ভয়ে গুটিয়ে থাকে রুস্তম। দিনের বেলা বেদে-বেদেনিরা থাকে গাওয়ালে, সে থাকে নাও পাহারায়। নাও ছেড়ে ডাঙায় নামে না।
কিন্তু রাতের বেলা রুস্তম রুস্তমই। বেদেনিরা গাওয়ালে গিয়ে স্বচ্ছল গেরস্তের ঘরদোর রেকি করে আসে। রাতের বেলা রুস্তম আর দুতিনজন তাগড়া জোয়ান বেদেনির পিছ পিছ যায় সিঁধ কাটতে। সাত বছরের চুরির পয়সা ম্যালা জমেছে রুস্তমের। এবার বহরটা ছাড়তে হয়। কিন্তু ছাড়ার আগে একটা মেয়েমানুষ চাই রুস্তমের। ডগমগ বয়েস। রুস্তমের ভার বইতে পারবে, এমন।
গোয়ালীমান্দ্রার খালে, এককুড়ি বেদের নাও দিনদুপুরে পাহারা দিতে দিতে রুস্তম এইসব ভাবে। ঠিক তখুনি গুটি গুটি পায়ে ঝুমঝুমি এসে দাঁড়ায় রুস্তমের নাওয়ের সামনে। দুপুরবেলা।
.
ঝুমঝুমি দেখে বহরটা নিটাল পড়ে আছে। জনমনিষ্যির সাড়া নেই। বেদে-বেদেনিরা সকালবেলা বেরিয়ে গেছে গাওয়ালে। বুকে দুধ খায় এমন বাচ্চাগুলোকে ঝোলায় বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে নিয়ে গেছে। হাঁটাচলা করতে পারে এমনগুলো নাওয়েই থাকে। এখন নেই। কোথায় কোথায় ঘুরে বেরাচ্ছে, ডাংগুলি খেলছে কে জানে। সাপখোপের ভয় নেই, জলে ডুবে মরার ভয় নেই। জন্মেই সাপ আর জলের সঙ্গে গলাগলি।
বহরটা নিটাল দেখে বুকের ভেতর শিরশির করে ঝুমঝুমির। নাওয়ের মানুষটা একলা আছে, ঝুমঝুমি জানে। সকালবেলা দেখেছে। বেদে-বেদেনিরা সব গাঁওয়ালে গেছে, সে আছে পাহারায়। একটা পা খোঁড়া, হাঁটা চলার অসুবিধে। নাও পাহারা দেয়া ছাড়া মানুষটার আর কাজ কী!
তয় শরীর স্বাস্থ্যখান মানুষটার খোদাই ষাড়ের মতন। মাথায় বাবরি চুল, মুখে বাকসা ঘাসের মতন দাড়ি-গোঁফ। চোখ দুইখানা ইঁদুরের চোখের মতন। কুকুৎ করে তাকালে বুকের ভেতর বান ডাকে। সকালবেলাই ঝুমঝুমি সব দেখেছে। দেখে আর আখড়ায় থাকতে পারেনি। ওই চোখে কী আছে! ঝুমঝুমির এমন পাগল পাগল লাগে কেন?
কোন মরদ কি কখনও এমন করে ঝুমঝুমির দিকে তাকিয়েছে!
কিন্তু মাইয়ামানুষ চিরকাল মাইয়ামানুষ। বহরটার কাছাকাছি এসে ঝুমঝুমির বুকের ভেতর দুনিয়ার শরম ঢুকে যায়। অকারণে বুকের আঁচল টানে, পাছায় হাত বুলিয়ে বসন ঠিকঠাক করে। আড়চোখে দেখে, নাওয়ের ভেতর বসে খালি গায়ে, লুঙিখান হাঁটুর ওপর তোলা, মানুষটা উদাস হয়ে বিড়ি টানছে। দেখে ঝুমঝুমি মাথা নিচু করে। একবার ইচ্ছে হয় দৌড়ে পালায়। কিন্তু খালপাড়ের বাইলামাটি যেন জোর করে পা আটকে রাখে তার। ঝুমঝুমি নড়তে পারে না।
তখন চারদিকের পৃথিবীতে ছিল দুপুরের নির্জনতা। রোদ, হাওয়া। খালের জলে ছিল চোরাস্রোত। ওপারের গাছপালা থেকে উড়ে উড়ে আসছিল জলে রোদ আর হাওয়ার খেলা। বেদে নাওয়ের ছইয়ে বসা ঘুঘু ডাকছিল থেকে থেকে। ঘুঘুর ঘুঘ ঘুঘুর ঘুঘ।
.
