শ্রীনাথ কিছু বুঝতে পারে না। সিট থেকে নেমে কাচুমাচু হয়ে সাহেবের সামনে দাঁড়ায়।
সাব আমার অপরাধ অইছে? আপনে রাগ করেছেন?
আরে না পাগল। তুই বোস। আমি চালাই। তুই তো অনেকক্ষণ চালালি। তাছাড়া নিজে তো সারাজীবন মানুষ টেনে গেলি, আজ কেউ তোকে টানুক।
এবার কথাটা বোঝে শ্রীনাথ। বুঝে হা হা করে ওঠে। এইডা অয় না সাব। ভগবান মানুষরে এমুন কইরাঐ পয়দা করছে। কেঐ চিরদিন টাইন্না যায়, আর কেঐ যায় বইয়া আপনে বহেন।
একথায় সাহেব একটু রেগে যান। গলা ভারি করে বলেন, শ্রীনাথ যা বলছি কর।
তারপর লুঙিটা হাটুর ওপর তুলে পরেন। চশমাটা খুলে দেন শ্রীনাথের হাতে। এটা চোখে পরে বোস। আর তোর গামছাটা দে আমাকে।
শ্রীনাথ কিছুই বুঝতে পারে না। বোকার মতো চশমাটা পরে। আর গামছাটা খুলে দেয় সাহেবের হাতেই। তারপর জবুথবু হয়ে পেছনের সিটে ওঠে বসে। সাহেবের পুরু কাঁচের চশমা তার চোখে। সেই চোখে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবকিছু অন্যরকম দেখে শ্রীনাথ।
শ্রীনাথের গামছাটা শ্রীনাথের মতো করে কোমরে বাঁধে সাহেব। তারপর রিকশা চালাতে শুরু করেন। প্রথম কয়েকটি প্যাডেল মারতে তার একটু অসুবিধা হয়। হ্যাঁন্ডেল এদিক ওদিক ঘুরে যায়। তাই দেখে শ্রীনাথ হাসে। নামেন, পারবেন না সাব। যার কাম তারে করতে দেন। আমি রিকশায় বইয়া থাকুম আর আপনে রিকশা চালাইবেন, ভগবান সইব না।
সাহেব ততক্ষণে কায়দাটা শিখে ফেলেছেন। এখন আস্তেধীরে চালিয়ে যাচ্ছেন। চোখে তার চশমা নেই। চশমা ছাড়া পৃথিবীটা তিনি খুব অন্যরকম দেখেন। দুপাশে শস্যের মাঠ। তাতে নীল জ্যোৎস্না উপুড় হয়ে পড়েছে। আবহমান হাওয়াটা আছেই। শস্যচারা আর জ্যোৎস্নার উপর লুটোপুটি খাচ্ছে। এসবের মাঝমধ্যিখান দিয়া সাদা পথ। কোথায় কোন দূরে যে চলে গেছে। সেই পথে রিকশা চালান এসডিও সাহেব। পেছনের সিটে চশমা চোখে শ্রীনাথ। পৃথিবীটা সে এখন খুব অন্যরকম দেখছে।
সাহেব বললেন, শ্রীনাথ আজ তোর ভগবানের সঙ্গে দেখা করব।
চশমা পরা চোখে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে শ্রীনাথ। কথা বলে না। শস্যের মাঠে, আবহমান হাওয়ায় আর জ্যোৎস্নায় ভগবান যে কোথায় লুকিয়ে আছেন, দুজন মানুষের কেউ তা জানে না।
প্রস্তুতিপর্ব
নদীর দিকে তাকিয়ে বাচ্চু খুব উদাস গলায় বলল, ইলশা মাছের জন্মবেত্তান্ত লইয়া কিছু কন নিতাই দাদা।
বুড়ো নেতাইচরণ ঠাকুরদার আমলের আলোয়ানখান অকারণে কাঁধের ওপর একটু জড়িয়ে বলল, বিড়ি ধরাও। বিড়ি না খাইলে কথা আহেনি।
বিড়ি আছে তিনখান। ইসাব কইরা না খাইলে টাইম যাইব কেমনে!
