হ নাইলে কি আর রতনারে জেলে দিতে পারে! লাশ হালাইয়া দিতাম না হালার।
নেতাইচরণ বলল, একটা কতা আমি বুঝলাম না। রতনারে চেরম্যান সাব জেলে দিল।
ক্যা? দুলাল বলল, এইডা তো পানির লাহান সোজা। রতনা সামনে থাকলে আলতারে বিয়া দিতে পারব না। দেখলেন না জেলে যাওনের পরঐ আলতার বিয়া অইয়া গেল।
হ, বুজছি। তয় রতনা এত চালাক ছেইলা, হেরে পুলিশে ধরে কেমনে!
রাইত কইরা রতনা গেছিল আলতার লগে দেহা করতে। চেরম্যান সাব কেমনে জানি খবর পাইছে রাইত বিরাইত রতনা যায় আলতার লগে দেখা করতে। হেয় করছে কি, থানাথ থনে একজন দারোগা আর দুইজন পুলিশ আইন্না বাংলা ঘরে বহাইয়া রাখছে। রতনা যাওনের লগে লগে চোর কইয়া ধরছে। তারবাদে হেই রাইতেঐ চালান দিছে। থানায়। থানাথ থনে মুন্সিগুইঞ্জ জেলে।
তুমরা রতনের লগে দেখা কর নাই।
হ, খবর পাইয়া পরদিন বিয়ানেঐ আমরা তিনজন গেছি থানায়। গিয়া দেহি রতনার বাপ-চাচারাও গেছে। রতনা বাপ-চাচার লগে একটাও কথা কইল না। আমাগ তিন জনরে কইল, দেশ সাদিন করলা ঠিকঐ, মায়া কইরা শক্রডিরে ছাইড়া দিলাম। মহা ভুল করলাম রে। তয় তরা একখান কাম করিচ। অহনে কেঐর কিছু কইচ না। কইয়া পারবিও না। শত্রুরা অহনে শক্তিশালী অইতাছে। আরো অইব। আবার আমাগ একখান যুইদ্ধ করতে অইব। কবে ছাড়া পামু জানি না। তয় তরা আমার লেইগা দেরি করি। এইবারের যুইদ্ধ আরো বড় অইব। একটা শরেও আমরা আর ছারুম না।
বুড়ো নেতাইচরণ দেখে তিনটি যুবকের মুখে এখন ক্রোধ জ্বলছে! চোয়াল শক্ত হয়ে। গেছে, চোখ খাখা। নদীর হাওয়ায় লম্বা চুল উড়ছে সবার। কেউ খেয়াল করে না। কেবল বাচ্চু ছেলেটা আনমনে লুঙির কোড় থেকে বিড়ি বের করে ধরায়। দেখে নেতাইচরণ সব ভুলে বিড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। বাহ্যির গন্ধ ভরা মুখটা হা করে একটা শ্বাস ফেলে। তাতে নদীর মোলায়েম হাওয়া একটু ভারি হয়ে যায়।
খোকা বলল, রতনার বাপ-চাচারা কি করে! রতনার জামিনের তদবির করে না!
দুলাল বলল, করতাছে। হপ্তায় হপ্তায় মুন্সিগুইঞ্জ যায়। কাম অয়না। চেরম্যান সাবে। পুলিশ দারোগা ম্যালা পয়সা খাওয়াইছে। এর লেইগ্যাঐ তো রতনার বাপে গেছিল চেরম্যান সাবের কাছে।
নেতাইচরণ এসবের কিছুই শুনছে না। তার চোখ বাচ্চুর হাতের দিকে। বিড়ি জ্বলছে। নেতাইচরণের টানা বিড়ি মুখে দেবে না ওরা। নেতাইচরণ টানলে বিড়ির পাছায় বড় বদগন্ধ হয়। এই কথাটা একদম মনে থাকে না বাচ্চুর।
খোকা বলল, চেরম্যান সাবে কী কইল?
