লাদে কেমুন?
এই হগলে কুনো দোষ নাই।
বদ্যি তারপর একদম চুপ। কী ভাবে কে জানে। অনেকক্ষণ চুপচাপ দেখে হাতেম একটু বিরক্ত হয়। কতা কয় না ক্যান হালায়?
খানিকপর বদ্যি বলল, তর গাইয়ের কুনো ব্যারাম নাইরে। একখান হাপ আছে তর সীমানায়। দুধরাজ হাপ। দুদের লাহান ফকফইক্কা। নিশি রাইতে হেয় আইয়া তর গাইর দুদ খাইয়া যায়।
শুনে হাতেম একটু চমকে ওঠে। কতাডা তো ফকির ঠিকই কইছে। হাপ তো একখান আছে। বাঁশঝাড় তলায় ছুলুম বদলাইছে।
হাতেম বলল, যাঐ থাউক, আপনে অষইদ দেন।
চোখে পরপর কয়েকটা পলক ফেলে, কপালের চামড়ায় গিঁট ফেলে বদ্যি বলল, কি কইলি?
কইলাম হাপের অষইদঐ দেন।
না। অষইদ দেওন আমি ছাইড়া দিছি।
শুনে হাতেম চুপ মেরে যায়। বদ্যি উদাস হয়ে কী ভাবছে। হাতেম ভাবে, ফকির চিন্তা করতাছে। কইলে কী অইব, অষইদ না দিয়া পারবনি।
বদ্যি বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বিড়বিড় করে বলে, জীবের মুকের। আহার কাইরা নেওয়া বড় পাপ। হারা জীবন ফকরালি করছি, জীবের মুকের আহার কাইরা লইছি, হের লেইগাঐ শেষকালে আমার এই দশা। কুত্তা বিলাইয়ের লাহান, বাইচ্চা রইছি। ঠিক মতন খাওনডা পাইনা। আহার জোডে না।
শুনে হাতেম খুব অবাক। কন কী ফকির! গাইয়ের দুধ বেইচ্চা আমার সংসার চলে। দুদ না বেচতে পারলে আমার সংসার চলব না। পোলাপানের খাওন জুটব না। জাইনা শুইনা আপনে আমাগ না খাওয়াইয়া রাকবেন, এইডা পাপ অইব না!
কথাগুলো বলেই হাঁফাতে থাকে হাতেম। এতক্ষণ ধরে চেঁচিয়ে কথা বলছে। এত জোরে মানুষ কথা বলতে পারে। বদ্যি বলল, অন্য ব্যারাম অইলে অমুইদ কইরা দিতাম। হাপের অমুইদ আমি দিতে পারুম না। দিলে ঐ হাপে আমারেঐ খাইব। বুড়া মানুষ। চোক্কে দেহি না, কানে হুনি না, বাইর বাইত বইয়া থাকি, কুনসুম আইয়া দংইশা যাইব। উদিস পামু না। দুদ খাইতে চাইলে হারারাইত গাই পাহারা দিচ। অষইদ আমি দিতে পারুম না। হাতেম কথা বলে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওঠে দাঁড়ায়। তারপর পথে নেমে শুনতে পায় বুড়োবদ্যি চেঁচিয়ে বলছে, বাত দেচ না গোলামের জিরা। খিদায় মইরা গেলাম। আল্লারে।
মমিন সাধুর তুকতাক
গোয়ালীমান্দ্রার হাটে, বুড়ো বটের তলায় মমিন সাধুর আখড়া। মাথার ওপর চারখান ঢেউ টিন ফেলে, চারদিকে খলপার বেড়া মমিন সাধুর সংসার। সংসারে সাধুর এক বোন, ঝুমঝুমি। ডগমগ বয়েস তার। জোয়ারে খাল যেন। হাটাচলা যেন কার্তিকের কাশবন, বাতাসে নুইয়ে নুইয়ে পড়ে। হাসিতে যেন বর্ষার জলের শব্দ। কথা তো বলে যেন নির্জন দুপুরে দিকপ্রান্তর মুখরিত করে গান গায় কোন মোহন পাখি।
জগৎসংসারে ঐ একটি আপনজন সাধুর। কবে কোন বালক বয়সে তিন বছরের ন্যাংটো। বোন ঝুমঝুমিকে কাঁধে বসিয়ে পথে নেমেছিল সাধু এখন আর তা মনে নেই। দিন চলে গেছে।
