তারপর আশি সুতোর মিহি লুঙি পরা, গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, সাহেব গিয়ে দাঁড়ান শ্রীনাথের রিকশার সামনে। লুঙি গেঞ্জি পরে তিনি কখনো গেটের বাইরে যান না, একথা তাঁর মনে থাকে না।
সাহেবকে দেখেই সিট থেকে লাফিয়ে নেমেছে শ্রীনাথ। দেরি হইয়া গেছে সাব। ক্ষমা কইরেন। ম্যালা দূরে গেছিলাম।
সাহেবের ঠিকই সেই মুহূর্তে, পুর্ণিমা দেখতে যাবেন মনে পড়ে। কথা না বলে তিনি রিকশায় ওঠে বসেন।
গেঞ্জি গায়ে লুঙি পরা সাহেবকে রিকশায় ওঠতে দেখে শ্রীনাথ খুব অবাক। আগেই খানিকটা হয়েছিল। দেরি করেছে, সাহেব তাকে একটুও বকল না যে! আবার এখন যে খালি গায়েই রিকশায় ওঠে! তবুও শ্রীনাথের কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না। সিটে বসে জিজ্ঞেস করে, টাউনের বাইরে যামু সাব?
সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, যা।
তখন জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে শহর। রাস্তার আলোগুলো জ্যোৎস্নায় মার খেয়ে পিটপিট করে জ্বলছে। দেখে ভীষণ বিরক্ত হন সাহেব। মনে মনে ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের লোকজনের ওপর বেজায় চটে যান তিনি। এই রকম জ্যোৎস্নায় ইলেকট্রিসিটির দরকার কী! কালই অর্ডার দিতে হবে পূর্ণিমা রাতে যেন শহরের রাস্তাঘাটে ইলেকট্রিসিটি না থাকে। অযথা অপচয়।
কিন্তু ততক্ষণ সারা শহরে খবর হয়ে গেছে, এসডিও সাহেব গেঞ্জি গায়ে রিকশা করে বেরিয়েছেন, রাস্তার দুপাশ থেকে বাড়িঘর থেকে, মুদিমনোহারি, পান-বিড়ি-সিগ্রেট চায়ের দোকান, ডিসপেনসারি, লাইব্রেরি থেকে লোকজন সব অবাক হয়ে এসডিও সাহেবকে দেখছে। কেউ কেউ সালাম দিচ্ছে। সাহেব এসবের কিছুই দেখছেন না। . সালাম নিচ্ছেন না। কেবল মোটা কাঁচের ভেতর থেকে চাঁদ দেখছেন, জ্যোৎস্না দেখছেন।
ব্যাপারটা খেয়াল করছিল শ্রীনাথ। সাহেবকে দেখে পাবলিক মজা পাচ্ছে। গেঞ্জি গায়ে, লুঙি পরা এসডিও সাহেব রিকশা চেপে শহরে বেরিয়েছেন এমন মজার দৃশ্য যেন জগতে আর নেই। কথাটা ভেবে শ্রীনাথ খুব বিরক্ত হয়। সওয়ারি হল গিয়ে দেবতা। দেবতাকে দেখে লোকে হাসাহাসি করবে শ্রীনাথ তা সয় কেমন করে। সারা দিনের ক্লান্ত শরীর। জোর বল নেই গায়ে। বয়স। রিকশা চালাতে পা টনটনায়, অবশ হয়ে আসে। তবুও প্রাণপণে হাওয়ার বেগে রিকশা চালায় শ্রীনাথ। পাপিষ্ঠদের চোখ থেকে যত দ্রুত নিকেশ হওয়া যায়।
মুন্সেফ কোর্ট ছাড়িয়ে একটা সিনেমা হল। সবে ইভিনিং শো শুরু হয়েছে। রিকশা হলের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, কথা নেই বার্তা নেই হৈচৈ করে যাবতীয় লোকজন হল ছেড়ে রাস্তায়।
