খোকা বলল, বুজছি বুজছি। কন তারবাদে।
আহা হেইদিন আর নাই। দিগলী তহন বিরাট বন্দর। বিয়ান রাইতে মিসটেইম ফিরত। জাউল্লারা নাও বোঝাই ইলশামাচ উডাইত ইস্টিমারে। হেই মাচ যাইত গোয়ালন্দ কইলকাত্তা। আর এই মাওয়ার ঘাট দিয়া যাওনের সময় মিসটেইমখান কী সোন্দর একখান আওয়াজ দিত। ভোঁ ও ও ও
মুখখান চোক্কা করে হুবহু ইস্টিমারের সিটি বাজিয়ে দেয় নেতাইচরণ। শুনে বাচ্চুরা তিনজন হেসে ফেলে।
কিন্তু নেতাইচরণ ওসব খেয়াল করে না। অবাক হয়ে বলে, ছোডকালে তোমরা মেইল মিসটেইম দেহ নাই, আওয়াজ হোনো নাই। ঠিক এইরকম আওয়াজ করত।
বাচ্চু বলল, ছোডকালে তো পদ্মায় আমরা কুনও ইস্টিমার দেহি নাই। খালি লঞ্চ দেকছি।
অহনও যেমন লঞ্চ আগে ঠিক অমনুনঐ আছিল। খালি এই জেটিখান আছিল না। গাঙের পার আছিল মাঝগাঙে। লঞ্চ আইসা চটান মাটিতে সিঁড়ি নামাইত।
দুলাল বলল, গাঙের ভাঙনে কলম আমাগো একটা উপকার অইছে।
খোকা বলল, কী?
এইডা বুজচ না! গাঙে না ভাঙলে গবম্যান্ট এই মাওয়ার ঘাটে জেটি দিতনি! জেটি না থাকলে আমরা বইতাম কই!
নেতাইচরণ মুগ্ধ গলায় বলল, এইডা হাচা কতা।
বাচ্চু বলল, এই হগল বাদ দেন। আলোয়ানের গল্পখান কন নেতাই দাদা।
হ হ। আমার ঠাকুরদাদায় আছিল কুণ্ডেগ বাড়ির বান্দা নাপিত। রোজ বিয়ানে যাইয়া বড় কত্তারে পেন্নাম করত। তারবাদে মুখ বানাইত, চারি কাইট্টা দিত। কত্তায় সাতদিনে একদিন চুল ছাটাইত। কইলকাত্তা চইলা যাওনের সময় কত্তায় খুশি অইয়া ঠাকুরদাদারে আমার এই আলোয়ানখান দিয়া গেল। এইডা কলম ইন্দুস্থান পাকিস্তান অওনের বহুত আগের ঘটনা। পাকিস্তান অইল আমার আমলে। আমার পিতামাতা বেবাক তহন সগগে। বলেই নেতাইচরণ বিনীত দুহাত নমস্কারের ভঙ্গিতে কপালে ঠেকাল। ব্যাপারটা। বাছুরা জানে। মা বাপের উদ্দেশ্যে কথা বললেই নেতাইচরণ এই ভাবটা করে। শ্রদ্ধা। খোকা বলল, আপনের আমলে তাইলে দুইবার দেশ সাদিন অইতে দেকলেন?
হ হ পাকিস্তান অইতে দেকলাম তারবাদে দেকলাম বাংলাদেশ অইতে। তয় হোনো আলোয়ানখান ঠাকুরদাদায় মইরা যাওনের সময় দিয়া গেল আমার বাপরে।
খোকা বাধা দিলে বলল, আপনের আর কুন কাকা জ্যাঠা আছিল না?
শুনে দুলাল ধমকে ওঠে, তুই বড় বাজে প্যাঁচাইল পারচ খোকা। দাদারে গল্পডা কইতে দে। নেতাইচরণ বলল, তুমরা তো কিছু জানো না। আমাগো বংশে কলম একটা কইরাঐ পোলা অয়। আমি আমার বাপের এক পোলা, বাপ আছিল ঠাকুরদাদার একপোলা, ঠাকুরদাদায় আছিল তার বাপের এক পোলা, এইভাবে চৌদ্দপুরুষ। খোকা বলল, আপনে বিয়া করলেও আপনের এক পোলা অইত?
