যেদিন আয়বরকত ভালো, সাধুর সেদিন খুব ফূর্তি। পয়সাপাতি ট্র্যাকে খুঁজে খালি গায়ে সাধু গিয়ে বসে বটতলায়। সেখানে চৌপ্রহর হোগলা পাতা, গেঁজেল সাকরেদরা বসে থাকে। অলস হাতে গাঁজা বানায়, টানে। নেশা হলে একটা-দুটো কথা বলে সাধু। চেঁচিয়ে ঝুমঝুমিকে ডাকে, ওলো ঝুমঝুমি ভাত চড়া।
আলগা চুলোয় ভাত চড়িয়ে ঠিলা কাঁধে ঝুমঝুমি যায় হালে পানি আনতে। যাওয়ার আগে সাধুকে গালাগাল করে যায়, তোমার ভাত রানতে রানতেই দিন যাইব আমার! নিজে একখান মাগ আনতে পার না! আমার সর্বনাশ করতাছ কেন?
নিজের বিয়ের কথা স্পষ্ট করে বলে না ঝুমঝুমি। হাজার হোক মেয়েমানুষ তো, মুখ ফোটে না। তবে বেঁকা কথায় সাধুকে বুঝায়। সাধু বুঝেও বুঝে না। গাঁজার নেশায় ঘ্যাক ঘ্যাক করে হাসে। তুই হইলি আমার লক্ষ্মী। আমার তন্ত্র। মাগ আনলে তন্ত্র নষ্ট অইব। শুনে সাকরেদরা মাথা নাড়ে।
এভাবে দিন যায়। বৈশাখ শেষ হয়ে জষ্ঠি মাস পড়ে। খালে নূতন জোয়ারের জল ফুলে ফুলে ওঠে। যখন তখন মহাজনি নাও যায়। হাটবার ছাড়াও জায়গাটার কোলাহল থাকে। ঝুমঝুমির মনে পুরনো ফূর্তিটা ফিরে আসে। হাটবার ছাড়া জায়গাটা বড় নিরালা। শূন্য চালাঘর আর বটের পাতায় বাতাসের শব্দ ছাড়া অন্য কোনও শব্দ থাকে না। শব্দহীনতা ঝুমঝুমির বড় কষ্ট। জষ্ঠির মাঝামাঝি একটা বেদের বহর এসে লাগে হাটখোলায়, সাধুর আখড়ার অদূরে। এক কুড়ি নাও। নাওয়ের ভেতর মানুষের ঘরবাড়ি। বহরটা এসে লাগে সন্ধ্যায়। সন্ধ্যেবেলাই সেদিন নিকষ অন্ধকার নেমেছিল চারদিকে। গাঁজা টেনে বুঁদ বঁধ হয়ে পড়েছিল সাধু। শুয়ে ছিল ঝুমঝুমিও। কিন্তু তার চোখে ঘুম ছিল না। রাতের বেলা সহজে ঘুম আসে না ঝুমঝুমির। শরীরের ভেতর। যৌবনের কষ্ট। মরদ চাই। বিছানা শুয়ে হাঁসফাঁস করে ঝুমঝুমি। এপাশওপাশ করে। বটের পাতা হাওয়ার চলাচল। হাটখোলার শূন্য চালাঘরে হাওয়ার চলাচল সব ছাপিয়ে ঝুমঝুমি শোনে খেয়াঘাটের কাছে জনমনিষ্যির কোলাহল। একটা কুকুর ঘেউ দিচ্ছে বারবার। এত রাইতে মানুষজন আইল কই থনে, কী বেত্তান্ত, এসব ভাবতে ভাবতে শরীরের ভেতর যৌবনের কষ্ট নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ঝুমঝুমি। পরদিন সকালবেলা দেখে খেয়াঘাটের কাছে বেদের বহর। খালভরা বেদের নাও। বুড়োবুড়ি, জোয়ানমরদ, পোলাপান মিলে ম্যালা লোকজন। খালপাড়ের মাটিতে নেমে ছুটোছুটি করছে পোলাপান। হাটখোলায় ওঠে হাঁটাহাঁটি করছে মরদরা। খালের ওপারে জঙ্গল থেকে পেশাব-পায়খানা সেরে ফিরছে বেদে-বেদেনিরা। একটা পাহাড়ি কুত্তা বেদের নাও থেকে নেমে খালপাড়ের বাইলামাটি শুকতে শুকতে ঘেউ দিচ্ছে। বটতলায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখে ঝুমঝুমি। তারপর খেয়াখাটের দিকে দৌড়ে যায়। আখড়ায় বসে ঝুমঝুমির ছুটে যাওয়া দেখে সাধুর বুকের ভেতরটা কেন জানি একটুখানি কেঁপে ওঠে। মনে হয়, এই যে ঝুমঝুমি দৌড়ে গেল আর কখনও ফিরে আসবে না।
