আর আমার যেদিন ঘুম ভাঙে না, সেদিন বাপ্পা এসে আমাকে ডেকে তোলে তারপর চুমু খেয়ে স্কুলে চলে যায়। তারপর হাজার চেষ্টা করলেও আমি আর ঘুমুতে পারি না। আমার খুব রেহনুমার কথা মনে পড়ে। রেহনুমা থাকলে বাপ্পাকে নিয়ে আমার কোনও উৎকণ্ঠা থাকত না। রেহনুমা কেন যে অমন করে চল গেল!
সকালবেলা বাপ্পা স্কুলে যাওয়ার পর আমার বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কিছু করার থাকে না। বিছানায় শুয়ে পরপর দুকাপ চা খাই। খবরের কাগজ পড়ি। তারপর ওঠে বারান্দায় গিয়ে অকারণে বাগানটার দিকে তাকিয়ে থাকি। এক বিঘে জমির ওপর আমার বাড়ি। ছোট্ট দোতলা একটা বিল্ডিং। একপাশে বাগানের মুখে গ্যারেজ। পেছনে একতলা সার্ভেন্ট কোয়ার্টার। এইসব মিলিয়ে কাঠা ছসাত জমি। বাকিটা বাগান। কত রকমের যে গাছপালা লাগিয়েছিল রেহনুমা, কত রকমের যে ঝোপঝাড় লাগিয়েছিল! দিনে দিনে বাগানটা ছেয়ে গেল। এখন দিনেরবেলাও বাগানের কিছু কিছু ঝোপে রীতিমতো অন্ধকার জমে থাকে। একজন মালী রাখতে হয়েছে, সারাদিন বাগানটার তদারকি করে সে। আগাছা পরিষ্কার করে। জলটল দেয়। সিজনাল গাছপালা এনে লাগায়। ফলে সবসময় কিছু না কিছু ফুল থাকেই বাগানটায়।
রেহনুমার ছিল গোলাপের শখ। বাগানের মাঝখানটায় আলাদা ঘের দেয়া একটা জায়গা করিয়েছিল সে। কাঠাখানেক জমি। তাতে শুধু গোলাপ। ইয়া বড় বড় একেকটা। একটা কালো গোলাপের চারা আনল একবার। প্রচুর টাকা খরচ করে। তারপর মাস তিনেক সেই চারাটি নিয়ে কী ব্যস্ততা তার! সারাদিন মেতে থাকত। রাতেরবেলা আমাদের দাম্পত্য আলাপের সময়ও গোলাপচারাটির কথা বলত। কখনও কখনও আমি খুব বিরক্ত হতাম।
সেই চারাটি এখন মস্ত ঝোপ হয়ে গেছে। কলম কেটে মালী তা থেকে দশবারটি নতুন কালো গোলাপের গাছ করেছে। এখন তাতে থরেবিথরে ফুটে থাকে গোলাপ। গাছগুলোর দিকে তাকালেই আমার রেহনুমার কথা মনে পড়ে। এতসব ফেলে রেহনুমা যে কেন চলে গেল!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি তারপর বারান্দা থেকে ফিরে আসি। বাথরুম ইত্যাদি সেরে খাবার। টেবিলে গিয়ে বসি। ঝি-চাকররা নাশতা রেডি করে রাখে। চটপট খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। অফিস।
অফিস কর্মচারীরা সব আসে নটায়। আমি বেরিয়ে পড়ি পৌণে আটটা, আটটার মধ্যে। তারপর নিজের রুমে ঢুকে, এককাপ চায়ের কথা বলে জরুরি ফাঁইলপত্র নিয়ে বসি। ঘণ্টাখানেক এইভাবে কেটে যায়!
