গোলমেলে হিসেবের ফাইলটা বন্ধ করে মন্ত্রীর ঘরের দিকে যাওয়ার জন্যে সাত্যকি চপ্পলে পা গলিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠছিলেন, সে সময় মনে হল ফাইলটার যে জায়গাটা এইমাত্র দেখছিলেন, সেখানেই একটা গোঁজামিল রয়েছে। টেবিলের নীচে ঘেয়ো কুকুরের মতো লোম উঠে যাওয়া। কার্পেটের ওপরে পা থেকে চপ্পলটা খুলে দু মিনিটের জন্যে স্থির হয়ে বসলেন সাত্যকি। ফাইলটা আবার খুললেন।
এ অফিসে শান্তিতে মনোনিবেশ করে কোনও কাজ করার উপায় নেই। ফাইলটা খুলতে না খুলতে, একদল কর্মচারি তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইউনিয়নের নেতা, হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ এভাবে ঘরে ঢুকে পড়া সাত্যকি পাল পছন্দ করেন না। কিন্তু পছন্দ না করলেই বা উপায় কী, চাকরি করতে গেলে এসব মেনে নিতেই হয়।
আজকের ব্যাপার গুরুতর। কর্মচারি ইউনিয়নের মুখপাত্র আবিদ হোসেন জানালেন, স্যার, ডেসপ্যাঁচ সেকশনের মঞ্জু রায় হঠাৎ ভিরমি খেয়ে পড়ে গেছেন। মুখ দিয়ে ফেনা উঠছে আর গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে।
ভিরমি খাওয়া ব্যাপারটা ঠিক কী সে বিষয়ে সাত্যকি পালের কোনও পরিষ্কার ধারণা নেই। তা ছাড়া মঞ্জু রায় কে, তিনি স্ত্রীলোক না পুরুষমানুষ, সে বিষয়েও তার অজ্ঞতা রয়েছে। তদুপরি এ ব্যাপারে তার দায়িত্ব বা কর্তব্য কতটুকু সে সম্পর্কে সাত্যকি পাল সন্দিহান।
সাত্যকির মনে আছে, এর আগে একটা বাইরের অফিসে সারাদিন ঝামেলা লেগেই থাকত। সেখানে একদিন সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ অফিসে পৌঁছানো মাত্র একদল কর্মচারি হইহই করে ছুটে এল। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে জলের গেলাস। গেলাসের জলটা ক্ষীণ লালচে মতন দেখতে। এই রংয়ের জল সাত্যকির চেনা, প্রতিদিনই অফিসে তাঁকে এই জলটা খেতে হয়।
এই অফিসে প্রথম এসে তাঁরও মনে খটকা লাগে এই জল দেখে। কিন্তু তিনি পরে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন যে জলটাকে বিশুদ্ধিকরণ করতে গিয়ে পটাস পারমাঙ্গানেট ব্যবহারে এমন লালচে হয়ে যায়।
সুতরাং যখন বিপ্লবী কর্মচারিবৃন্দ গোটা দশেক লালচে জলের গেলাস হাতে সাত্যকিবাবুর ঘরে ঝাঁপিয়ে পড়ল, সাত্যকিবাবু মোটেই ভয় পেলেন না বা বিচলিত হলেন না, তিনি আন্দোলনকারীরা কিছু বুঝবার আগেই তার টেবিলের ওপরে রাখা গেলাসের সারি থেকে সামনের তিন চার গেলাস জল খেয়ে ফেললেন। তারপর আঃ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। রঙিন জল নিয়ে আন্দোলন এর পরে আর বিশেষ গড়ায়নি।