বেদের বহরটার কাছে গিয়ে ঘুরে ঘুরে সব দেখে ঝুমঝুমি। নাওয়ের ভেতর মানুষের ঘরবাড়ি। সকালবেলাই নাওয়ের ভেতর আলগা চুলোর রান্না চড়িয়েছে বেদেনিরা। পোলাপান হৈ-চৈ করছে। মরদরা তামাক টানছে। একটা নাওয়ের গলুইয়ের কাছে তিনটে খাঁচায় পাহাড়ি ময়না ডাক আর কোড়া। একটা বেজি তুরতুর করে ঘুরছে একটা নাওয়ে। দুটো পালা ঘুঘু বসে আছে টিনের ছইয়ের ওপর। দেখে ভারি আমোদ পায় ঝুমঝুমি।
খানিক ঘুরাঘুরি করার পর বেদেবেদেনিদের কারো কারো সঙ্গে খাতির হয়ে যায় ঝুমঝুমির। সাহস করে ঝুমঝুমি একজনকে জিজ্ঞেস করে, তোমরা কইথন আইছ গো?
মানুষটা কথা কয় টানা সুরে, কমলাঘাট। বুজলা কমলাঘাট থনে আইছি।
এহেনে কয়দিন থাকবা?
ম্যালাদিন। আমাগো ঠিক আছেনি। বাইদ্দানিরা চুড়ি বেচব আর রসবাত সারাইব। মরদরা যাইবে মা মনসার বাহন ধরতে।
কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে মরদটা হা করে তাকায় ঝুমঝুমির দিকে। গতরটা তো ঝুমঝুমির জোয়ারের খাল। ঝুমঝুমি ব্লাউজ পরে না, ছায়া পরে না। হেলেদুলে হাঁটলে ভারি পাছা গস্তি নাওয়ের মতন দোল খায় তার, কচি তরমুজের মতন মাই শাড়ির ভেতর থেকে বারবার উঁকি ঝুঁকি দেয়।
মরদটা ঝুমঝুমির গতর দেখে। চোখ ইন্দুরের মতন কুতকুতে তার, শরীরখানা মোষের। মতন। ঝুমঝুমির সঙ্গে কথা বলতে বলতে খালফাড়ে নামে মরদটা। ঝুমঝুমি দেখে। একখানা পা খোঁড়া তার, হাঁটে একটু ত্যাড়া হয়ে।
কিন্তু মানুষটার চোখের দিকে তাকাতে পারে না কেন ঝুমঝুমি। গতরটা সিরসির করে কেন তার? বুকের ভেতরটা কাঁপে কেন?
আঁচলটা ভালো করে বুকে জড়িয়ে ঝুমঝুমি আখড়ায় ফেরে। কিন্তু মনটা পড়ে থাকে বেদের বহরে। কাজকামে মন বসে না তার। খেতে শুতে ভাল্লাগে না। শরীরের ভেতরটা সময় অসময়ে সিরসির করে ওঠে। মরদটা তার দিকে এমন করে তাকিয়ে ছিল কেন? কী আছে তার মনে! চোখে!
একটু বেলা হলে পর, আখড়ায় বসে ঝুমঝুমি দেখে মাথায় চুড়ির ঝাঁকা, কাঁধে রসবাত সারাইয়ের ঝোলা, মরদদের মাথায় সাপের আঁকা, বেদে-বেদেনিরা গাওয়ালে যাচ্ছে। ন্যাংড়া মানুষটা আছে খালপাড়ে দাঁড়িয়ে। সে যাবে না। সে নাওয়ে একলা থেকে কী করে!
ঝুমঝুমি কিছু বুঝতে পারে না। আখড়ায় বসে দেখে, বেদেনিরা হাটখোলা ছাড়িয়ে ওপাশের গ্রামে রাস্তায় নেমেছে। তাদের মৃদু কোলাহলের শব্দ পাওয়া যায়। এক বেদেনি হঠাৎ করে হাঁক দেয়, রস খোসাই, বাত খোসাই, দাঁতের পোকা খোসাই ই ই ই। আখড়ায় বসে ঝুমঝুমি সব শোনে, সব দেখে।
