রাত দুপুর হল। একে একে সবাই চলে গেল। মেয়েটিও চলে গেল শোবার ঘরে। এমনকি একবারও তাকাল না হরিদাসের দিকে, ওর বাকি রাতের একমাত্র খদ্দের। হরিদাস সেই লোকটাকে দু’শ টাকা দিয়ে ওঠাল। লোকটা টাকাগুলো চালান করল কুৎসিৎ চেহারার প্রৌঢ়া বাড়িউলির কাছে। প্রৌঢ়া টাকাগুলো দেখতে লাগল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলোর নিচে। তারপর খুশি হয়ে দশ টাকার একটা নোট তুলে দিল লোকটার হাতে। লোকটা সালাম করে চলে গেল। ময়লা, পায়োরিয়ায় খাওয়া বিচ্ছিরি দাঁত বের করে প্রৌঢ়া চোখ টিপে হরিদাসকে বলল–
: বাবুজি, এবার যান ভেতরে। তবে একটু সাবধান। মেয়েটা নতুন কি না–আপনি তো জানেন সবকিছু।
পরমুহূর্তে হরিদাস ঢুকে পড়ল ঘরে।
সতর্কতার সঙ্গে ভালো করে দরজার আগল লাগাল সে। দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে মেয়েটি বসেছিল খাটের উপরে চিন্তাকুলভাবে। হরিদাস এগোল সেদিকে। হরিদাসকে দেখেই মেয়েটি সমসহকারে উঠে পড়ল। দৃষ্টি মেঝেয় নিবদ্ধ। তারপর জুতোর ফিতে খুলে দিতে বসল। হয়তো এই হুকুম ছিল বাড়িউলির।
: ছেড়ে দাও–
কর্কশর হরিদাসের কণ্ঠে। পায়ের কাছে নতজানু হয়ে বসা একটা মুসলমান। মেয়েকে দেখে বেশ তৃপ্তি বোধ করছে সে।
: গায়ের কাপড় সরাও—
কম্পিত হাতে মেয়েটি শাড়ি খুলে ফেলল। কেবল রইল পেটিকোট আর ব্লাউজ।
: এগুলোও–
অসহায় লজ্জায় ও দেয়ালের দিকে মুখ ফেরাল। … পেটিকোটটা ঝুপ করে মাটিতে খসে পড়ল। হরিদাসের হাত পকেটের ছুরির ওপর।
: তোমাকে সম্পূর্ণ ন্যাংটো দেখতে চাই। বুঝেছ? … এখানো হয়নি। দু’শ’ টাকা নগদ দিয়েছি তার জন্যে।
মেয়েটি মুখ ফেরাল। চোখে অব্যক্ত ভিক্ষার নিদারুণ কারুণ্য। আশা ঐ মধ্যবয়সী খদ্দেরটার যদি দয়া হয়। হয়তো তার মনে দয়া হতে পারে, ওর সম্পূর্ণ নগ্নতার ওপরে জেদ না-ও করতে পারে।
: জলদি কর হরিদাস গর্জে উঠল নির্দয়ভাবে। আমার সময় নেই।
পকেটের ভেতরে ছুরির ধার পরীক্ষা করছে তার হাত। মেয়েটি সুইচের দিকে এগোবার চেষ্টা করল।
: না–পথরোধ করে দাঁড়াল হরিদাস।
: অন্ধকার নয়–
জানকীর কী হয়েছিল? খোলা রাস্তার ওপরে দিনের আলোয় কি তার ইজ্জতহানি করা হয়নি?
