শাড়িটা বগলে নিয়ে আখড়ায় ফিরে সাধু। ফিরে দেখে ঝুমঝুমি বটতলায় দাঁড়িয়ে, সন্ধ্যেবেলার হাওয়া খেলছে তার খোলা চুলে। ঝুমঝুমি একটু আনমনা। গুনগুন করে গান গাইছেঃ রসিকা নাগরবন্ধু কথা কইয়া যাও, একবার কইয়া যাও বন্ধু আমায় লইয়া যাও।
সাধু গিয়ে পাশে দাঁড়ায়। ঝুমঝুমি টের পায় না। দেখে সাধু খুব অবাক। গাছ থেকে পাতা পড়ার শব্দেও চমকায় ঝুমঝুমি, আর একটা মানুষের পায়ের শব্দ পাচ্ছে না!
সাধুর বুকের ভেতরটা কী জানি কী আশঙ্কায় কাঁপে।
গলায় খাকারি দেয় সাধু। শুনে চমকে উঠে ঝুমঝুমি। তারপর হেসে বলে, কাম অইছে?
শুনে সাধু সব ভুলে যায়। শাড়িটা ঝুমঝুমির হাতে দিয়ে বলে, কাম অইব না। কছ কী! মমিন সাধু গেছে না!
ঝুমঝুমি তখন সন্ধ্যার আবছা আলোআঁধারিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে শাড়িটা।
সাধু বলল, পছন্দ অইছে?
হ, ভালো শাড়ি আনছ।
এ কথায় সাধুর ফূর্তিটা বাড়ে। আখড়ায় ফিরতে ফিরতে ভূত ছাড়ানোর গল্পটা ঝুমঝুমিকে বলে। ইব্রার মাইয়াডার জ্ঞানবুদ্দি ভালা না। কালী সন্ধ্যায় গেছে তেঁতইল তলায় পেসাপ করতে। ইব্রার তেঁতইল গাছটা দুষি। একজন আছে। ভাও মতন পাইছে মাইয়াডারে, আর ছারে নাই। ম্যালা তেক্ত করছে। পয়লা কয়, এক মোন মিষ্টি দে। আমি কইলাম, গরিব মানুষ, এত মিষ্টি দিব কেমনে? হোনে না। ম্যালা চেষ্টাচরিত্র কইরা শেষমেষ হুকনা মরিচ পোড়া দেওনের ডর দেহাইয়া সোয়াশের মিষ্টিতে রাজি করাইয়া ছাড়াইলাম। আমাবইশ্যার রাইতে তেঁতইল তলায় দেওন লাগব মিষ্টিডি।
ঝুমঝুমির কানে এসব কথা যাচ্ছিল না। ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে সে। কখন সাধু ঘুমোবে, কখন সে ওঠে যাবে রুস্তমের কাছে। নিশিরাতের কত দেরি!
আখড়ায় ঢুকে কুপি জ্বালিয়ে ঝুমঝুমি বলল, তুমি বাতপানি খাইয়া লইয়ো। আমার শইল ভালা না। আমি হুইয়া পড়লাম। ঘরের কোণে হোগলা পাতা। ঝুমঝুমি সেই হোগলার ওপর শুয়ে পড়ে। চোখ বুজে রুস্তমের কথা ভাবে। রুস্তম নৌকা নিয়ে বসে থাকবে। ঝুমঝুমি গেলেই চুপি চুপি খালের জলে নৌকা ভাসাবে।
সাধু বলল, তুই বাতপানি খাইছচ?
হ।
ঝুমঝুমি তারপর আবার রুস্তমের কথা ভাবতে থাকে। সাধু তখন আখড়ার মাঝ মধ্যিখানে কুপিখান রেখে গাঁজার ভাণ্ড নিয়ে বসেছে। ভূত ছাড়িয়ে ফেরার পর বেদম গাঁজা টানে সাধু। টেনে মরার মতো ঘুমোয়। এমন ঘুম, কানের কাছে ঢোলডগর বাজালেও জাগে না।
কথাটা ভেবে ঝুমঝুমির বুকে উথালপাতাল আনন্দ। নিশিরাতে সে রুস্তমের নাওয়ে গিয়ে চড়বে। সাধু টেরও পাবে না। কী সুখ, কী সুখ গো!
সুখের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে ঝুমঝুমি!
