আমি আর ভাবতে পার না। দুহাতে পাগলের মতো বাপ্পাকে বুকে জড়িয়ে ধরি। তারপর বাগান ভেঙে ছুটতে থাকি। বাপ্পাকে নিয়ে বহুদূরে চলে যাব আমি, সম্পূর্ণ নিরাপদ কোনও জায়গায় যেখানে অশুভ কোনও ছায়া বাপ্পাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
বদ্যিবুড়োর জীবনকথা
বারবাড়ির সামনে একটা নাড়ার পালা। ধান মৌসুম শেষ হয়ে গেছে। এখন ক্ষেতখোলা সাফ করার সময়। পোলারা সারাদিন ক্ষেত সাফ করে। নাড়া তুলে এনে বারবাড়ির সামনে পালা দেয়। সকালে ক্ষেতে যাওয়ার সময় বুড়ো বাপ বদ্যিকে ধরে এনে নাড়ার পালার সামনে বসিয়ে দিয়ে যায়।
নিজে আজকাল হাঁটাচলা করতে পারে না বদ্যিবুড়ো। পোলারা, পোলাদের বউরা নয়তো নাতিনাতকুররা ধরে ধরে ঘরের বার করে। ভেতরে নেয়। আর দিনে সতেরবার বুইড়ার মরণ নাই, বুইড়ারে আল্লায় চোক্কে দেহে না বলে গাল দেয়।
সংসারে এখন বাড়তি মানুষ বদ্যিবুড়ো। বয়স হয়েছে তিন কুড়ির ওপর। অকেজো হয়েছে একযুগ আগে। কী একটা কঠিন ব্যারাম হয়েছিল বদ্যিবুডোর। এখন মরে, তখন মরে অবস্থা। টানা দেড় বছর পাটাতনের ওপর পড়ে থাকল। তারপর আস্তেধীরে সেরে উঠল একদিন। গতরখান তখন আর নেই বদ্যির। চুল দাড়ি পেকে পাটের আঁশ, দাঁত পড়ে মুখটা ফোকলা, কান দুটো গেছে বয়রা হয়ে, চোখে পড়েছে মোটা ছানি। গায়ের চামড়া এত ঝুলে গেছে বদ্যির, জোরে বাতাস দিলে জলের মতন চামড়ার ওপর ঢেউ খেলে। রুজিরোজগারের পথটা বন্ধ হয়ে যায় বদ্যির। পোলাদের মাথায় ধানের বস্তার মতো চেপে বেঁচে থাকে সে।
ততদিনে সংসারের সবাই বদ্যির শত্রু। পোলারা, বউরা এমনকি আণ্ডাবাচ্চা নাতি নাতকুরগুলোও সইতে পারে না বদ্যিকে। অচল মানুষ টানাহ্যাঁচড়া করে, হেগেমুতে ঘর দোর নষ্ট করে সেসব সাফ করা, হাতে ধরে নাওয়া খাওয়াও, কে অত ঝামেলা সইবে! তার ওপর কানের সামনে টিকারা বাজলেও শব্দ পাবে না বদ্যি। চোখের সামনে ক্ষেমটা নাচ হলেও দেখতে পাবে না, এই মানুষের মরণ ছাড়া কে কী চাইবে সংসারে।
কিন্তু বদ্যিবুড়োর মরণ নেই। ধুকেধুকে এখন বেঁচে আছে মানুষটা। সারাদিন খ্যাক খ্যাক করে কাশে, জামরুলের মতো দলা দলা কফ ফেলে বাড়িঘর নষ্ট করে, গোঁফ দাড়িতে মাখামাখি হয়, কে অত সাফ করবে! তাই সকালবেলা বারবাড়ির সামনে নাড়ার পালার ছায়ায় বসিয়ে রাখা হয় মানুষটাকে। গায়ে তেনাটা পর্যন্ত নেই। ন্যাংটোভুতুম বদ্যিবুড়ো ধুলোবালির ওপর বসে দিন কাটায়। পেলে খায়, না পেলে চেঁচিয়ে পোলাদের, বউদের গালাগাল করে। কখনো মনের দুঃখে বুক চাপড়ে, কপাল চাপড়ে কাঁদে। বুড়োকালে এই দুঃখু আর সয়না আল্লা। লইয়া যাও, আমারে তুমি লইয়া যাও।
এসব শুনে ভেতর বাড়ি থেকে বউরা টিপ্পনী দেয়, নিলে তো বাঁচতাম। জানডা আরাম পাইত।
