নেতাইচরণ তখন হা করে বিড়িটা দেখছে। কেউ দুটানের বেশি দিলেই হা হা করে উঠবে। বিড়ির বেজায় লোভ নেতাইচরণের।
দুলাল বলল, বুজলেন নেতাই দাদা জুয়ানমদ্দ মাইনষের আর একখান দোষ অইল মাইয়া মাইনষের। আমাগো রতনারে দেখলেন না! মুক্তিবাহিনীর কমণ্ডার আছিল। চেরম্যান সাবের মাইয়া আলতার লগে পিরিত। হেই মায়ায় চেরম্যান সাবরে মারল না রতনা। আমাগও মারতে দিল না। নাইলে আপনেঐ কন মুক্তিবাহিনীর আমলে চেরম্যান সাব কী কামডা করল। শান্তিবাহিনী বানাইল, মেলেটারিগ লগে বাও দিয়া কত কিছু করল। গেরামের নিরীহ মানুষটিরে কম জ্বালাইছে! বাচ্চুর বাপরে ধমকাধমকি করছে, তুমার পোলায় কই গেছে কও আমারে নাইলে আমি মেলেটারিগ খবর দিমু। আমার বড় ভাইরে খোকার বাপরে বেবাকতেরে হালায় অপমান করছে। রতনার বাপরে তো হাজার মাইনষের সামনে এই মাওয়ার বাজারে খাড়াইয়া শুয়ারের বাচ্চা বাইনচোত কইয়া বকল। বুড়া মানুষ দেইকা আত উডায় নাই। হেই চেরম্যান সাবরে রতনা কিছু কইল না। দেশ সাদিন অওনের আগে আগে আমরা যহন গৈরামে আইলাম, রতনা হইল গিয়া আমাগ কমণ্ডার, আমাগ ইচ্ছাই আছিল গেরামে আইয়া পয়লাঐ চেরম্যান সাবের লাশখান পদ্মায় ভাসামু। চিডি আর কাফোনের কাপড় পাডাইলাম। চেরম্যান সাবের মাইয়া আলতা বুইজ্জা গেলো এইডা কাগ কাম। গোপনে কারে দিয়া যেন রতনারে খবর পাডাইল। রাইত দুইফরে রতনা গেল আলতার লগে দেহা করতে। আমাগ কিছু কইল। না। পরদিন বিয়ানে কয়, আমার কথা ছাড়া চেরম্যান সাবের বাড়ির সামনে যাবি না কেঐ। আমরা তহন বুজলাম রতনার পায়ে আতে দইরা কান্দাকাডি করছে আলতা। মাইনষে কয় না মাইয়ামাইনষে যোল্লোকলা জানে। আলতার লগে অইল রতনার পিরিত। মন গলতে কতক্ষুণ লাগে!
বাচ্চু বলল, আমি তহনঐ কইছিলাম কামডা ভাল করলি না রতনা। মাইয়া মাইনষের লাইগা দেশের শত্রুরে বাঁচাইয়া দিলি। বুজবি একদিন, ভাও মতন পাইলে এই চেরম্যান সাবেঐ তরে খাইব। অহনে বুজবি না।
দুলাল বলল, কয়দিন বাদে দেশ গেল সাদিন অইয়া। তহন আমরা রাজাকার শান্তিবাহিনীর মানুষ খুঁইজা বেড়াই। রতনাও আমাগ লগে। এই গেরামে ঐ গেরামে যাই, চেরম্যান সাবের বাইত যাই না। চোক্কের সামনে এত বড় শত্রু তারে কিছু কইতে পারি না। রতনা না কইলে আমরা কেমনে কই! নাইলে আপনেঐ কন নেতাই দাদা, চেরম্যান কম জ্বালাইছে মাইনষেরে! নেতাইচরণ তখন বিড়ির পাছা বড় মায়ায় টানছে। দুলালের কথায় থতমত খেয়ে বিড়িটুকু ছুঁড়ে ফেলে নদীর জলে। তারপর খসখসে গলায় বার দুয়েক খাকারি দেয়। কও কি, জ্বালায় না আবার! আমার কতাডা চিন্তা কর। জগতে কেঐ নাই, বাড়িঘর নাই। কুত্তার লাহান মাওয়ার বাজারে ছনছায় পইড়া থাকি। মাইনষে জুডা আইষ্টা দেয় খাই, একটা দুইডা পয়সা দেয়, বিড়িডা দেয় খাই। নাপতালি ছাইড়া দিছি কুনকালে। নাপতালি কির লেইগা ছারলাম হেডা তো আবার তুমরা জানো না। একদিন বিয়ানরাইতে দেহি মুচিপাড়ার কিষ্ণ মুরতি আমার মাতার সামনে আইয়া খাড়াইছে। আমি হের মিহি চাইতেঐ কয় নেতাই, মাইনষের চুলদাড়ি আমি দিছি। হেই জিনিশ তুই কাডচ কা!
