দরজার ছিটকিনি খুলতে পারি না। গেঞ্জি গায়ে দিতে পারি না। মাথা আঁচড়াতে গেলে কঁধ থেকে কবজি পর্যন্ত চিনচিন করে ওঠে। বিছানায় পাশ ফিরতে পারি না।
প্রতিবেশী পরামর্শ দিলেন, খাট ত্যাগ করে, বালিশ-তোষক ছেড়ে শতরঞ্চি পেতে তক্তাপোশের ওপরে শোবেন। তা-ই করলাম।
বহুদর্শী রমেশ মামা আমার ছোট ভাইয়ের মুখে আমার অবস্থার কথা জেনে আমাকে পোস্টকার্ডে জানালেন, টক খাইবে না, জাপান খাইবে না, ঠান্ডা জল খাইবে না, কোনও রকম নেশাই চলিবে না, ঠান্ডা জলে স্নান চলিবে না, যথাসাধ্য সম্ভব গায়ে রৌদ্র লাগাইবে।
ভাদ্র মাসের তালপাকা রোদে কতক্ষণই বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা যায়। ব্যথা উপশম হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই, মধ্যে থেকে আমার মুখটা রোদে পুড়ে হনুমানের মতো কালো হয়ে গেল। চেহারার মধ্যে একটু হনুমানত্ব আমার চিরকালই ছিল, এবার হনুমান হতে বাকি রইল শুধু একটি ছোট লেজ। মনে মনে ধরে নিলাম, এতই যখন হল, সেও হয়তো একদিন প্রস্ফুটিত হবে। কিন্তু, তবুও যদি মহাবীর হনুমানের মতো সাবলীল লম্ফঝম্প করতে পারতাম, তা হলে এ নিয়ে আমার মনে খুব একটা দুঃখ থাকত না। সংক্ষেপে বলি, ব্যথা-যন্ত্রণা মোটেই কমল না। যখন সব আশা ছেড়ে দিয়েছি, ধরে নিয়েছি যে আগামী জীবন আমাকে এই অসহনীয় ভাবেই কাটাতে হবে, তখন আশার আলো দেখতে পেলাম।
আশার আলো মানে সত্যি আলো। প্রায় টেবিল ল্যাম্পের মতোই দেখতে। সুইচ জ্বাললে লাল কাঁচের ভিতর দিয়ে উত্তপ্ত আলোর বিচ্ছুরণ হয়, ফোলা জায়গায় ওই আলো ফেললে বেশ আরাম হয়।
কিন্তু তখন আমার ঊর্ধ্বাঙ্গে দুই হাতের বিস্তৃত এলাকাসহ কঁধ ডিঙিয়ে নীচে শিরদাঁড়া বেয়ে এবং ওপরে ঘাড় বেয়ে ফোলা ও বেদনা প্রসারিত হয়েছে। তদুপরি আমার এই বিপুল দেহ। এ রকম একটা-দুটো আলোয় আমার কিছু হওয়ার নয়, যদি এই আলো-চিকিৎসায় উদ্ধার পেতেই হয়, তা হলে অন্তত পনেরো-বিশটা এ জাতীয় ল্যাম্প একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।
ইতিমধ্যে অন্য একটা ব্যাপার হয়েছে। সেটা উল্লেখ করা প্রয়োজন।
আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভাদ্র মাস শেষ হতেই বাড়ি বদলালেন, কাছাকাছি কোথাও গেলেন। তার একটি মাথামোটা, গোদা পা হুলোবেড়াল ছিল। যাওয়ার দিন দেখলাম, তিনি বেড়ালটাকে ফেলে গেলেন না, গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন।
কিন্তু বেড়ালের যা স্বভাব। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে ফাঁকা বাড়িতে ফিরে এল। তারপর চেষ্টা করল আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকতে। এমনিতে বেড়াল এলেই আমরা দ্যাখ-মার করি, কিন্তু প্লেগের বাজারে বেড়ালটাকে আমরা দুধ-মাছ দিয়ে বরণ করে নিলাম।
