গোরস্তানের কাছে গভীর কালো জলের একটা দিঘি। নাম কৌপটাহার। দিঘিটা ভালো না। বর্ষার মুখে মুখে বিলে মাছ মারতে বেরিয়ে কত লোক যে এই দিঘিতে ডুবে মরেছে। দিন দুপুরেও দিঘিটার সামনে দিয়ে একা চলতে ভয় পায় লোকে। কখন কনধনাইয়া এসে চুবিয়ে মারবে দিঘিতে।
সেই দিঘিটার সামনে এসেই বদ্যির মনে পড়েছিল কাদের খাঁর কথা। সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল। হায় হায় করলাম কী এইডা।
কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই। বিলের দুদিকেই প্রায় মাইলখানেক করে দূর গ্রাম। কোনও দিকে ফেরার উপায় নেই। কী করে, বদ্যি কী করে! আল্লা খোদার নাম নিয়ে দ্রুত পা চালায়। দিঘিটা মাত্র পেরিয়েছে বদ্যি, হঠাৎ চারপাশে শোনে শাঁ শাঁ শব্দ। চারদিকের রোদ মুছে দিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। বদ্যি ভাবে, আকাশে বুঝি মেঘ জমেছে। ঝড়বৃষ্টি নামবে।
অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকায় বদ্যি। তাকিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যায়। সর্বনাশ। ঝড়বৃষ্টি নয়, চারপাশ অন্ধকার করে ঝাঁক বেঁধে আসছে শকুনের দল। কাদের খাঁ বলেছিল, বদ্যিরে সাবধান। হকুনের আহার কাইরা নিবি, বাগে পাইলে হকুনে তরেই ছিঁড়া খাইব।
বদ্যির আজ সে কথা মনে ছিল না। আজই হকুনে ছিইড়া খাইব বদ্যিরে।
কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে! বগলে ছাতাটা ছিল বদ্যির। মোলায়েম রোদে খোলার দরকার হয়নি। বুদ্ধি করে ছাতাটা হাতে নিয়েছিল বদ্যি।
ততক্ষণে শকুনের পাল নেমে গেছে তার চারপাশে। কি হি কি হি শব্দ করে, লম্বা গলা বাড়িয়ে তেড়ে আসছে বদ্যির চারদিক থেকে। সামনে পেছনে, ডানে বাঁয়ে শয়ে শয়ে শকুন।
তখুনি ফটাশ করে ছাতাটা সামনের দিকে মেলে ধরে বদ্যি। উকট শব্দে, গোল কালো একখান জিনিশ সামনে দেখে ভয়ে কি হি কি হি শব্দ করে দৌড় লাগায় সামনের দলটা। তারপর আকাশে উড়াল দেয়।
বদ্যি তখন বুকে বল পেয়ে গেছে। সাহস করে সামনে পেছনে, ডানে বাঁয়ে অবিরাম ফটাশ ফটাশ করে ছাতা ফোঁটায়, বন্ধ করে। আস্তেধীরে শকুনের পাল ভয়ে পালায়। ধানি বিলের ওপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে আকাশে উড়াল দেয়।
একবার, ঐ একবারই বিপাকে পড়েছিল বদ্যি। তারপর থেকে বড় সাবধানে কাটিয়েছে জীবনটা। কিন্তু জীবের মুখের আহার কেড়ে নেয়ার পাপ বদ্যিকে ছাড়েনি। জোয়ান বয়সে ভাটি পড়তে পড়তেই ব্যারামে পড়ল। ভুগে ভুগে সারা হলো। এখন অথর্ব। যার দাপটে সংসারটা একদিন রাজার হালে চলত, সে এখন সংসারের জঞ্জাল হয়ে বেঁচে আছে। ওঠতে বসতে গঞ্জনা, অভিশাপ। বুইড়া মরে না ক্যা? আল্লায় বুইড়ারে চোক্কে দেহে না!
