টোনা সের করে মাজেদ দেওয়ানের বংশ নির্বংশ করতে হবে। বান মেরে মাজেদ দেওয়ানের গলা দিয়ে রক্ত তুলে মারতে হবে। একে একে মাজেদ দেওয়ানের সাত পোলাকেও খতম করতে হবে।
এক দুপুরে সাত মাইল পথ ভেঙে বদ্যি ধাইদা, কাদের খাঁর বাড়ি গিয়া হাজির। মানুষটার চারদিকে তখন ম্যালা লোকজনের ভিড়। চৌকিতে বসে একেকজনকে একেক কিসিমের রোগব্যারামের চিকিৎসা দিচ্ছে কাদের খাঁ। বদ্যি গিয়ে পা জড়িয়ে ধরল তার। তারপর হাউমাউ কান্না, আমারে বাঁচান ফকির।
কাদের খাঁ, দেড় মণি ডেগের ভেতর মুখ দিয়ে কথা বললে যেমন শব্দ হয় তেমন শব্দে বলল, বাজান, কী অইছে তর?
বদ্যি ইনিয়েবিনিয়ে ঘটনাটা বলল। শুনে কাদের খাঁ হাসে। তুই আমারে কী করতে কস?
বান মাইরা দেওয়ানের বংশ নির্বশ কইরা দেন! জমিনডা আমারে ব্যবস্থা কইরা দেন। আমি আর কিছু চাই না। টেকা-পয়সা যা লাগে দিমু। আপনে কইলে ক্ষেতখোলা যা আছে বেবাক বেইচা দিমু।
কাদের খাঁ আবার হাসে। তারপর বলে, তুই আমার বাইত্তে দুইদিন বেড়া। চাই ডাইলবাত খা। দেহি কী করন যায়।
বদ্যি থেকে গেল।
পরদিন বিয়ান রাতে বদ্যিকে ডেকে তুলল কাদের খাঁ। ডেকে উঠোনে নিয়ে গেল। তারপর নিজ হাতে পশ্চিমের ঝোপ থেকে কেটে আনল লম্বা একটা বিচিকলার পাতা। পাতাটা উঠোনের সাদা মাটিতে রেখে নিজে গিয়ে বসল তার সামনে। বদ্যিকে বসাল। তারপর বলল, আয় তরে একখান খেইল দেহাই।
বলে কী সব মন্ত্র পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির ওপর লাফাতে শুরু করেছে কলাপাতাটা। লাফাতে লাফাতে সবুজ কলাপাতা গেল খয়েরি হয়ে। কাদের খাঁ বলল, কী বুঝলি বদ্যি?
বদ্যির তখন দমবন্ধ। কথা বলতে পারে না। দেখে কাদের খাঁ ঠাটা পড়ার মতো হাসে। খালি একখান বান মারছিলাম। এমুন বায়ান্ন জোড়া বান জানি আমি।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, মাইনষের ক্ষতি সহজে আমি করি না; ভালোডাই করি। বান মারলে মাজেদ দেওয়ানের বংশ ছাই অইব। তুই বাইত যা। আল্লায় যা করে মাইনষের ভালার লেইগাই করে। জমিন দিয়া কী অইব! আইজ মরলে কাইল দুইদিন।
বদ্যি দুঃখি গলায় বলল, খামু কী ফকির? যেডু জমিন আছে, যেডু ফসল অয়, সংসার চলে না।
কাদের খাঁ বলল, আল্লার দুনিয়ায় কেঐ না খাইয়া থাকে না। রেজেগের মালিক হ্যয়।
তুইও মরবি না।
বদ্যি তখন কাদের খাঁর পা জড়িয়ে ধরেছে। আমারে কিছু দেন ফকির। কইরা খাই। শুনে কাদের খাঁ খানিক ঝিম মেরে থাকে। তারপর বলে, একটা চিকিৎসা আমি করি না। তরে দিতে পারি। তয় বহুৎ সাবধান অইয়া করতে অইব, পারবি? পারুম ফকির। কী?
