ওরা চারজন আস্তেধীরে রতনার বাপের চারপাশ ঘিরে দাঁড়ায়। বুড়ো নেতাইচরণ একটু দূরে। তারপর কিছু বলার আগেই রতনার বাপ দুঃখী গলায় বলল, কিছু অইল না বাজানরা। উকিল মুক্তার লাগাইছি। ম্যালা টাকা-পয়সা খরচ করতাছি। কিছু তো অইতাছে না। আবার আগামী সপ্তায় মুন্সিগঞ্জ যাইতে অইব।
শুনে কেউ কোনও কথা বলে না। উদাস হয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
রতনার বুড়ো বাপ আস্তেধীরে নদীর খাড়া পাড় ভেঙে উপরে উঠে যায়।
বাচ্চু বলল, ল বাইত যাইগা! আইজ আমার ভাল্লাগতাছে না!
খোকা বলল, বাইত গিয়া কী করুম?
এহেনে বইয়াই আইজ আর কী অইব! খবর তো পাইলামঐ।
দুলাল বলল, টাইম কান লাগব না! বাইত গিয়া কী অইব! তাইলে তরা বয় আমি যাই।
বাচ্চুর মুখে ভেঙে পড়ার চিহ্ন। বাছুটা বড় অস্থির স্বভাবের। অপেক্ষা সইতে পারে না। নেতাইচরণ বলল, ইলশামাছের জন্মবেত্তান্ত হুনবা কইলা।
আরেকদিন। আইজ মন ভালা না।
সবাই বোঝে রতনের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছে বাচ্চু।
বাচ্চু তারপর ভাঙাচোরা মানুষের মতন জেটি থেকে নামে। তার দেখাদেখি খোকা দুলাল।
বুড়ো নেতাইচরণও।
.
নদীর খাড়া পাড় ভাঙার পর পাঁচ সাতকানি বাজা জমি। সাদা বেলে মাটি বুকে উজবুকের মতন পড়ে আছে জমিটা। খানে খানে শেয়ালকাঁটার ঝোপ। তারপর বাজার খোলার মাছচালা, দোকানপাট।
বাজার খোলার দিকে হাঁটতে হাঁটতে দুলাল বলল, বাচ্চু তুই এত অস্থির অচ ক্যান। তুই লেখাপড়া জানা পোলা, তুই আমগ সাহস দিবি। অহন দেহি তুইঐ বেশি মন খারাপ করচ।
শুনে বাচ্চু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কথা বলে না।
দুলাল বলল, আরো খারাপ টাইম অইল আমাগ সামনে। আইজ অউক কাইল অউক রতনা একদিন ফিরা আইব। রতনারে কোন হালা বাইন্দা রাখে! তয় রতনা ফিরা আহনের পর কী অইব চিন্তা কর। অস্ত্রপাতি কিছু নাই আমাগ। রতনা ফিরা আহনের পর অস্ত্র জোগাড় করতে অইব। তারবাদে অইল গিয়া খেলা।
বুড়ো নেতাইচরণ ছিল পেছনে। হাঁটতে হাঁটতে পিছিয়ে পড়েছে। বয়সের ভার। পেছন থেকেই গলা খাকারি দেয় নেতাইচরণ। দুবার। তারপর ফ্যাসফ্যাসা গলায় বলে, আমার বয়স অইল আড়াই কুড়ি। এই বয়সে দুইখান সাদিনতা দেখলাম। তারকথা শেষ করার আগেই দুলাল বলল, আরেকখানও দেখবেন। দেরী করেন, রতনা ফিরে আসুক। যুইদ্ধ কারে কয়, সাদিনতা কারে কয় দেখবেন ইবার। আগের দুইখান যুইদ্ধ অইছে বাইরের শত্রুর লগে, এইবারের যুইদ্ধখান অইব ঘরের শত্রুর লগে।
ফুলের বাগানে সাপ
শহরে শিশুচুরি হঠাৎ খুব বেড়ে গেল। প্রথমদিকে মাসে দু একটি শিশুচুরির কথা খবরের কাগজের মাঝের পাতায় ছাপা হত। ইদানিং প্রথম পাতায় ফলাও করে ছাপা হয়। নার্সিংহোম থেকে, হাসপাতাল থেকে সদ্যজাত শিশু উধাও হয়ে যাচ্ছে। একই হেডিঙের তলায় চার পাঁচ কিংবা আট নটি শিশু চুরি যাওয়ার খবর ছাপা হচ্ছে একেক দিন। প্রথমদিকে শুধুমাত্র সদ্যজাত শিশুই চুরি হত। কদিন ধরে চারপাঁচ বছর বয়সের শিশুও হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। কিন্ডারগার্টেন স্কুল থেকে, হাসপাতাল থেকে, রাস্তাঘাট থেকে। ফলে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। একজনও শিশুচোর ধরা পড়ছে না।
এইসব শিশুরা যাচ্ছে কোথায়?