বয়রা হয়ে যাওয়া কানে সব কথা যায় না। দু একটা শুনতে পায় বদ্যি। তাতে অনুতাপটা হয়। জীবের মুখের আহার কেড়ে নেয়া, দুনিয়ায় সে বড় পাপকর্ম। পাপের প্রায়শ্চিত্ত এই শেষ বয়সে করছে বদ্যি। আর মনের অনুতাপটা তো আছেই। সেই অনুতাপেই যখন তখন কাঁদে বদ্যি। পোলাপানের মতো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদে। আর দিনমান বারবাড়ির সামনে, নাড়ার পালার ছায়ায়, ধুলোবালির ওপর ন্যাংটো হয়ে, ঝোপঝাড়ের মতো বসে থাকে। লোকে এসব বোঝে না।
হুনছেন নি? ও ফকির
ঠাঠা পোড়া রোদে আধ মাইল পথ ভেঙে এসেছে সীতারামপুরের গেরস্থ হাতেম। গা গতর ঘামে ভিজে জবজবে। নাড়ার পালার ছায়ায়, বদ্যি বুড়োর পাশে মাটিতে বসে পড়ে সে। বসে কোমর থেকে ছেঁড়া গামছা খুলে মুখটা-গলাটা মোছে। তারপর গামছা ভাঁজ করে মুখের সামনে নাড়তে থাকে। তাতে একটু হাওয়া পায়। আরাম হয় হাতেমের। কিন্তুক বুইড়া হুনতাছে না ক্যা?
হাতেম বদ্যিবুডোর মুখের কাছে ঝুঁকে যায়, তারপর আবার ডাকে, হুনছেন নি, ও ফকির?
নাড়ার পালার ছায়ায় হাত পা মুড়ে, প্রাচীন ঝোপঝাড়ের মতো ন্যাংটা বদ্যিবুড়ো বসে আছে। হাড্ডিসার, ছুলুম বদলানো সাপের মতো ধূসর শরীর। চামড়া ফেটে ইরল চিরল দাগ পড়েছে। পাটের আঁশের মতো চুল দাড়ি। হা করে শ্বাস টানছে মানুষটা। দমের তালে তালে কামারবাড়ির হাপরের মতন পুরো শরীরটা ওঠানামা করছে। দেখে হাতেমের বড় মায়া হয়। আহারে! কী মানুষ কী অইয়া গেছে! এত বড় ফকির। দশ গেরামে নামডাক আছিল। নিজের চিকিৎসা নিজে করতে পারে নাই।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতেম আবার ডাকে। হুনছেননি? ও ফকির।
এবার মুখ তোলে বদ্যি। পচা ডিমের মতো ঘোলা চোখের কোণে জমে আছে কেতুরের সবুজ দলা। গোঁফ মাখামাখি হয়ে আছে গাঢ় হলুদ কফে। আহা সেই বদ্যি আর নাই। মুখটা ভেঙেচুরে শুকনো আতাফলের মতো হয়ে গেছে। চোখে দেখে না, কানে শোনে না।
উপায় না দেখে বদ্যির কাঁধ ঝাঁকুনি দেয় হাতেম। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে, আমি সীতারামপুরের হাতেম। একটা কামে আইছিলাম আপনার কাছে।
ঘোলা চোখ তুলে বদ্যি বলল, কী কাম?
আমার গাইডার দুদ কইম্যা যাইতাছে।
এ্যা। কী কইম্যা যাইতাছে?
দুদ। গাইয়ের দুদ।
বিয়াইছে কবে?
আড়াই মাস।
পয়লা পয়লা কয় সের দুদ অইত?
চাইর পাঁচ সের।
কয় সের?
হাতেম চেঁচিয়ে বলল, চাইর পাঁচ সের।
অহন?
দেড় সের, দুই সের।
শুনে বদ্যি চুপচাপ কী ভাবে। তারপর বলে, পেড বইরা খাওন দেচ না?
কন কী, জবর খাওন দেই।
তয়?
হেইডাঐ তো বুজতাছি না।
পচা ডিমের মতো চোখ তুলে বদ্যি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর বলে, চনায় কেমুন?
আগের লাহানঐ।
