সাধু গেছে সীতারামপুর। ইব্রা জোলার যুবতী মাইয়ারে ভূতে ধরছে। সেই ভূত ছাড়াইতে গেছে সাধু। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। ঝুমঝুমির কোনও কাজ নেই। মনটা পড়ে আছে বেদের বহরে। মানুষটা অমন করে তাকিয়েছিল কেন? ঝুমঝুমির শরীরের ভেতর অমন করে কেন? বুকের ভেতরটা কাঁপে কেন? বারবার কেন ছুটে যেতে ইচ্ছে করে মানুষটার কাছে?
দুপুরবেলা ঝুমঝুমি আবার খেয়াঘাটের দিকে যায়। মানুষটা একলা একলা আছে নাওয়ে। নিরালায় ঝুমঝুমি যায় কথা কইতে। পুরুষ মানুষের সঙ্গে গোপনে কথা কওয়া সে যে বড় সুখের।
ঝুমঝুমি জানত না ওই নাওয়ে ওঁৎ পেতে আছে তার মরণ!
.
জন্মের পর রুস্তম দেখেছে একটা গঞ্জের হাট। ম্যালা মানুষজন, পাইকার মহাজন, চোর। ছেচড়। জগৎসংসারে রুস্তমকে লোকে বলত জাউরা রুস্তম। রুস্তম জাউরা কথার মানে বুঝত না। একগাল হেসে ভিখ মাগত।
গঞ্জের মানুষের দয়াধম্মে ছিল। আনিটা দোআনিটা রুস্তমকে তারা দিত। একটা পেট চলে যেত রুস্তমের। পয়সাটা জমত, খাওয়াটা হত দাকানিদের বাসিপচা খাবার খেয়ে। শোয়ার চিন্তা ছিল না রুস্তমের। গঞ্জের ফকিরফাঁকরার সঙ্গে খোলা চালাঘরে শুয়ে রাত কাটাত। বালক বয়সে রুস্তম দেখতে ছিল নধরকান্তি। গঞ্জের জোয়ান ভিক্ষুকরা রাতের বেলা আলাদা খাতির করত রুস্তমকে। নিজের ভাগের খাবারটা দিত, বিড়িটা সিগ্রেটটা দিত। কখনো আনিটা, দোআনিটা পর্যন্ত। বিনিময়ে রুস্তমকে সঙ্গে নিয়ে শোয়া। তারপর রাতের বেলা রুস্তমের শরীর ঘাঁটাঘাঁটি। সমকামে বালক বয়সেই রুস্তম বেশ পাকাপোক্ত হয়ে যায়।
তারপর যুবা বয়সে পা দিতে না দিতে পায় মেয়েমানুষের শরীরের স্বাদ। দুনিয়ার ম্যালা রহস্য জেনে গেল জাউরা রুস্তম।
ডান পাটা জন্ম থেকে খোঁড়া। ফলে যুবা বয়সে তাগড়া জোয়ান শরীরটা নিয়েও ভিখ মাগাটা ছাড়ল না রুস্তম। খোঁড়া পাটা সম্বল। লোকে পা দেখে পয়সা দেয়, দোকানিরা বাসিপচা খাবার দেয়। বিনা কাজে, বিনা পুঁজিতে পেট চলে যায় রুস্তমের।
ট্যাঁকে পয়সাটাও জমে। আজাইরা খাওন পাইলে গতর খাটায় কে!
গঞ্জে মানুষ তাগড়া জোয়ান রুস্তমকে দেখে মাঝেমধ্যে জাউরার পো বলে গাল দিত। কাম কইরা খাইতে পারছ না? জুয়ান মরদ মানুষ, শরম লাগে না ভিক্কা করতে?
রুস্তম ডান পাটা দেখিয়ে বলত, পাওখানা যে ন্যাংড়া। কাম করুম কেমতে?
