শুনে সাহেবের ডান ভ্রূতে সেই তিনটে ছোটবড় গিঁট। দেখে স্ত্রী আর আপত্তি করেননি। কিন্তু এই লোকের সঙ্গে কে যায় নাটকফাটক দেখতে। মফঃস্বল শহরের ওই নাটক, ছেলেপানদের পার্ট, তাই দেখে কী খুশি সাহেব! তিন চারটে সিন রিপিট করিয়েছেন। নাটক চলছে, একটা সিন শেষ হয়েছে, সামনের সারি থেকে অমনি চেঁচিয়ে উঠলেন সাহেব, আহা এই সিনটা বড় চমৎকার হয়েছে। রিপিট করো।
আবার শুরু হল পুরোনো সিন। এইভাবে তিন চারবার। দেখে পাবলিক তো বিরক্ত হয়েছেই, স্ত্রী কন্যাও কম হয়নি। কিন্তু কারও কিছু বলার নেই।
এই তো গেল এক উৎপাত। সবচে বাজে ব্যাপারটা ছিল, হাতে একটা বেত নিয়ে বসেছিলেন সাহেব। মঞ্চের সামনে, মেঝেতে বাচ্চাকাচ্চারা বসেছিল। অকারণে তারা তো চেঁচামেচি করবেই। আর তাতেই সাহেবের মাথা গরম। প্রায়ই বেত হাতে দাঁড়িয়ে পড়েন। দুচার ঘা লাগিয়ে দেন। তখন তাকে দেখায় পাঠশালার পণ্ডিত মশায়দের মতো। ওই শ্রেণীর লোকদের স্ত্রীর খুব অপছন্দ।
তারপরও মাসে মাসে নাটক হয় শহরে। সাহেব হলেন বড় উদ্যোক্তা। প্রায়ই রিহার্সেল দেখতে যান। চাঁদাফাদা তুলে দেন। আর নাটকের দিন তো তিনিই সব। কিন্তু স্ত্রী আর যান না। কোনও না কোনও অছিলায় বাড়ি থাকেন। কষ্টটা যায় রাণীর ওপর দিয়ে।
কিন্তু সবচে বাজে কাজটা সাহেব করলেন কিছুদিন আগে। শহরের কলেজে পড়া মুসলমান একটা ছেলের সঙ্গে কবিরাজ বেণীমাধববাবুর বড় মেয়ের প্রেম। শহরের সবাই জানে। কিন্তু হিন্দু মুসলমানের প্রেম, ব্যাপারটা কেউ ভালো চোখে দেখে না। কিন্তু দুজনেই ডেসপারেট। বিয়ে করবেই।
এসব শুনে কবিরাজ মশাই দুতিনবার মেয়েকে কোলকাতা পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। বারবারই ছেলেটা তার দলবল নিয়ে স্টেশানে গিয়ে উপস্থিত হয়। উপায় না দেখে কবিরাজ মশায় কেস করেন।
একদিকে ছেলের বাপও খুব রেগে গেছে ছেলের ওপর। সে ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করবে, কাছারিতে গেছে।
এসডিও সাহেব ঘটনাটা আগেই শুনেছিলেন। ছেলেটা নাটকফাটক করে। তার কাছে। গিয়ে কেঁদে পড়েছে, ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না স্যার।
এসডিও সাহেব একদিন সকালে কাছারিতে গিয়েই কবিরাজ মশায় আর ছেলের বাপ দুজনকেই পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে এনেছেন। এনে সোজা হাজতে ভরেছেন। তারপর নিজে টাউন হলে কাজি ডাকিয়ে, শহরের আরো দুচারজন নিয়ে বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। মিষ্টি কেনার টাকা আর কাজির খরচ ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, নিশ্চিন্তে সব করো। দুজনকেই আমি হাজতে আটকে রেখেছি। বিয়ে শেষ হলেই ছাড়া পেয়ে যাবে। আমি বলে দিয়ে এসেছি।
সেই বিকেলে কী যে হৈ চৈ শহরে। ছেলে ছোঁকরারা সাহেবের খুব ভক্ত হয়ে গেল। শোনা যায়, ছেলের বাপ আর কবিরাজ মশায়কেও নাকি সেই বিয়ের মিষ্টি খাইয়ে ছেড়েছেন সাহেব। কিন্তু এসবের ফলে এসডিও সাহেবের বাসায় ছোট্ট একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়। স্ত্রী তার সঙ্গে কয়েকদিন কথা বলেন না।