বুড়ো নেতাইচরণ ফোকলা মুখে একটু হাসে। পোকায় খাওয়া ভাঙাচোরা দাঁত নেতাইচরণের। জন্মের পর ভুলেও কখনও দাঁত মাজেনি। হলুদ ছোপ ধরা দাঁতে কথা বলতে শুরু করলেই নেতাইচরণের মুখ থেকে মানুষের বাহ্যির গন্ধ ভুরভুর করে বেরোয়। এই জন্যে বাচ্চুরা নেতাইচরণের গা বাঁচিয়ে বসে। মুখের সামনে ঘেঁষে না ভুলেও।
মুখখান নেতাইচরণের, শালা আস্ত একখান খোলা পায়খানা। বাতাস দিলে গুয়ের গন্ধ ছোটে।
খোকা বলল, ইবার পদ্মায় ম্যালা ইলিশ পরছে। দেহচ না কত নাও।
চারজন একসঙ্গে তারপর নদীর দিকে তাকায়। মাঝনদীতে পালতোলা জেলে নাও শয়ে শয়। হাওয়ার টানে ভাটির দিকে ছুটছে। দেখে বাচ্চু আবার বলল, নেতাই দাদা ইলশা মাছের জন্ম বেত্তান্তডা—
পুরনোকালের চোখ দুটো নদীর দিক থেকে ফিরিয়ে নেতাইচরণ ফোকলা মুখে আবার একটু হাসে। আলোয়ানখান কাঁধের ওপর আবার একটু জড়ায়। বিড়ি না অইলে, বুঝলা না!
দুলাল বলল, বাচ্চু বিড়ি বাইর কর।
দুলালের দিকে তাকিয়ে বাচ্চু একটুখানি চোখ টেপে। দেখে দুলাল বোঝে, বাচ্চু এখন বিড়ি বের করবে না। নেতাই দাদাকে অন্য কথায় ভুলাতে হবে।
দুলাল বলল, নেতাই দাদা আপনে সব সময় আলোয়ানখান পইরা থাকেন কেন?
শুনে নেতাইচরণ আবার হাসে। বড় মায়ায় আলোয়ানখান কাঁধে জড়ায়। আলোয়ানখানের বয়েস জানো?
তিনজন একসঙ্গে বলল, না।
সঙ্গে সঙ্গে নেতাইচরণের শাদাকালো দাড়ি গোঁফঅলা বিভৎস মুখটা গর্বে উজ্জ্বল হয়ে যায়। পাটের আঁশের মতো লম্বা চুল নদীর মগ্ন হাওয়ায় উড়ছে, চোখে স্বপ্নের ছোঁয়া। নেতাইচরণকে এখন বহুদূরের মানুষ মনে হয়। অচেনা। বাছুরা এটাই চাইছিল। এখন নেতাইচরণ সম্পূর্ণ আত্মমগ্ন হয়ে যাবে। বিড়ির কথা ভুলে যাবে। তারপর শুরু করবে। আলোয়ানের গল্প। বহুবার শোনা গল্পটাই বাচ্চুরা এখন মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকবে। যেন জীবনে এই প্রথম শুনছে।
নেতাইচরণ বলল, আলোয়ানখানের বয়েস হইল সাড়ে পাঁচ কুড়ি। আমার ঠাকুরদাদারে দিছিল, ভাইগ্যকুলের কুণ্ডেগ নাম হুনছ? তিনজন একসঙ্গে বললো, হ।
নেতাইচরণ খুশি হয়ে বলল, বিক্রমপুরের বেবাক মাইনষে হেগো নাম জানে। না জাইন্নানি পারে, কও? হেরা আছিল বিক্রমপুরের সেরা ধনী। বাইশখান আছিল ইস্টিমার। ঢাকা থনে গোয়ালন্দ যাইত, গোয়ালন্দ থনে যাইত কইলকাত্তা। এই গাঙ দিয়া যাইত। বিয়ান রাইতে যাইত মিসটেইম আর দুইফরে মেইল।
খোকা বলল, মিসটেইম কি?
শুনে দুলাল ধমকে উঠে, ঐ বেডা এতো প্যাচাইল পারচ ক্যা?
নেতাইচরণ ফোকলা মুখে হাসে। বিয়ান রাইতে যেই ইস্টিমারখান যাইত হেইডারে কইত মিসটেইম। আর দুইফরে যাইত হেইডা অইল গিয়া মেইল।
