এর মধ্যে একজনের একটু আগে আগে বাড়ি যাওয়ার তাড়া আছে। তিনিই প্রথমে সান্ধ্য সুতানুটি হাতে প্রবেশ করেছিলেন। সাত্যকি তাকে বললেন, আমার যদি খুব দেরি হয় আপনি চলে যাবেন, আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন না। ভদ্রলোক হাসিমুখে বেরিয়ে গেলেন। এটা প্রায় নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভদ্রলোক শেষ বেলায় একটা হইহল্লা জুড়ে দিয়ে তারপর নিঃশব্দে কেটে পড়েন।
আটকিয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় জনও অবশ্য খুশি হননি, দিনের শেষে কেই বা অফিসে বন্দি হয়ে থাকতে চায়। মিনিট দশেক বাদে আসছি বলে তিনিও গম্ভীর মুখে নিষ্ক্রান্ত হলেন।
অনেক দেরি হয়ে গেছে। এবার যেতে হয়, মন্ত্রিমহোদয় নিশ্চয় এতক্ষণে খুব চটে গেছেন।
কিন্তু এর পরেই হল, আসল মুশকিল, চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে সাত্যকি দেখলেন তিনি উঠতে পারছেন না। চেয়ারের সঙ্গে আটকে গেছেন।
চেয়ারটা নতুন। হালফিলের গদিমোড়া কালো রেক্সিনের রিভলভিং চেয়ার। পুরনো কাঠের হাতলওলা চেয়ারটা বদলিয়ে আজই ঘণ্টাখানেক আগে এটা দিয়ে গেছে। সাত্যকি চেয়ারটায় একটু আগে এসে বসেছেন, তারপর এই প্রথম ওঠা।
কিন্তু উঠতে পারছেন কোথায়? চেয়ারের সঙ্গে তিনি আষ্টেপৃষ্ঠে আটকিয়ে গেছেন। রিভলভিং হওয়ায় বাঁয়ে-ডাইনে, ডাইনে-বাঁয়ে ঠিকমতোই ঘুরছে কিন্তু ছেড়ে ওঠা যাচ্ছে না, শরীরটা কে যেন কেমিক্যাল আঠা দিয়ে আটকিয়ে দিয়েছে।
সাত্যকি কলিংবেল বাজালেন বেয়ারাকে ডাকার জন্যে, সেই সঙ্গে টেবিলের টেলিফোনটাও আবার ক্রিং ক্রিং করে উঠল।
এবার স্বয়ং মন্ত্রী ফোন করেছেন, কী হল? আমি আপনাকে ডাকছি, আপনি আসছেন না কেন?
একটু আমতা আমতা করে কিছুটা সত্যি কথাই বলে ফেললেন সাত্যকি। আর তা ছাড়া উপায়ই বা কী? একটু মোলায়েম করে সাত্যকি বললেন, স্যার, আমি একটু আটকিয়ে গেছি। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠতে পারছি না। খুব চেষ্টা করছি।
মন্ত্রিমহোদয়ের এত কথা শোনার ধৈর্য নেই, তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, না, না। এখনই চলে আসুন, আমি আপনার জন্যে বসে আছি।
মন্ত্রীর নির্দেশ শুনে সাত্যকি আরেকবার চেয়ার থেকে ওঠার চেষ্টা করলেন সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়ে, অত ভারী চেয়ারটার পিছনের দিকটা এক ইঞ্চিটাক কাত হল, কিন্তু তাতে কী হবে, দেহটাই আটকিয়ে আছে।
কলিংবেল শুনে মন্মথ বেয়ারা ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছিল। সাত্যকি তাকে বললেন, মন্মথ আমাকে একটু টেনে তোলো তো।