কয়েক দিনের মধ্যে প্লেগের আতঙ্ক দূর হল। কিন্তু বেড়ালটা বড় বাড়াবাড়ি শুরু করে দিল। চুরি করা শুরু করল, ডাকাতিও আরম্ভ করল। আমাদের খাওয়ার সময়ে টেবিলের নীচে এসে রাহাজানি করতে লাগল। আমাদের খাবারের থালা থেকে মাছের টুকরো না দিলে বা দিতে একটু দেরি হয়ে গেলে সে তার শক্ত-সমর্থ গোদা পায়ে আমাদের লাথি মারতে লাগল। রীতিমতো অলরাউন্ডার–বা পা, ডান পা সমানে চলে। দুবার মেরে তাড়ালাম, একবার বস্তায় করে ফেলে এলাম। কিন্তু সে ঠিক ফিরে এল। একদিন টেবিলে বসে ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে পিঠে লাল আলো দিচ্ছি, বেড়ালটা বোধহয় ভেবেছে কিছু খাচ্ছি। পায়ের গোড়ালির গিটে পর পর দুবার সজোরে লাথি মারল। আমার কেমন মাথা গরম হয়ে গেল। আমি ল্যাম্পের মুখটা ঘুরিয়ে বেড়ালের মুখে তীব্র লাল আলো ফেললাম।
বেড়ালটা হকচকিয়ে গেল। তারপর ল্যাজ তুলে এক লাফে জানলার ওপরে উঠে, জানলা দিয়ে বাইরে লাফিয়ে পড়ল। অবশেষে চোঁচা দৌড়।
বেড়ালটা আর ফেরেনি। আমার ব্যথা-ফোলাও সম্পূর্ণ দূর হয়েছে, বোধহয় গোড়ালির গিটে বেড়ালের লাথি খেয়ে।
চেয়ার
মন্ত্রিমহোদয়ের ফোনটা এল পাঁচটা পঁচিশে। নিয়মমতো অফিস ছুটি হতে তখন আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। বিশেষ জরুরি কিছু না থাকলে মন্ত্রী সাধারণত ঠিক সাড়ে পাঁচটাতেই বেরিয়ে যান। সাত্যকির পক্ষে অবশ্য সেটা কোনও দিনই সম্ভব হয় না, দিনের কাজ শেষ করে বেরোতে বেরোতে তার প্রায় সাড়ে সাতটা-আটটা হয়ে যায়, কোনও কোনও দিন তার থেকেও দেরি হয়।
মন্ত্রিমহোদয়ের একটা ফোন প্রায় প্রতিদিনই ওই ছুটির মিনিট পাঁচেক আগে আসে। দিনের শেষে অফিস ছেড়ে যাওয়ার সময় দরকারি কোনও ব্যাপার থাকলে সেটা বলে যান।
আজও তাই হল, মন্ত্রী বললেন, মিস্টার পাল, একটু আসবেন? সাত্যকি পাল একটা গোলমেলে ফাইল দেখছিলেন, গত বছর যে কাজে বাহান্ন হাজার টাকা খরচ হয়েছে, এ বছর সেই একই কাজে এক লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কারণটা কী, যদি সত্যিই কোনও কারণ থেকে থাকে, সেটা খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
মন্ত্রীর তলব পেয়ে সাত্যকি যথারীতি ফোনে তাঁকে জানালেন, ইয়েস স্যার, এখনই আসছি স্যার। টেলিফোনটা নামিয়ে রেখে হাতের ফাইলটা বন্ধ করলেন সাত্যকি, তারপর নিজের টেবিলের দিকে তাকালেন। সাত্যকির টেবিল, সরকারি এলাকায় যাকে হেভি ডেস্ক বলে ঠিক তাই। সারাদিন ধরে গাদা গাদা ফাইল জমা হয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলিই বিশেষ জরুরি, ফেলে রাখা চলবে না। সব ফাইল খুঁটিয়ে দেখারও অবকাশ নেই। দায়সারা ভাবে সই করে ছেড়ে দিতে হয়।