তয় বয়সকালে বেডা আছিল একখান বদ্যি। ওঝা মানুষ। গাইগরুর চিকিৎসা করত। দশ গেরামে বদ্যির নামডাক আছিল। মইরা যায় যায় এমন গাইগরুও খাড়া কইরা হালাইছে বদ্যি। মাইনষে খাতির করত। টাকা-পয়সা দিত। বাগানের ফল পাকুরটা দিত, তরিতরকারিটা দিত।
টোটকাফাটকা ওষুধদিত বদ্যি। ফেন খৈলের সঙ্গে ব্যারামি গাইগরুকে খাওয়াত বনেলা গাছের শিকড়বাকড়। পানিপড়া দিত, মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিত। বদ্যির চিকিৎসার পর কোন গাইগরু মারা পড়ছে এমুন কথা দশ গেরামের মাইনষে শোনে নাই।
কাজটা বদ্যি শিখেছিল ধাইদার কাদের খাঁর কাছে। ওঝা আছিল একখান কাদের খাঁ। তল্লাটে বেজায় নাম আছিল মানুষটার। কত ব্যারামের চিকিৎসা যে জানত। ভূতপেত্নির আছর ছাড়াতে জানত, বান জানত বায়ান্ন জোড়া, ফিরানী জানত। টোনা সেরও জানত! লোকের ভালোটা মন্দটা সবই করত।
জোয়ান বয়সে কাদের খাঁর নাম শোনে বদ্যি। তল্লাটে জুড়ে তখন কাদের খাঁর নামডাক। বিশ-তিরিশ মাইল পথ ভেঙে লোক যেত কাদের খাঁর কাছে ওষুধবিষুধ আনতে, পানি পড়া আনতে, বানের ফিরানী আনতে। দিনরাত বাড়ি ভর্তি লোক থাকত কাদের খাঁর। আর চারদিকের মাটিতে দলবেঁধে বসে থাকত মানুষ। মরদ, মাইয়া মানুষ।
নূরানি চেহারা আছিল কাদের খাঁর। মুখে হাসিখান লাইগা থাকত। রাইত দুইফরে গিয়া ডাকলেও ফিরাইত না মাইনষেরে। হাসি মুখে কাম কইরা দিত।
কাদের খাঁর কাছে বদ্যি গিয়েছিল মন্দের ভাগী হয়ে। বিলের এক কানি জমি নিয়ে বদ্যির বাপের আমল থেকে কন্দিপাড়ার মাজেদ দেওয়ানের সঙ্গে গণ্ডগোল ছিল। জমিটা জবরদখল করে রেখেছিল মাজেদ দেওয়ান। সেই আমলে মামলামোকদ্দমায় যেত না। লোকে। বদ্যির বাপও যায়নি। লাঠিসড়কি নিয়ে মারামারি করেছিল বার কয়েক। শেষবার নিজেই সড়কির পার খেয়ে এল বদ্যির বাপ। সেই পাড়েই মরল। তিন চারমাস ভুগে।
বদ্যির তখন জোয়ান বয়েস। বাপের এক পোলা। মা মেয়েমানুষটা বদ্যির ছিল দুনিয়ার ডরহিয়াইল্লা। জমির দখল নিতে গিয়ে পতি মরছে মরুক। পুতটা যেন না মরে। জমি দিয়া কাম নাই। পোলাডা আমার বাঁইচা থাউক।
বদ্যিকে দিনরাত আগলে রাখত মা। চোখে চোখে রাখত, আড়াল হতে দিত না।
কিন্তু বদ্যির ভেতর তখন আগুন জ্বলছে। এক কানি জমি তাও ধানি বিলে। এক মৌসুমে যে ধান হয়, তাতে সংসারের এক বছরের ব্যবস্থা হয়ে যায় মাজেদ দেওয়ানের। জমিটা বদ্যির হাতে গেলে দুনিয়াতে আর কিছু চাওয়ার নেই বদ্যির। হেসে, খেলে একটা জীবন কেটে যাবে। বদ্যি তখন জমিটা পাওয়ার লোভে ভেতরে ভেতরে পাগল হয়ে উঠেছে। লোক বলে, লাঠি বলে মাজেদ দেওয়ানের সঙ্গে বদ্যি পারবে না। জমিটা। পেতে হলে তাকে ধরতে হবে অন্য পথ। সেটা কোন পথ?