গরুর ব্যারামের চিকিৎসা। ঐডা করলে আবার হকুনে ধরে। দিন দুইফরে একলা পাইলেই দেকবি কোনহান থনে যেন হকুন আইয়া পড়ছে ঝাকে ঝাকে। তরে ঠোকরাইয়া খাইয়া হালাইব। বুজলি না, গরু না মরলে তো হকুনের খাওনের আকাল পড়ে। তর পেড আছে, হকুনেরও তো পেড আছে। তর খিদা আছে, হেগও তো খিদা আছে। চিকিৎসা কইরা তুই গরু বাচাবি, নিজের পেডখান ভরবি আর হকুনরা থাকব না খাইয়া। ফাঁক পাইলে হেরা তাইলে তরে খাইব না! জীবের মুখের আহার কাইরা লইতে নাই। হের লাইগাঐ চিকিৎসাডা আমি করি না। তুই পায়আতে দরলি যহন তরে দিতে পারি। তয় বহুৎ সাবধানে থাকতে অইব। একলা একলা নিটাল জাগায় যাবি না, দূরের পথ পাড়ি দিবি না, পারবি?
বদ্যি বলল, পারুম ফকির।
তারপর পুরো একমাস কাদের খাঁর বাড়ি থেকে গেল বদ্যি। গাইগরুর চিকিৎসাটা শিখেই বাড়ি ফিরল। দিনে দিনে বদ্যির নাম ছড়িয়ে পড়ল দশ গেরামে। বিলের জমির লোভ ততদিনে চলে গেছে বদ্যির। গাইগরুর চিকিৎসা করে বদ্যির আয় বরকত ম্যালা। কে চায় বিলের জমি। তবে কাদের খাঁর একটা কথা কিন্তু ফলেছিল। চিকিৎসা শিখিয়ে কাদের খাঁ আবার সাবধান করেছিল বদ্যিকে। সাবধানে পথ চলিস বদ্যি। শকুনে একলা পেলে ছিঁড়ে খাবে। শকুনের মুখের আহার কেড়ে নিবি। ফাঁক পেলে শকুনে তোকে খাবেই।
কথাটা পালন করেছিল বদ্যি। কিন্তু মানুষ তো। কতটা সাবধান হতে পারে। একবার বিপাকে পড়েছিল। ঐ একবারই। জশিলদার খনকার বাড়ির একটা গাইগরুর ব্যারাম হল। গাভীন গাই। পেচ্ছাব-পায়খানা বন্ধ হয়ে গেল। খবর পেয়ে বদ্যি গেছে দেখতে। অনেকক্ষণ দেখে ওষুধ দিল, পানিপড়াটা দিল। দিয়ে ঠায় বসে থাকল দুঘণ্টা। দুঘণ্টায় গাইটা পেচ্ছাব করল চারবার। পায়খানা করল চারবার। দেখে খনকাররা বেজায় খুশি। দুপুরে সুপারির সঙ্গে রাখল একখান পাঁচ টাকার কড়কড়ে নোট। টাকাটা ট্র্যাকে খুঁজে পান চিবাতে চিবাতে, বিড়ি টানতে টানতে বাড়ির পথ ধরেছিল বদ্যি। সেদিন আর কাদের খাঁর কথা মনে ছিল না তার। কাদের খাঁ বলেছিল বদ্যিরে সাবধান সাবধান।
জশিলদা থেকে দোগাছীর কোনাকুনি পথে ধানি বিলটা পড়ে। বিশাল বিল। ধানিজমি, পুকুর ডোবা আর বিলের ঠিক মাঝমধ্যিখানে উঁচু ভিটের ওপর গোরস্থান। গোরস্থানের কোণে বিশাল একটা শিমুল গাছ। বহুদূর থেকে নজরে আসে গাছটা।
গোরস্তানটা আগে, বহুকাল আগে ছিল একটা বাড়ি। লোকে বলত বিলের বাড়ি। চারদিকে বিল, মাঝখানে বাড়ি। লোক টিকতে পারেনি। ভূতপেত্নি আর চোর, ডাকাতের ভয়। বসতি ছেড়ে কবে ভিটের মালিক পালিয়েছিল কে জানে। পরে দিনে দিনে বাড়িটা হল গোরস্থান। দশ গেরামের মানুষ মাটি পড়ে।