শ্রীনাথ বুঝতে পারে, সিনেমার দৃশ্যের চেয়েও মজার দৃশ্য রাস্তায়, সেই দৃশ্য দেখতে লোকজন সব বেরিয়ে আসছে।
কিন্তু সাহেব কি এসবের কিছু খেয়াল করেন? করেন না। করে শ্রীনাথ। আর রাগে জ্বলে যায়। সওয়ারি হল দেবতা। দেবতার অপমান শ্ৰীনাথ সইতে পারে না। বুড়ো শরীরের যাবতীয় শক্তি দুপায়ে এনে রিকশা চালায়। মুহূর্তে পেরিয়ে যায় জায়গাটা।
শহরের শেষপ্রান্তে পাকা বড় রাস্তাটা যেখানে শেষ, সেখানে হাসপাতাল। রিকশা সেখানে আসতেই সাহেব আকাশের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে অবাক হয়ে হাসপাতাল বিল্ডিংটা দেখেন। শাদা বিল্ডিঙে জ্যোত্সা পড়ে কী যে একটা দৃশ্য! রূপকথার ঘুমন্ত রাজপুরী মনে হয়! ভেতরে কি সোনার কাঠি রুপোর কাঠি শিয়রে রাজকন্যা ঘুমিয়ে আছে! সাহেব ছেলেমানুষের মতো এই কথাটা ভাবেন। তারপরই চমকে ওঠেন। চিনতে পারেন, এটা হাসপাতাল। মনটা খারাপ হয়ে যায়। আহা, শরীরে অসুখ নিয়ে মানুষেরা শুয়ে আছে ওখানে! কষ্ট যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছে। রোগকাতর মানুষের উদ্দেশ্যে যিশুখৃস্টের মতো অস্পষ্ট স্বরে সাহেব তারপর বললেন, ঈশ্বর উহাদের পরিত্রাণ করুন।
শ্রীনাথ বলল, এইবার কুন দিকে যামু সাব? পাকা রাস্তা তো এহেনেঐ শেষ!
জ্যোত্সায় সাহেব দেখেন বুড়ো শ্রীনাথ ক্লান্তিতে ভেঙেচুরে যাচ্ছে।
দুটো কথা সম্পূর্ণ করতে চারবার শ্বাস টেনেছে।
সাহেব বললেন, শহরের বাইরে যাওয়ার পথ নেইরে শ্রীনাথ?
আছে সাব। কাঁচা। ঝাঁকানি লাগব আপনের।
লাগুক। তুই যা।
রিকশা থেকে নেমে আস্তেধীরে রিকশাটা হাতে টেনে নেয় শ্রীনাথ।
কাঁচা রাস্তায় নামায়। তারপর আবার রিকশায় ওঠে।
সাহেব দেখেন, শহরের বাইরে উদার শস্যের মাঠ প্রান্তর অব্দি। তাতে নিজের যাবতীয় জ্যোৎস্না ঢেলে দিয়েছে চাঁদ। আর চিরকালের পরোনো হাওয়াটা তো আছেই। এখন জ্যোত্সায় শস্যের মাঠে দুরন্ত শিশুর মতো লুটোপুটি খাচ্ছে।
সাহেব অস্পষ্ট স্বরে বললেন, আহা!
শ্রীনাথ সে সময় খুকখুক করে খানিক কাশে। সাহেব শোনেন শ্রীনাথের গলায় সারা জীবনের ক্লান্তি। তারপর হঠাৎই চমকে ওঠেন তিনি। আহা, ভাই আমার ভাই। আমাকে এই এতদূর টেনে এনেছো। আমি মূঢ় তোমার কষ্ট বুঝিনি।
তারপরই চেঁচিয়ে ওঠেন সাহেব। শ্রীনাথ তুই পেছনের সিটে যা।
শুনে শ্রীনাথ হাসে। কেন সাব?
তুই তো আমাকে অনেক দূর নিয়ে এলি, এবার আমি তোকে খানিক দূর নিই।
শ্রীনাথ মূর্খ। প্যাচানো কথা বোঝে না। বলল, কী কন সাব?
তুই আরাম করে পেছনে বস। আমি রিকশা চালাই।
শুনে আঁতকে ওঠে শ্রীনাথ। হায় হায় কন কী সাব! আমার কুন দোষ অইছে! আস্তে চালাইছি! আপনে বহেন। দেহেন এহন কেমুন জোরে চালাই।
সাহেব হাসেন। না না ওসব কিছু না। তুই পেছনে বোস।