নাওয়ের ভেতরে বসে রুস্তম দেখে সকালবেলার সেই মাইয়ামানুষটা। ডগমগ বয়স তার। শরীরখানা জোয়ারে খাল যেন।
দেখে রুস্তমের দম বন্ধ হয়ে আসে। গলা খাঁকারি দিয়ে কথা কয় রুস্তম, তুমি কেডা গো?
ঝুমঝুমি মাটির দিকে তাকিয়ে বলে, সাদুর বইন।
কোন সাদু?
গোয়ালীমান্দ্রায় আবার সাদু কেডা! বলে খিলখিল করে হেসে ওঠে ঝুমঝুমি। আমি মমিন সাদুর বইন গো!
শুনে রুস্তম হাসে। কোদালের মতো ময়লা নোংরা দাঁত মুখের ভেতর ঝিকিয়ে ওঠে। ও সাদুর বইন আস, নৌকায় আস।
না, নৌকায় আসুম না। মাইনষে দুন্নাম দিব।
মাইনষের দুন্নামে কী অইব, ভাতারে দুন্নাম না দিলেই অয়।
শুনে ঝুমঝুমি আবার হাসে। হেসে গড়িয়ে পড়ে।
রুস্তম অবাক হয়ে বলে, হাস কেন?
তুমার কতা শুইনা হাসি।
খারাপ কতা কইলামনি?
ভাতারঐ নাই, দুন্নাম দিব কেডা?
শুনে রুস্তমের বুকের ভেতর খালের কোমল জল কলকল করে ওঠে।
মাইয়ামানুষটারে যদি ভাও করন যায়, তাইলে আইজ রাইতেই একখান নাও লইয়া ভাগুম। রুস্তম তারপর গলা নরম করে বলে, তয় ডর কী? আস নাওয়ে আস।
ঝুমঝুমি নাওয়ে পা দেয়। তার শরীরের ভারে নাওটা জলের ওপর নড়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে রুস্তমের বুকের ভেতরটাও।
নাওয়ে ঝুমঝুমি একটু গা বাঁচিয়ে বসে। তারপর রুস্তমের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, আমারে লইয়া নাও ছাইরা যাইবা নাতো?
বলে হাসে।
রুস্তম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, হেই কপাল আমার নাই। আমার লগেনি কোনও মাইয়া মানুষ ঘর ছাড়তে রাজি অইব।
মাইয়া মানুষের রাজি অরাজি মুখে ফুডে না। মুক দেইক্কা বুঝতে অয়।
এ কথায় জাউরা রুস্তমের বুকের ভেতরটা আবার কাঁপে।
সেই দুপুরে বেদে নাওয়ের ভেতর ঝুমঝুমি জীবনে প্রথম পুরুষ মানুষের শরীরের স্বাদ পায়। পেয়ে পাগল হয়ে যায়। পুরুষ মানুষের স্বাদ না পেলে নারী বৃথা, ঝুমঝুমি বুঝে যায়। আখড়ায় ফেরার সময় রুস্তমের গলায় জড়িয়ে বলে আসে, তুমি হজাগ থাইকো নিশিরাইতে আমু।
.
সাধু আখড়ায় ফেরে সন্ধ্যাবেলা। গেছল সীতারামপুর। ইব্রা জোলার যুবতী মাইয়ারে ধরছে ভূতে। ছাড়িয়ে এল। এসব কাজ ছেড়ে ফেরার পর সাধু খুব ফূর্তিতে থাকে। টাকে নগদ পয়সাটা থাকে। মাথায় থাকে গাঁজার নেশা। কখনো উপরি পায় বাগানের ফলপাকুর, আনাজপাতি, ছাগল কিংবা মুরগি। ইব্রা জোলার বাগানে আনাজপাতি ছিল না, ফলপাকুর ছিল। পালে ছিল না ছাগল মুরগি। মাঝারি আয়ের জোলা। তাঁত চলে সাতখান। কাপড় বুনে খায়। খুশি হয়ে ঝুমঝুমির জন্যে লালনীল ডোরা কাটা একখানা শাড়ি দিয়েছে।
