি। মনে হচ্ছে নাট-বল্ট দিয়ে আমাকে কেউ আটকিয়ে দিয়েছে। চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারছি না।
বলা বাহুল্য, এই আজগুবি কথা বিশ্বাস করার লোক দ্বিতীয় ডেপুটি নন। প্রথম যৌবনে বহুদিন ফৌজদারি আদালতে হাকিমি করেছেন, বিস্তর আজগুবি, অলীক হেঁয়ালি শোনার তার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু ওপরওয়ালাকে তো আর মিথ্যেবাদী বলা যায় না সরাসরি মুখের ওপরে, তাই তিনি একটু ঘুরিয়ে বললেন, স্যার, আরেকবার আপনি ওঠার চেষ্টা করুন তো।
করুণ হাসি হেসে সাত্যকি ওঠার চেষ্টা করলেন, পারলেন না। সাত্যকি কী করে যেন বুঝে গেছেন এ চেয়ার ছেড়ে ওঠা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এখনও তার বুদ্ধিভ্রংশ হয়নি, তিনি দ্বিতীয় ডেপুটিকে বললেন, দেখুন, আমার চেয়ার ছেড়ে ওঠার ব্যাপারটা পরে হবে। আপনি চট করে একটু মন্ত্রীর ঘরে যান তো। মন্ত্রীমশায় আমার জন্যে অনেকক্ষণ বসে আছেন। উনি কী বলছেন একটু শুনে। আসুন আর ওঁকে বলে আসুন আমি চেয়ারে আটকিয়ে গেছি, চেষ্টা করেও উঠতে পারছি না। ভাল করে বুঝিয়ে বলবেন।
তবু যাওয়ার আগে দ্বিতীয় ডেপুটি নিজে একবার হাত বাড়িয়ে পাল সাহেবের দুই বাহু আকর্ষণ করে তাঁকে উত্তোলন করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। ব্যাপারটা অবৈজ্ঞানিক হলেও সত্যি, ভদ্রলোক সম্পূর্ণ আটকিয়ে গেছেন চেয়ারে।
অবস্থা দেখে দ্বিতীয় ডেপুটি তাড়াতাড়ি দ্রুতপদে হেঁটে মন্ত্রীর ঘরে চলে গেলেন। মন্ত্রিমহোদয়ের তখন ক্ষিপ্তপ্রায় অবস্থা, এরকম গাফিলতি, তাঁর আদেশ অবহেলা করে তার ঘরে না আসা তিনি বরদাস্ত করার লোক নন। দ্বিতীয় ডেপুটিকে দেখে তিনি ধমকিয়ে উঠলেন, আপনি কেন? পালসাহেব কোথায়?
দ্বিতীয় ডেপুটি বললেন, স্যার, পালসাহেব আমাকে পাঠালেন। পালসাহেব একটু আটকিয়ে গেছেন। চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারছেন না।
মন্ত্রিমহোদয় এ কথায় আরও রুষ্ট হলেন, এমন কী মহাকাৰ্য তিনি করছেন যে একবারের জন্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারছেন না। আমাকে আধঘণ্টা ধরে বসিয়ে রেখেছেন?
দ্বিতীয় ডেপুটি বোঝানোর চেষ্টা করলেন, না স্যার। ব্যাপারটা ঠিক ওরকম নয়, ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে। পালসাহেবের শরীরটা স্যার চেয়ারের সঙ্গে সেঁটে গেছে।
মন্ত্রিমহোদয় এবার চেঁচিয়ে উঠলেন, কী বলছেন মশায়! আপনার কি মাথা খারাপ?
ইতিমধ্যে কিন্তু মন্মথের দৌলতে বড়সাহেবের চেয়ারে আটকিয়ে থাকার ঘটনাটা অফিসময় চাউর হয়ে গেছে, আশেপাশের অফিসেও পৌঁছেছে। অফিস ছুটির সময়, তাই তোকজন খুব নেই। তবুও পালসাহেবের ঘরে রীতিমতো ভিড় জমে গেছে। খাঁচায় বন্দি কোনও আজব জানোনায়ারকে লোকে যে রকম কৌতূহলের সঙ্গে দেখে, সবাই পাল সাহেবকে পর্যবেক্ষণ করছে। পালসাহেবও কী করবেন বুঝতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন।
খবরটা মন্ত্রীর ঘরেও পৌঁছাল। মন্ত্রী এবার একটু বিচলিত হলেন, তাই তো, ব্যাপারটা কী? দ্বিতীয় ডেপুটিকে বললেন, এসব কী আজগুবি ঘটনা! চলুন তো দেখে আসি।
সদলবলে মন্ত্রিমহোদয় পালসাহেবের ঘরে পৌঁছাতে উপস্থিত জনতা সম্রমভরে পথ করে দিল। মন্ত্রী সোজা পালসাহেবের চেয়ারের সামনে গিয়ে তার হাত ধরে একটা টান দিতে যাচ্ছিলেন কিন্তু ততক্ষণে পালসাহেব নিজেই মন্ত্রীকে দেখে অভ্যাসবশত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, মন্ত্রীকে দেখে তার খেয়ালই ছিল না যে তিনি চেয়ারের সঙ্গে আটকিয়ে গেছেন।
পালসাহেব উঠে দাঁড়াতে মন্ত্রী বললেন, এসব বুজরুকি শুরু করেছেন কেন?
পালসাহেব বললেন, আপনি কেন কেউই বিশ্বাস করবে না। আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু এই নতুন চেয়ারটায় বসার পরে আপনার ফোন পেয়ে উঠতে গিয়ে দেখি আটকিয়ে গেছি। চেয়ার ছেড়ে কিছুতেই উঠতে পারছিলাম না।
মন্ত্রী বললেন, আপনি সরে আসুন তো দেখি। পালসাহেব সরে দাঁড়াতে মন্ত্রিমহোদয় চেয়ারের গদিটা একটু টিপে দেখে বললেন, ভালই তো চেয়ারটা এই বলে তিনি নিজে চেয়ারটায় বসে দেখতে গেলেন।
একটু বসেই উঠে পড়ার চেষ্টা করেছিলেন মন্ত্রী। কিন্তু পারলেন না, তিনি চেয়ারের সঙ্গে আটকিয়ে গেছেন। দু-তিনবার চেষ্টা করার পর তিনি ঘোষণা করলেন, আমিও যে আটকিয়ে গেলাম। চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারছি না। তারপর সাত্যকি পালের দিকে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, মশায় আপনার জন্যে আমি এই বেকায়দায় পড়লাম। খবরের কাগজ কি পাবলিক যদি খোঁজ পায় যে আমি আপনার চেয়ারে বসে আছি! আপনি আমাকে ডোবালেন।
সাত্যকি পালের এখনও ঘোর কাটেনি, আগের মতোই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না।
এদিকে বাইরে ভিড় বাড়ছে। মন্ত্রী আটকিয়ে গেছেন রটে যাওয়ার পরে রাস্তা থেকে, অন্য অফিস থেকে তোক আসা আরম্ভ হয়েছে। পুলিশ ও খবরের কাগজগুলো এল বলে। একটু পরে আর ভিড় সামলানো যাবে না।
কিন্তু এরকম চলতে দেওয়া যায় না। দ্বিতীয় ডেপুটির সঙ্গে পরামর্শ করলেন পালসাহেব। তারপর স্থির হল একটা লরি বা টেম্পো ডেকে তাতে চেয়ার সমেত মন্ত্রিমহোদয়কে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়াই ভাল।