দুতিনদিন আগে একটি খবরের কাগজে পোস্ট এডিটরিয়াল বেরিয়েছে শিশুচুরি নিয়ে। পত্রিকাটি বলেছে, শিশু চুরির পেছনে নিশ্চয় বড় রকমের কোনও সংঘবদ্ধ দল কাজ করছে। দেশের প্রতিটি শহরে বন্দরে যাদের অনুচররা গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। দলটির পেছনে বিদেশি শক্তির প্রভাব থাকাও বিচিত্র নয়। কারণ, যে সব শিশু চুরি যাচ্ছে, পত্রিকাটির অভিমত, সেই সব শিশুর বেশির ভাগই পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। বহির্বিশ্বে, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা এবং স্ক্যান্ডেনেভিয়ান কান্ট্রিগুলোয় নিঃসন্তান দম্পতির সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সেসব দেশের দম্পতিরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করে শিশু ক্রয়ের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো থেকে প্রচুর শিশু উধাও হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে কাজ করছে অত্যন্ত ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী এবং সংঘবদ্ধ একটি দল। তৃতীয় বিশ্বের বেশকিছু দেশে যাদের এজেন্ট রয়েছে। সম্প্রতি বহির্বিশ্বের কয়েকটি দেশে তৃতীয় বিশ্বের শিশু প্রতিপালিত হচ্ছে এ ধরনের সংবাদ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পত্রিকায় ছবিসহ ছাপা হতে দেখা গেছে।
পোস্ট এডিটরিয়ালটা পড়ার পর থেকে বাপ্পাকে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা খুব বেড়ে গেছে। বাপ্পা আমার একমাত্র সন্তান। চার বছর বয়স। এ বছরই বাপ্পাকে আমি শহরের একটি অভিজাত কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়েছি। ফলে বাপ্পাকে নিয়ে আমার একটা বাড়তি উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। ভোরবেলা বাপ্পাকে স্কুলে পৌঁছে দেয়া, এগারটার সময় অফিস থেকে গাড়ি পাঠিয়ে বাপ্পাকে বাড়ি নেয়া।
বাপ্পাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে প্রথম প্রথম দুটো কাজই আমাকে করতে হত। ভোরবেলা। ওঠে বাপ্পাকে সাজগোজ করিয়ে দিত আয়া। আমি নিজে ড্রাইভ করে বাপ্পাকে নিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসতাম বাড়ি। বাপ্পাটা আমাকে ছাড়া নড়তেই চাইত না। কান্নাকাটি জুড়ে দিত। আস্তেধীরে বাপ্পার সেই অভ্যেসটা পাল্টেছে। আজকাল ভোরবেলা আয়া বাপ্পাকে সাজগোজ করিয়ে, কাঁধে ব্যাগ দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়। ড্রাইভার স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আসে। এগারটার সময় গিয়ে নিয়ে আসে। ভোরবেলা স্কুলে যাওয়ার সময় বাপ্পার ঘুম ভেঙে যায়। এসে টুক করে আমার গালে একটা চুমু খায়। আমি স্কুলে যাচ্ছি পাপা।