সাধুর বয়স এখন ভাটির দিকে। ঝুমঝুমির বয়স যেন জোয়ারের শেষ বেলা। বোনটির বিয়ে দেবে না সাধু। বিয়ে দিলে ঝুমঝুমি যাবে পর হয়ে। সংসারে আপনজন কেউ থাকবে না সাধুর। আপনজন কেউ কাছাকাছি না থাকলে সাধুর তুকতাক নষ্ট হয়ে যাবে। না খেয়ে মরণ।
এই জন্যে ঝুমঝুমির বিয়ে দেয় না সাধু। দুঃখে ঝুমঝুমি সংসার বিরাগী। আলায় বালায় ঘুরে বেড়ায়। পরনে জংলি ছাপার শাড়ি। হাটখোলার পাশে শাড়ির আঁচলের মতো। খাল। খালের ওপারে নিবিড় গাছপালার জঙ্গল। খাল পেরিয়ে ঝুমঝুমি সেই জঙ্গলে যায়। বসে থাকে। বসে বসে বিয়ে না হওয়ার দুঃখে কাঁদে। গান গায় : রসিকা নাগর বন্ধু কথা কইয়া যাও।
কিন্তু নাগর আসে না তার।
ঝুমঝুমির দুঃখে জঙ্গলের গাছপালা নিথর হয়ে থাকে। সাধু তখন আখড়ায় বসে গাঁজা টানে। গোয়ালীমান্দ্রার হাট বসে মঙ্গলবার। আগের দিন বিকেল থেকে প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত হাটুরেদের হল্লাচিল্লায় মুখরিত হয়ে থাকে হাটখোলা। দূর দুরান্ত থেকে মহাজনরা আসে, পাইকাররা আসে। মহাজনি নাও ডিঙি, নাও কেরায়া, নাও কোষা, কত পদের নাও যে আসে খালে, মানুষের মাথা মানুষে খায়। এলাহি কাণ্ড। আনাজপাতি, ধান, চাল, পাট, গরু, ছাগল, মুদি মনোহারি দোকান সবকিছু মিলিয়ে অদ্ভুত একটা গন্ধ থাকে হাটখোলায়। সঙ্গে মানুষের গায়ের গন্ধ। বাতাসটা ভারি হয়ে থাকে। দিনটা ঝুমঝুমির খুব আনন্দে কাটে। কত কিসিমের পুরুষ যে দেখে। দেখে কামভাব জাগে। ভেতরে ভেতরে ছটফট করে। ঝুমঝুমির সেই ছটফটানি কেউ টের পায় না। হাটুরেরা ফিরেও তাকায় না ঝুমঝুমির দিকে। সাধুর বোন। বদ চোখে তাকালে চোখ অন্ধ হয়ে যাবে। সাধু খুব কামেলদার। মুখে যা বলে তাই ফলে।
হাটবার সাধুর কাজের আকাল নেই। বিয়ান রাতে ওঠে গেরুয়া বসন পড়ে। ঠায় বসে তিন ছিলিম গাঁজা টানে। গলায় পরে একশো এক পদের জীবের হাড় দিয়ে তৈরি মালা। তারপর হাতে লোহার দীর্ঘ চিমটা, সাধু বেরোয়। ঘুরে ঘুরে দোকানিদের কাছে যায়। মুখে কথা নেই, হাতের চিমটা বাজিয়ে ফুঁ দেয়। সেই ছুঁয়ে দোকানিদের বিক্রিবাটা ভালো হয়। বিনিময়ে সাধু গেরুয়া টোপর ভরে যায় আনাজপাতি, চাল, মাছ, আর নগদ পয়সায়। সেই আয়ে সাতদিন কাটে রাজার হালে। এ সব দেখে ভেতরে ভেতরে ফেঁসে ঝুমঝুমি। বুজরুকি, সব বুজরুকি। তারপর উদাস হয়ে খালের ওপারে খেয়াঘাটের সঙ্গে যে মুদিমনোহারির দোকান সেদিকে তাকিয়ে থাকে। একটা দুটো লোক দিনমান থাকে দোকানে। লোকগুলোকে দেখে আরাম পায় ঝুমঝুমি। ঠিক তখুনি হাট ছেড়ে আখড়ায় ফেরে সাধু। ঝুমঝুমি বসে থাকে ঘরের মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে। ঘরে ঢুকে সাধু আনাজপাতি, চাল, ডাল সব রাখে আগলে। তারপর মনোযোগ দিয়ে পয়সা গুণতে বসে। আড়চোখে ঝুমঝুমি সব দেখে। কিন্তু কথা বলে না।