তিন চারদিন দেখে সাহেব একদিন নিজেই স্ত্রীকে বললেন, তুমি অযথা রাগ করে আছ। আমি কোনও অধর্ম করিনি, কোনও পাপ করিনি। সত্যিকারের প্রেমই তো বড় ধর্ম। ওরা দুজন দুজনকে ছাড়া বাঁচবে না। তোক হিন্দু মুসলমান। আমি দুজনকে মিলিয়ে দিয়েছি।
সেই সাহেব এখন এই শেষ বিকেলে অস্থিরভাবে বাগানে পায়চারি করছেন। পরনে আশি সুতোর মিহি লুঙি, গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি। হাতে সিগ্রেট জ্বলছে। আর ঘুরে ঘুরে চায়ের টেবিলের সামনে গিয়ে শ্রীনাথ রিকশাঅলার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আজ পূর্ণিমা। শ্রীনাথকে সকালবেলা বলে রেখেছেন, সন্ধ্যেবেলা তার রিকশা চড়ে শহরের বাইরে যাবেন পূর্ণিমা দেখতে। বহুকাল খোলা আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে পূর্ণিমা দেখা হয়নি তার।
কিন্তু শ্রীনাথ হারামজাদা আসছে না কেন? সন্ধ্যে হয়ে এল!
সাহেব আবার একটা সিগ্রেট ধরান। কেটলি থেকে ঠাণ্ডা চা ঢালেন কাপে। তারপর পায়চারি করতে করতে কাপে চুমুক দেন।
তখন কোয়ার্টারের পেছনে মরা ব্রহ্মপুত্র তার ওপারে শস্যের যে উদার মাঠ, সেই জায়গাটা ভেঙেচুরে পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে ওঠে আসে। ওঠেই লক্ষকোটি জ্যোত্সর রেখা পাঠিয়ে দেয় শহরের ওপর। মরা ব্রহ্মপুত্রের পুরোনো হাওয়াটা সেই মুহূর্তে একটুখানি জোরদার হয়। জ্যোৎস্নার রেখা বয়ে আনে এসডিও সাহেবের বাগানে। চা খেতে খেতে দৃশ্যই দেখেন সাহেব, দেখে মাথা খারাপ হয়ে যায় তার। এই রকম একটা। দৃশ্যই আজ শহরের বাইরে, ভোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখার ইচ্ছে ছিল। সকালবেলা শ্রীনাথকে বলে রেখেছিলেন।
কিন্তু শ্রীনাথ হারামজাদাটা এখনো আসছে না। সাহেব ঘন ঘন সিগ্রেটে টান দেন। প্রচণ্ড রেগে গেলে যা হয় তার।
তখন নিঃশব্দে শ্রীনাথের রিকশা এসে দাঁড়িয়েছে বাগানের ওপারে। গাছপালার ফাঁক ফোকর দিয়ে বুড়ো শ্ৰীনাথকে দেখতে পান সাহেব। খালি গা, কোমরের তলায় কোরা ধুতিটা লুঙির মতো করে পরা। আর শ্রীনাথের কোমরে যে ময়লা গামছাটা দিনমান বাঁধা থাকে, সেটা এখন তার হাতে। শ্রীনাথ কি খুব ক্লান্ত! বহুদূর থেকে রিকশা চালিয়ে এসেছে!
গাছপালার আড়াল থেকে সাহেব দেখেন শ্রীনাথের বুকের হাড় শ্বাস-প্রশ্বাসের তালে খেলা করছে। দাড়িগোঁফঅলা কালো মুখটা হা করে ব্রহ্মপুত্রের পুরোনো হাওয়া খাচ্ছে শ্রীনাথ। জলের মতো স্বচ্ছ জ্যোৎস্নায়ও শ্রীনাথের চোখ দেখা যায় না। দু খাবলা অন্ধকার জমে আছে দুচোখে। হাওয়ায় বুড়ো শ্রীনাথের পাতলা চুল ফুরফুর করে ওড়ে। দেখে সাহেব তার যাবতীয় রাগের কথা ভুলে যান। পূর্ণিমা দেখতে যাবেন শ্রীনাথকে বলে রেখেছিলেন, ভুলে যান। মনে মনে এই মুহূর্তে সাহেব কেবল একটা কথাই বলেন, ভাই আমার ভাই।