গুম থিকা উইঠা আমি এই আলোয়ানখান গায়ে দিয়া বাইর অইলাম। কিষ্ণ কইছে, খুর কেচি ধরন ছাইড়া দিলাম। বাইত আর গেলাম না। বাজারে থাকি বাজারে গুমাই। কেঐ কিছু দিলে খাই, নাইলে খাই না। এই রকম মানুষ অইলাম গিয়া আমি। মেলেটারিগ আমলে আমারে একদিন ধরল চেয়ারম্যান সাবে। আমি বইয়া রইছি কাসেমের দোকানের সামনে। বিয়ানবেলা। হেইকালে চেরম্যান সাব আইল বাজারে। ম্যালা মানুষজন লগে। চেরম্যান সাবেরে দেইখা আমি উইঠা খারাইছি। পেন্নাম কত্তা। চেরম্যান সাব কয় কী জানোনি! ঐ নাস্তার পো, নাপ্তালি করচ না ক্যা? হুইন্যা আমার বুকটা কাইপা উঠল। ঢোক গিল্লা কইলাম, কিষ্ণ সপ্নে একদিন কইল, বুজলেন না কত্তা। হুইন্না চেরম্যান এক ধমক লাগাইল, বানরামি পাইছ হালার পো। বুজরকি চোদাও আমার লগে। কাইল থনে যুদি দেহি তুই খুর কেচি না দরচ তাইলে বুজবি মজা। মেলিটারিগ খবর দিমু। ইন্দু পাইলে মেলিটারি সাবেরা কতা কইব না, পুটকি দিয়া গুলি হান্দাইব। হুইন্যা আমার জানডা পানি অইয়া গেল। হেইদিনঐ গেরাম ছাইরা পালাইলাম। গেলাম গা সোনারং। হেই মুন্সিগঞ্জের সামনে। আহা কী কষ্টডা করলাম তারবাদে। অচিন দেশ মাইনষে চিনে না। তিন চাইরদিন বাদে একদিন খাওন জুটত। ভিক্কা কইরা। তারবাদে হুনলাম দেশ সাদিন অইছে। বেবাক মেলেটারি পলাইছে। আবার গেরামে আইলাম। তারপর থনে তো তোমায় লগেই। কিন্তু চেরম্যান সাবেরে তো দেহি আগের লাইনঐ আছে। অহনে দেখলেও কত্তা কইয়া পেন্নাম দিতে হয়।
দুলাল বলল, বেবাকঐ রতনা হালার লেইগা। পিরিত চোদাইলা, অহন বোজ শালা। জেলের ভাত খাইতাছ। চেরম্যান যতদিন বাইচা আছে জেল থনে আর বাইর অওন লাগব না।
বাচ্চু বলল, একটা জিনিস দেকলি দুলাল। সাদিন অইল একবছর কাটল না, চেরম্যান কইলাম আগের লাহান ক্ষমতা পাইয়া গেছে। আওয়ামী লীগের নেতাগ লগে খাতির। আমাগ বালও মনে করে না অহন। সাদিনের পরপর কী খাতির করত আমাগ। বাজান ছাড়া কতা কইত না।
খোকা বলল, বেবাক অইল অস্ত্রের গুণ। বুঝলি না! অস্ত্র জমা দেওনের পর থনেঐ কলম চেরম্যান সাব আমাগ আর চিনে না।