আজকের সমস্যা অবশ্য সাত্যকি পাল আরও সহজে সমাধান করলেন। তিনি ধুরন্ধর আমলা, সরকারি কাজে দীর্ঘ পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতা তাঁর। তিনি মঞ্জু রায়ের লিঙ্গ নির্ণয়ে বা কেস হিস্ট্রিতে গেলেন না, সরাসরি প্রস্তাব দিলেন, আমার তো বেরোতে বেরোতে সাতটা-সাড়ে সাতটা হয়ে যাবে, আপনারা ওঁকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যান, আমার গাড়িটা নিয়ে নিন। হাসপাতালে পৌঁছে গাড়িটা আমাকে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন।
কর্মচারিরা আসলে গাড়ি চাইতেই এসেছিলেন। সেটা সাত্যকি জানেন তিনি এও জানেন যে সহজে ওরা গাড়ি ছাড়বে না। মঞ্জু রায়ের বাড়িতে গাড়ি যাবে, তার আত্মীয়স্বজনকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে। তারপর নেতারা নিজ নিজ ঠেকে বা পাড়ায় ফিরবেন। সে গড়িয়া থেকে মধ্যমগ্রাম পর্যন্ত যেকোনও জায়গা হতে পারে। একবার তো একজন শ্যামনগরে শ্বশুরবাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, বুদ্ধিমান ড্রাইভার তেল ফুরিয়ে যাবে এই ভয় দেখানোয় তিনি পানিহাটিতে নেমে যান।
সাত্যকির কিছু যায় আসে না। সরকারি গাড়ি, সরকারি তেল, চারদিকে কত রকম অপব্যয়, সব ব্যাপারে মাথা গলাতে গেলে চলে না। তা ছাড়া এই সন্ধ্যাবেলায় অফিসের গাড়ি ছেড়ে দিলেও তার নিজের বাড়ি ফেরার কোনও অসুবিধে নেই। কাছেই পাতাল রেলের চার স্টেশনের মাথায় পৈতৃক বাড়ি। সেখানেই বসবাস। সন্ধ্যার পরে পাতাল রেলে তেমন ভিড় থাকে না, একটু হেঁটে বউবাজার দিয়ে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে পৌঁছলে তারপর পনেরো মিনিটের পথ। ট্রাফিকের ঝামেলা নেই।
কর্মচারিরা গাড়ি পেয়ে মোটামুটি খুশি মনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে সাত্যকির মনে পড়ল মন্ত্রিমহোদয় তলব করেছেন। দেরি হয়ে গেছে, এবার উঠতে হয়।
কিন্তু চেয়ার ছেড়ে ওঠা কি সহজ?
ইতিমধ্যে অবশ্য মন্ত্রিমহোদয়ের একান্ত সচিবের ফোন এসে গেছে, কী হল? দেরি করছেন কেন? মিনিস্টার আপনার জন্যে বসে আছেন।
এবার উঠতেই হয়। কিন্তু চপ্পলে পা গলিয়ে চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগেই সাত্যকির ডেপুটি একটা আধা হলদে মতন কাগজ নিয়ে ঘরের মধ্যে ঝড়ের মতো ঢুকল। বলল, স্যার, সর্বনাশ হয়েছে।
কী হয়েছে? সাত্যকি এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার আগেই ডেপুটি সাহেব বললেন, স্যার, এই দেখুন সান্ধ্য সুতানুটি, হেডলাইন আমাদের নিয়ে, আমরা নাকি জোচ্চোর, আমাদের অফিস নাকি জোচ্চোরের অফিস।
সাত্যকি এ জিনিস অনেক দেখেছেন, একটি খেলো পত্রিকার সান্ধ্য সংস্করণ কতজনই বা পড়ছে, একবার পড়লেই বা কী এসে যায়। ডেপুটিকে এই কথা বোঝানোর চেষ্টা করলেন সাত্যকি। কিন্তু ততক্ষণে আরেক ডেপুটি দুটি ফাইল হাতে প্রবেশ করলেন, দুটিতেই জরুরি পতাকা লাগানো, এর মধ্যে একটি আবার গোপনীয় নথি। সাত্যকি তার দুজন ডেপুটিকেই বললেন, আমি মিনিস্টার সাহেবের ঘর থেকে একটু ঘুরে আসছি। আপনারা পনেরো মিনিট পরে আসুন।