বাপ্পাকে স্কুলে দেয়ার আগে আমি কখনও দশটার আগে অফিসে যেতাম না। সকালবেলা বাপ্পার সঙ্গে হেসেখেলে ভালোই কেটে যেত। সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছুকাল। যতদিন যাচ্ছে আমার একাকিত্ব ততই বেড়ে যাচ্ছে। আজকাল বুঝতে পারি, বাপ্পা যত বড় হতে থাকবে, আমাদের মাঝখানকার দূরত্ব তত দীর্ঘ হয়ে যাবে। কোনও উপায় নেই। এটাই নিয়ম।
অফিসে বসে, খুব মনোযোগ দিয়ে ইমপরট্যান্ট ফাঁইল দেখতে দেখতেও এসব কথা মনে হয় আমার। মন খারাপ হয়ে যায়। রিভলবিং চেয়ারে হেলান দিয়ে উদাস হয়ে সিগ্রেট টানতে থাকি। ব্যবসা ইদানীং মন্দা যাচ্ছে। দুটো কন্ট্রাক্ট পেয়েছিলাম। একটা আশি লাখ টাকার আর একটা সাতষট্টি। দুটোই ছেড়ে দিতে হয়েছে। ব্যাংক থেকে ম্যালা চেষ্টা করেও ওডি নেয়া যায়নি। এত টাকা ক্যাশ ম্যানেজ করাও সম্ভব হয়নি। কাজ দুটো এখন করছে অন্য পার্টি। আমাকে লামসাম একটা এমাউন্ট ধরিয়ে দিয়েছিল। লাখ দুয়েক। ছসাত মাসে এটুকুই ব্যবসা হয়েছে। এতে কি চলে!
ব্যবসাটা শুরু করেছিলাম বিয়ের বছর পাঁচেক আগে। তখন দুরুমের একটা অফিস ছিল। একজন ম্যানেজার, একজন টাইপিস্ট, দুজন ক্লার্ক, একজন অ্যাকাউনট্যান্ট আর দুজন পিয়ন, এই ছিল কর্মচারী। আমি এক রুমে বসতাম আর অন্যরুমে কর্মচারীরা। সেই সময় অবশ্য অফিসে বেশিক্ষণ বসা হত না। একটা ফোক্সভাগেন ছিল আর একটা ব্রিফকেস। তাতে থাকত সব কাগজপত্র। চেক বই সিল প্যাড আর কত কী। ড্রাইভার রাখার সামর্থ্য ছিল না। ব্রিফকেসটা ড্রাইভিং সিটে পাশে ফেলে টো টো করে গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। কত রকমের কাজ যে করেছি! পাঁচ হাজার থেকে পাঁচ লাখ পর্যন্ত। ছাড়াছাড়ি নেই। যা পাই তাই করি। ব্যবসা মানে লেগে থাকা, কথাটা শুরুতেই বুঝে গিয়েছিলাম। ফলে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই চেহারা পাল্টে গেল। সস্তায় পেয়ে ছরুমের এই অফিসটা নিয়ে ফেললাম। কর্মচারীও গেল বেড়ে। ড্রাইভার, দারোয়ান, পিএ কত লোক। ব্যবসাও আসতে লাগল।
সে একটা সময় গেছে। আজকাল একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয়, মানুষের জীবনে গোল্ডেন টাইম বলে একটা ব্যাপার আছে। যা আসে, প্রত্যেক মানুষের জীবনেই আসে, ধরে রাখতে পারলে, ব্যাস। ওঠে গেল।
ধরে রাখতে আমি পেরেছিলাম। তো শেষপর্যন্ত একটু টাল খেয়ে গেল। আমার উদাসীনতার কারণে, অমনোযোগিতার কারণে। এসবের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেহনুমার।
বছর দুয়েক ব্যবসা করে এক বিঘার এই প্লটটা কিনেছিলাম। খুবই সস্তায়। ঐ যে বললাম, গোল্ডেন টাইম ছিল। হাতদে যা ছুঁই সোনা হয়ে যায়। নয়তো শহরের এই এলাকা এত মূল্যবান হয়ে যাবে, কে জানত! তাহলে তো যাবতীয় ব্যবসা বন্ধ করে। আশেপাশে যত খোলা জমি ছিল সব কিনে ফেলতাম। আর কিছু করতে হত না। আমি কেন, বাপ্পা এবং বাপ্পার পরের আরো ছ জেনারেশান পায়ের ওপর পা তুলে আরামসে বসে খেতে পারত। ফালতু ব্যবসাবাণিজ্যের কথা ভাবতে হত না।