শুনে লোকে থেমে যেত।
আসলে খোঁড়া পায়ে কাজ করতে রুস্তমের অসুবিধা ছিল না। গায়ে ভূতের মতন তাকত। আড়াইমণি চালের বস্তা অনায়াসে পিঠে বয়ে নিতে পারত রুস্তম। নিত না। গতর খাটতে মন চায় না। অভ্যেস। সেই বয়সেই রাতেরবেলাটা বেদম ফূর্তিতে কাটত রুস্তমের। গঞ্জে বেবাক ফকিন্নি রুস্তমের ন্যাওটা। ছুঁড়ি থেকে বুড়ি পর্যন্ত। ফি রাতে দুতিনজনের বসন খুলত রুস্তম। বছর ঘুরতে না ঘুরতে প্রত্যেকের কোলে ছাও। গঞ্জের মানুষ টের পেত না। ফকিন্নিরাও মুখে রা করত না। ছাও কোলে ভিখ মাগার সুবিধে। ছাও হইল একখান পুঁজি। সব দেখে শুনে রুস্তম গোপনে খ্যাক খ্যাক করে হাসত।
গঞ্জের পূর্বদিকে, হাটখোলার শেষ প্রান্তে ছিল বেশ্যাপাড়া। একটা বয়সে রুস্তম পাড়ায় পড়ে থাকত। বাঁধা মেয়েমানুষ ছিল কজন। দিনমান তাদের ঘরে পড়ে থাকত। নেশাভাঙ করত। চরকির জুয়া বসিয়েছিল নিজে। দিনভর, রাতভর জুয়া খেলত। জুয়ায় আয়বরকত ভালো। মাস ছয়েকের মধ্যে চেহারাসুরৎ পাল্টে গেল রুস্তমের। জাউরা রুস্তম হয়ে গেল পাড়ার সরদার। বেশ্যাপাড়া রুস্তমের নামে কাঁপে। যে কোনও বেশ্যাঘরে রাত কাটাতে রুস্তমের পয়সা লাগে না। তয় গুণ একখান ছিল রুস্তমের। কথা বলত বাঘের গলায়। কলিজাখান ছিল পেটভরা। গলার জোরে সাহসের জোরে রুস্তমের কাছে পার পেত না কেউ। আর শরীর স্বাস্থ্যখান ছিল খোদাই ষাঁড়ের মতন। যেমন তেমন তিন মানুষের তাকত রাখত গায়ে। পাড়ার নূতন আমদানি বেশ্যারা রুস্তমের সঙ্গে এক রাত কাটিয়ে পরের রাতে খদ্দের নিতে পারত না ঘরে। গা গতরে এবং গোপন অঙ্গে ব্যথা হত তাদের।
বেশ্যাপাড়ায় রুস্তমের দিন কাটছিল রাজাবাদশার হালে। কিন্তু কপালের ফের, জুয়ার আসরে মাতবর চরের এক পেঁয়াজ রসুনের বেপারিকে গলা টিপে মেরে ফেলল রুস্তম। তারপর রাতারাতি গঞ্জ ছেড়ে হাওয়া। থানাপুলিশের ভয়ে জীবনটা পাল্টে গেল রুস্তমের। তারপর আজ সাত বছর বেদের বহরে পালিয়ে আছে রুস্তম। ভয়টা এখনও যায়নি। খুনের মামলার মেয়াদ নাকি বারো বছর থাকে। কথাটা কে জানে কার কাছে। শুনেছে রুস্তম। সত্যমিথ্যা জানে না। শুনে বিশ্বাস করেছে। বারো বছর পুরতে আর পাঁচ বছর। পাঁচ বছর পর রুস্তম বেদের বহর ছেড়ে যাবে। তারপর আবার সেই গঞ্জ। বেশ্যাপাড়ার সর্দারি, একেক রাতে একটি মেয়েমানুষের অঙ্গ।
বেদের বহরে মেয়েমানুষের অভাব। গোণা প্রতি মেয়েমানুষ। তার আবার একেকজনের সঙ্গে একেকজন ঘর করে। সময় সুযোগ বুঝে ভাও করা কঠিন। কৃচিৎ দু একজন হয়। তার জন্যে কতকাল অপেক্ষা। শরীরের ভেতরটা চৌপহর তাতিয়ে থাকে রুস্তমের। কোন গঞ্জে কিংবা হাটেবাজারে বহর থামলেই ইচ্ছে করে বেশ্যাপাড়া ছুটতে। ছোটা হয় না। মাথার উপর খুনের মামলা ঝুলছে। ভয়। কখন কোন পাড়া গিয়ে কার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, তারপর থানাপুলিশ। ফাঁসি।