মন্মথ প্রথমে বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা। সে চেয়ারের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল, সাত্যকি হাত দুটো তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, মন্মথ আমার হাত দুটো ধরে একটু জোরে টেনে তোলো তো।
মন্মথ জানে, খুব ভারী ও মোটা মানুষদের অনেক সময় টেনে তুলতে হয়, তারা শরীরের ভার নিয়ে বসা বা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু পালসাহেব তত মোটা মানুষ নন, মেদহীন স্বাস্থ্যের লোক। মন্মথ ভাবল, তা হলে সাহেবের বোধহয় জোর ঝিঁঝি ধরেছে কিংবা কোমরে খিল ধরেছে।
মন্মথ পালসাহেবের দিকে এগিয়ে এল, তারপর ভেবে দেখল আচমকা হ্যাঁচকা টান দিয়ে তুলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে, যদি সত্যি হাড়ে খিল লেগে থাকে, জোর টানে হাড়ের জোড় সরে গিয়ে বিপর্যয় ঘটতে পারে। সে ধীর পদে সাত্যকির দুই বগলের নীচ দিয়ে নিজের দুই হাত গলিয়ে তাকে ওপর দিকে ঠেলে তোলার চেষ্টা করতে লাগল।
দ্বিতীয় ডেপুটি, যাঁকে সাত্যকি মিনিট দশ-পনেরো পরে আসতে বলেছিলেন, তিনি সাত্যকির ঠিক সামনের একটা কিউবিকলে বসেন। সেখান থেকে সাত্যকির যাওয়া-আসা তিনি লক্ষ রাখেন। তিনি যখন দেখলেন যে এতক্ষণ পর্যন্ত সাত্যকি ঘর থেকে বেরোলেন না তখন তিনি ধরে নিলেন মন্ত্রী হয়তো চলে গেছেন, মি. পালের আর মন্ত্রীর ঘরে যাওয়ার দরকার নেই। সুতরাং এই সুযোগে তাকে জরুরি ফাইল দুটো দেখিয়ে নিলে হয়, এই ভেবে ফাইল দুটো হাতে নিয়ে সাত্যকির ঘরে প্রবেশ করলেন।
দ্বিতীয় ডেপুটি পালসাহেবের ঘরে ঢুকে যা দেখলেন, হতভম্ব হয়ে গেলেন। মন্মথ চেয়ারের পিছনে গিয়ে কাঁধের নীচে হাত দিয়ে পালসাহেবকে চেয়ার থেকে ঠেলে তোলবার চেষ্টা করছে, পালসাহেব মরে গেলাম, মরে গেলাম বলে কাতরোক্তি করছেন।
এ অফিসে কারও কারও হঠাৎ হঠাৎ পাগল হয়ে যাওয়ার একটা রীতি আছে। এই তো কয়েক মাস আগে অ্যাকাউন্টস সেকশনের তিনকড়ি পিয়ন কেন যেন খেপে গিয়ে বড়বাবুকে সিঁড়ির ওপরে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। টিফিনের সময় বড়বাবু আর নতুন টাইপ-দিদিমণি সিঁড়ি দিয়ে গল্প করতে করতে নামছিলেন, সেই সময়ে আচমকা এই ধাক্কা। দিদিমণিকেও তিনকড়ি ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে একজন তাকে জাপটে ধরায় দিদিমণি রক্ষা পান।
ঘরের মধ্যে আজ এই মুহূর্তের দৃশ্যটির মুখোমুখি হয়ে দ্বিতীয় ডেপুটি ভাবলেন, সর্বনাশ, সেই তিনকড়ি কাহিনির মতো আরেকটা ঘটনা ঘটতে চলেছে। তিনি দ্রুত পদসঞ্চারে মন্মথকে তার কর্তব্যকর্ম থেকে নিবৃত্ত করতে এগোলেন।
মন্মথ দ্বিতীয় ডেপুটি সাহেবকে এগোতে দেখে ভাবল সাহেব আমাকে সাহায্য করতে আসছেন। কিন্তু তাঁর মুখমণ্ডলে প্রশ্নজটিল কুঞ্চন দেখে মন্মথ বুঝতে পারলে দুই নম্বর ছোটসাহেব ব্যাপারটা সম্যক অনুধাবন করতে পারেননি। মন্মথ দ্বিতীয় ডেপুটিকে বলল, বড়সাহেব চেয়ারের সঙ্গে সেঁটে গেছেন।