খালপাড়ে কুকুর ডেকে ওঠে মাঝরাতে। ঘুমের ভেতর থেকে শব্দটা পায় ঝুমঝুমি। তারপর ধড়ফড় করে ওঠে বসে। আখড়ার ভেতর তখন জ্বলছে কুপি। সেই আলোয় ঝুমঝুমি দেখে সাধু কুঁকড়েমুড়ে শুয়ে আছে ঝাপের সামনে। তার নাক ডাকার মৃদু শব্দ উঠছে থেকে থেকে। বেদম গাঁজা টেনেছে সাধু। নেশার ঘুম। সকালের আগে ভাঙবে না। ভেবে বুকের ভেতরটা খুশিতে নাচে ঝুমঝুমির। আস্তেধীরে সাজগোজ করতে বসে সে। সন্ধ্যেবেলায় পাওয়া নীল ডোরাকাটা শাড়িটা পরে। একটা মাত্র ব্লাউজ ঝুমঝুমির, একটা মাত্র ছায়া, সেগুলো পরে। সাধুকে লুকিয়ে হাট থেকে সস্তা স্নো কিনেছিল, পাউডার আলতা কিনেছিল। সাধুর ভয়ে কখনও ব্যবহার করা হয়নি। টিনের ফুলতোলা ছোট্ট বাক্সে তুলে রাখা হয়েছিল। এই রাতদুপুরে ঝুমঝুমি বাক্সটা খুলে মুখে স্নো পাউডার মাখে, পা রাঙা করে আলতায়। তারপর টিনের বাক্সটা বুকে চেপে পা টিপে টিপে ঝাঁপ খুলে বেরোয়।
বাইরে বেরিয়েই মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়ায় ঝুমঝুমি। বুকের ভেতরটা উথালপাথাল
করে। নিকষ অন্ধকার চারদিকে। বটের পাতায় সড়সড় করে বইছে হাওয়া। এতকালের পুরনো সংসার ছেড়ে যাচ্ছে ঝুমঝুমি। কেন যে কান্না পায়!
খালপাড় এসে ঝুমঝুমি দেখে অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলছে রুস্তমের বিড়ি। বহর থেকে একটু দূরে ছোট্ট একখান টানের ছইঅলা নাও নিয়ে অপেক্ষা করছে রুস্তম। কথাবার্তা না বলে ঝুমঝুমি সেই নাওয়ে গিয়ে ওঠে।
রুস্তম নাও ছেড়ে দেয়।
ভোররাতে চাঁদ উঠেছিল সেদিন।
ধনুকের মতো বাঁকা চাঁদ। খালের কোমল জলে এসে পড়েছিল চাঁদ আর নক্ষত্রের ম্লান আলো। মিহিন একটা হাওয়া ছিল চরাচরে। আর ছিল নির্জনতা। সেই নির্জনতা ভেঙে দূরে বহুদূর থেকে থেকে ডাকছিল একটা রাতপাখি। পাখির ডাকের সঙ্গে মিলেমিশে রুস্তমের বৈঠা পড়ছিল খালের জলে।
তার পায়ের কাছে বসে কী জানি কী সুখে কিংবা দুঃখে গুনগুন করে কাঁদছিল ঝুমঝুমি। ঝুমঝুমির এই কান্নার অর্থ পৃথিবীর কেউ বোঝে না।
.
ভোরবেলা ঘুমের ভেতর সাধুর বুকের ভেতরটা কাঁপে। ধড়ফড় করে ওঠে বসে সাধু। তারপর চমকে ওঠে। আখড়ার ঝাঁপ খোলা, আখড়ায় ঝুমঝুমি নেই। এত সকালে ঝুমঝুমির ঘুম ভাঙে না। হররোজ সাধুই ডেকে ডেকে ঘুম ভাঙায় ঝুমঝুমির। ওলো ঝুমঝুমি গা তোল, বেইল অইয়া গেছে।
আজ কী হল? এত সকালে ওঠে ঝুমঝুমি গেল কোথায়?
সাধু আখড়া ছেড়ে বটতলায় যায়। ভাবে, ঘাট সারতে গেছে ঝুমঝুমি, এই এল।
বটের গোড়ায় বসে থাকে সাধু। আর ঝুমঝুমির অপেক্ষা করে।
দেখতে দেখতে বেলা ওঠে। পুব আকাশ লাল করে ওঠে পুরোনো সূর্য। রোদ লাফিয়ে নামে পৃথিবীতে। আর আসে হাওয়া। বটের পাতায় আর হাটখোলার শূন্য চালাঘরে খেলা করে যায়। একটা দুটো কাক, একটা দুটো শালিক হাটখোলার বিরান মাটিতে নেমে চরে।