হ। এর লেইগাইতো বিয়া করলাম না। এক পোলা থাকনের বিরাট দুঃখু জগতে। মা বাপ মইরা গেলে আপনজন থাকে না। ভাই বেরাদর হইল গিয়া মাইনষের জোরবল। জোরবল না থাকলে জগতে বাইচ্চা লাভ নাই। আমারে দেহ না জগতে আপন কেঐ নাই। এই দুঃখু তুমরা বুজবা না। আমার পোলা অইলে আমি মইরা যাওনের পর হেয়ও একলা অইয়া যাইত। একলা থাকনের দুঃখু বুজি দেইখাঐ তো বিয়া করি নাই।
দুলাল বললো, তয় আলোয়ানখান আপনের বাপে দিয়া গেল আপনেরে?
হ। আমারে ছাড়া আর কারে দিব!
খোকা বলল, আপনের অহন বয়েস কত নেতাই দাদা?
কথাটা শুনে বাচ্চু খর চোখে খোকার দিকে তাকায়। নেতাইচরণের পুরো গল্প ওদের জানা। তবুও পুরোনো প্যাচাল খোকা যে কেন তোলে!
নেতাইচরণ বলল, আমার বয়েস হইল গিয়া আড়াই কুড়ি।
এই বয়েসে আপনে বুড়া অইয়া গেলেন?
সব ভগমানের কিরপা। বুড়া অওনঐ ভালা। জুয়ান মদ্দ থাকনের ম্যালা জ্বালা।
দুলাল বলল, এই একখান কতার লাহান কথা কইছেন। আমাগো দেকলেন না! জুয়ান মদ্দ মানুষ দেইখাঐত এই হগল করতাছি। দেশ সাদিন করনের লেইগা পাকিস্তানী মেলেটারি খেদানোর লেইগা যুইদ্ধ করলাম। দেশ সাদিন করলাম। যুইদ্ধ খতম। আমরা বেবাকতে গেলাম আজাইর অইয়া। কামকাইজ নাই, টেকাপয়সা নাই। যুইদ্ধের সময় মাইনষে কী খাতির কুরত্ব। যেহেনে যাইতাম থাকন খাওন ফিরি, টেকাপয়সা নেও কত লাগব। এই মাওয়ার বাজারে আইলে দোকানদাররা বিড়িসিগ্রেটের প্যাকেট দিত, চা মিষ্টি খাওয়াইত। বেবাক মাগনা। মুক্তিবাহিনী কুনো কথা কইলে কুন হালায় রাও করে! আর অহন দেহেন যুইদ্ধ খতম, দেশ সাদিন অইল, আমাগো বাল দিয়াও পোছে না কেঐ। মা বাপে বকা দেয়, মাইনষে চোখ তারা কইরা চায়। কুনহানে আমাগো জাগা নাই। এর লেইগাঐ তো এই জেটিতে আইসা বইসা থাকি। খালি আপনে ছাড়া কেঐর লগে আমাগো খাতির নাই।
কথা শেষ করে দুলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
খোকা বাচ্চু দুজনেরই চেহারা এখন অন্যরকম। গম্ভীর। কেবল নেতাইচরণ ওদের দুঃখ কষ্টের ব্যাপারটা বোঝে না বলে গায়ের আলোয়ানখানার গর্বে বাপদাদার গর্বে হাসিখুশি মুখে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। বিড়ি খাওয়ার কথা একদম মনে নেই তার।
ঠিক এই সময় বাচ্চু গম্ভীর মুখে লুঙির কোড় থেকে বিড়ি বের করে একটা। তারপর ম্যাচ বের করে বিড়ি ধরায়। দেখে বুড়ো নেতাইচরণসহ বাকি দুজন বহুকালের অনাহারীর মতো হা করে বাচ্চুর বিড়িটার দিকে তাকায়। বাচ্চু ওসব খেয়াল করে না। বিড়ির ধোয়া নদীর হাওয়ায় ভাসতে থাকে।
খোকা বলল, দুইটান কইরা দেইস বাচ্চু।
বাচ্চু বলল, দুইটান কইরা অইব না। এক দেড়টান কইরা অইব বেবাকতের। দিতাছি। বলেই বিড়িটা দিল দুলালের হাতে। দুলালও কোনওদিক না তাকিয়ে পরপর দুটো টান দেয় বিড়িতে। তারপর দেয় খোকার হাতে।