সাফ কতা কইয়া দিছে, আমি কিছু করতে পারুম না। আমার কাছে আইয়া কাম অইব না।
শুনে বাচ্চু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঠিক সেই সময় দূরে একটা লঞ্চের মৃদু ভটভট শব্দ শোনা যায়।
খোকা বলল, আমি ইট্টু মুইত্তা আহিরে। লঞ্চ আইয়া পড়লে মানুষজন থাকব। মুততে দেরি অইয়া যাইব। বলে থোকা উঠে গেল জেটির পেছন দিকে। তারপর ঘোলা জলে নিজের স্বচ্ছ জল ছাড়তে শুরু করে। সেই শব্দে বাছুর কেন যে স্কুলে একটা ভাব সম্প্রসারণের লাইন মনে আসে। লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির।
কথাটা ভেবে বাচ্চু একটু হাসে। তারপর গম্ভীর হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা দেশটাকে যা দিল, স্বাধীনতা, তা কি তাহলে একবিন্দু শিশিরের মতো মূল্যহীন। আসুক রতন, ফাইনাল যুদ্ধটা করে আমরা এবার দেশকে বলব, নাও স্বাধীনতা। এ শিশির বিন্দুর মতো মূল্যহীন নয়। এ এক অমূল্য সম্পদ।
লঞ্চটা জেটিতে লাগার সঙ্গে সঙ্গে খোকা ফিরে এল। ততক্ষণে ছোটখাটো একটা ভিড় লেগে গেছে নির্জন জেটিতে। নদীতীরের চায়ের দোকানের জন্য পাঁচ-ছয় অভাজন যাত্রী নেমে এল জেটিতে। মাথায় বগলে বোচকাঁচকি। কেউ যাবে ফরিদপুরে, কেউ যাবে ভাগ্যকুল বাজার। জেটির গায়ে লেগে থেকে লঞ্চটা এখন রাগী খোদাই ষাঁড়ের মতন গোঁ গোঁ করছে। আর তীব্র একটা ঢেউ দিচ্ছে জলে। তাতে ছোট্টা লোহার জেটিটা পুঁটি মাছের মতো লাফালাফি করছে। চারজন মানুষ সেই জেটিতে বসে দোলনায় চড়ার মতো দোল খায়।
বাচ্চু তাকিয়েছিল লঞ্চের দিকে। লঞ্চের ছাদে ম্যালা লোজন, মালপত্র। সেসবের ভেতর থেকে মাত্র তিনজন যাত্রী নামল।
সারাদিন তিনবার লঞ্চ ভিড়ে মাওয়ার ঘাটে। সকালবেলা, দুপুরের পর, আর শেষটা সন্ধের আগে আগে। তিনটে লঞ্চই জেটিতে বসে বসে দেখে বাচ্চুরা। সকালবেলা আসে দশটা এগারটার দিকে। সেটা চলে গেলে দুপুরেরটার অপেক্ষা। সেটা চলে গেলে সন্ধেরটার।
রতন এই লঞ্চে করে ফিরে আসবে একদিন। বাছুরা কি রতনের অপেক্ষায় বসে থাকে! রতন ফিরে এলে একটা কাজ পাওয়া যাবে। জেটিতে অপেক্ষা করতে হবে না। জীবনটা অন্যরকম হয়ে যাবে তাদের।
দুলাল বলল, ঐ দেক রতনার বাপে।
শুনে নেতাইচরণসহ তিনজন লোক চমকে ওঠে। বাচ্চু দেখে, লুঙি আর ফতুয়া পরা রতনার বুড়ো বাপ নদীর হাওয়া বাঁচিয়ে বিড়ি ধরাচ্ছে। কাঁধে পুরনো কালের একটা চাদর, বগলে তালি মারা ছাতা। মুন্সিগঞ্জ থেকে রতনার কেসের তদবির করে ফিরল। মুখটা এত শুকনো লোকটার, দেখে বাচ্চুরা বুঝে যায়, রতনার কোনও গতি হয়নি।
দুলাল বলল, ল রতনার বাপের লগে কতা কয়াহি।
তারপর তিনজন একসঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। ওদের দেখাদেখি বুড়ো নেতাইচরণও। কাঁধে আলোয়ানখানা জড়িয়ে সেও যায়।
লঞ্চটা তখন চার পাঁচজন যাত্রী তুলে নিয়ে উজান ঠেলতে আরম্ভ করেছে। তার উতাল পাতাল ঢেউয়ে জেটিটা এখন নাচছে।