ব্লাউজ খুলল মেয়েটি। সুগঠিত স্তনযুগলের যৌবন-রেখার স্পষ্টতা ঢাকা রয়েছে। কাঁচুলির তলায়।
: এটাও…
ছুরি প্রস্তুত। আবার মেয়েটি তাকাল তার দিকে। চোখে করুণ ভিক্ষার আবেদন।
এইভাবেই জানকী তাকিয়েছিল হৃদয়হীন পশুগুলোর দিকে। কিন্তু তারা কণামাত্র দয়াও দেখায়নি। না, হরিদাসও দেখাবে না।
হাতের আঁজলা দিয়ে মেয়েটি মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল। কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল স্তনের ওপর।
হরিদাসের ডান হাতে ঝকমক করে উঠল ছুরিটা, মৃত্যু আঘাত হানতে উদ্যত। অপর হাতে মেয়েটির হাত দুটো হিঁচড়ে নামাল মুখ থেকে। ও দেখুক হরিদাস কী করতে যাচ্ছে। জানকীও তো দেখেছে। এই মুহূর্তটির জন্যেই তার দীর্ঘ দশ মাসের অধীর প্রতীক্ষা। লাল আর হলুদ শিখা নাচছে উল্লাসভরে।
হরিদাসের এক হাতে উদ্যত ছুরি আর অপর হাত পাশব ভঙিতে বুকের কাঁচুলির দিকে এগিয়ে আসতে দেখেই মেয়েটি আর্তনাদ করে উঠল। করুণ, তীব্র, মরণ আর্তনাদ। চোখে মৃত্যুভীতির গাঢ় ছায়া।
হরিদাস দেখল সে চোখে আরও কিছু আছে-ভীতির সঙ্গে ঘৃণা আছে। করুণা ভিক্ষার আবেদন স্পষ্ট, আর রয়েছে সম্পূর্ণ অসহায়তা। ঠিক জানকীর চোখের দৃষ্টি। কিন্তু তবু সে দৃষ্টি জানকীকে বাঁচাতে পারেনি। বিদ্যুৎচমকের ক্ষিপ্রতায় হরিদাসের বাঁ হাত স্পর্শ করল মেয়েটির কাঁচুলি। এ কি, কাঁচুলি এত ভারি ঠেকছে কেন? তবু হ্যাঁচকা টান মারল কাঁচুলিটায়। আর এর সঙ্গে…
ছুরিটা শূন্যেই উদ্যত হয়ে রইল। লজ্জায় হরিদাস চোখ ফেরাল। মাত্র একটি কথা শব্দ হয়ে ফসকে বেরিয়ে এল তার নিবদ্ধ ঠোঁট দুটোর কাছ থেকে :
‘বেটি!
কাঁচুলির নিচে যেখানে সে ছুরির আঘাত করতে যাচ্ছিল সেখানে দেখল স্তন দুটো নেই। মিলিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। সেখানে কিছুই নেই…কিছুই নেই…
[অনুবাদক : অজ্ঞাত]
মা – কুদরতুল্লাহ শাহাব।
মায়ের জন্মতারিখ সঠিক জানা যায়নি।
যে সময় লায়ালপুর জেলায় নতুন আবাদি বসেছিল, পাঞ্জাবের প্রত্যেক গাঁও থেকে ভূমিহীন লোকেরা জমি পাওয়ার আশায় এই নতুন কলোনির দিকে দলে-দলে ছুটে এসেছিল তখন। সাধারণ লোকেরা তখন লায়ালপুর এবং সারগোদা প্রভৃতি অঞ্চল বার এলাকা নামে চিনত। সে সময়ে মায়ের বয়স ছিল দশ-বারো বছর। এই হিসাবে মায়ের জন্মতারিখ গত শতাব্দীর শেষভাগের দশ-পনেরো বছরের যে-কোনো এক সময়ে হয়ে থাকবে।
মায়ের বাপের বাড়ি আম্বালা জেলার রুপোড় মহলকুমার মেনিলা গ্রামে। সেখানে তাদের কিছু জমি-জমা ছিল। তখন রুপোড়ে শ থেকে সেরহিন্দ খাল খনন করা হচ্ছিল। নানাজির জমি পড়ে গেল সেই খালের মধ্যে। রুপোড়ের ইংরেজ কর্তৃপক্ষের দফতর থেকে এ-সব জমির ক্ষতিপূরণ দেয়া হত। নানাজিও দু’-তিনবার ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য শহরে গেলেন; কিন্তু সোজা লোক ছিলেন তো, জানতেন না কর্তার। দফতর কোথায় আর ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হলে কী করতে হয়। শেষে খোদাকে শোকর জানিয়ে চুপ করে বসে রইলেন এবং খাল খননে মজুরের কাজ করতে লাগলেন।
এই সময়ে খবর পাওয়া গেল যে, বার এলাকায় নতুন আবাদি হচ্ছে আর বিনামূল্যে জমি দেয়া হচ্ছে নতুন বসতি স্থাপনকারীদের। নানাজি তাঁর স্ত্রী, দুটো ছোট ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে লায়ালপুর রওনা হলেন। যানবাহনের সংস্থান ছিল না, তাই হেঁটেই চললেন।
