এসব ভেবে চোখ ভরে আসার কথা রতনের। কিন্তু হল তার উল্টো। চোখ দুটো কী রকম জ্বলে উঠল তার। অফিসারের দিকে তাকিয়ে শীতল গম্ভীর গলায় রতন বলল, আমাকে ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না সাহেব। আমাকে হাজতেই রাখুন। ছেড়ে দিলে নেতা হত্যার প্রতিশোধ নেব আমি।
পাগল সাহেব
বাগানের গাছপালায় বিকেল শেষ হয়ে আসছে দেখে এসডিও সাহেব একটু বিরক্ত হন। শ্রীনাথ হারামজাদা গেল কোথায়? বিকেল পড়ে গেল, এখনও আসছে না কেন? শ্মশানখোলায় গিয়ে একা একাই চিতায় ওঠল নাকি!
কারো ওপর রেগে গেলে সাহেব একটু ঘন ঘন সিগ্রেট খান। আর চা। খালি কাপেও অনেক সময় চুমুক দিয়ে ফেলেন। অন্যমনস্কতা। এই যেমন এখন। আনমনে হেঁটে হেঁটে টেবিলটার সামনে যান সাহেব। বিকেলবেলা, শীতকাল গরমকাল নেই সাহেবের একটু বাগানে বসার অভ্যেস বলে, বেতের গোলটেবিল আর একটা চেয়ার চিরকালের জন্য পাতা আছে বাগানে। বিকেলবেলা চাকর আবদুল কাদের চিনেমাটির কেটলি ভর্তি চা, একটা কাপ আর সিগ্রেট-ম্যাচ রেখে যায়। একা বাগানে, গাছপালার ছায়ায় ফুলের গন্ধে আর মফঃস্বল শহরের পুরোনো হাওয়ায় বসে চা খেতে, সিগ্রেট খেতে সাহেব খুব পছন্দ করেন। তার পরনে তখন আশি সুতোর মিহি লুঙি, গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি।
এই দেখে প্রথম প্রথম স্ত্রী খুব আপত্তি করতেন। তুমি এই শহরের এসডিও। বড় সাহেব। সবাই তোমাকে চেনে, শ্রদ্ধাভক্তি করে। বিকেলবেলা তুমি যে লুঙিগেঞ্জি পরে বাগানে বস, বাড়ির পাশ দিয়ে সারা শহরের লোকজনের চলাচল, তারা দেখে কী ভাবে বলো তো!
শুনে সাহেব তাঁর মোটা কাঁচের চশমা নাকের ওপর একটুখানি ঠেলে দেন। তারপর ডানদিকের জ্বতে ছোট বড় তিনটে গিঁট ফেলে বললেন, কী ভাবে?
স্ত্রী বুঝতে পারেন, সাহেব রেগে গেছেন। রেগে গেলে তার ডানদিকের জতে ছোট বড় তিনটে গিঁট পড়ে। গলার স্বর অচেনা হয়ে যায়।
স্ত্রী আর কথা বলেন না। সাহেব বললেন, যতক্ষণ কাছারিতে থাকি, আমি ততক্ষণ এসডিও। বাইরে আমি একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি। লোকের ভাবাভাবিতে আমার কিছু এসে যায় না। এসডিও হয়েছি বলে, নিজের বাড়িতেও কি আমি আমার প্রিয় অভ্যেসগুলো পালন করতে পারব না! তাছাড়া লুঙি পরে, বিকেলবেলা একা একা বাগানে বসে চা সিগ্রেট খাওয়ার সুখ আমি ছাড়া কে বোঝে।
প্রথম প্রথম স্ত্রী দুএকদিন তার সঙ্গে বাগানে গিয়ে বসেছেন। কিন্তু বসেই টের পেয়েছেন সাহেব তার উপস্থিতি পছন্দ করেন না, কিন্তু সাহেব মুখে কিছুই বলেননি। মেয়েমানুষেরা চিরকালই মেয়েমানুষ বলে এসব ব্যাপার বুঝতে পারে। সাহেবের স্ত্রীও বুঝতে পেরেছিলেন। তারপর আর কখনো যাননি। বিকেলবেলা দোতলার রেলিঙে দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে স্বামীকে দেখেন। একাকী বাগানে বসে আছে কিংবা পায়চারি করছে, চা সিগ্রেট খাচ্ছে। এতকালের চেনা লোকটাকে তখন যে কী অচেনা মনে হয়! এই লোকটাই তাঁর সন্তানের পিতা। বিকেলবেলা রেলিঙে দাঁড়িয়ে প্রায়ই তার এই কথাটা মনে হয়।
এই শহরে আসার কিছুদিন পরে, স্কুল থেকে ফিরে মেয়ে রাণী একদিন বলল, মা জানো বাবা কী করেছেন?
কী?
পেশকার সাহেব তাঁর মেয়েকে নাটকে পার্ট করতে দেবেন না বলে বাবা নাকি তাঁকে খুব বকেছেন। এই নিয়ে স্কুলের মেয়েরা, আপারা খুব হাসাহাসি করেছে আজ। দু একজনকে বলতে শুনলাম, এসডিও সাহেবের মাথায় ছিট আছে।
রাতেরবেলা কথাটা বলতেই এসডিও সাহেব রেগে গেলেন। ডানদিকের জাতে তিনটে গিঁট ফেলে বললেন, মেয়েটার পার্ট করার খুব ইচ্ছে, বুঝেছ। স্কুলে কয়েকবার করেছেও। একবার নাকি বেগম রোকেয়ার চরিত্রে চমৎকার পার্ট করেছিল। তাছাড়া নীলকণ্ঠবাবুরা এবার যে নাটকটা করছে, তার নায়িকার পার্ট ঐ মেয়ে ছাড়া আর কাউকে দিয়ে হবে না।
স্ত্রী গম্ভীর গলায় বললেন, হোক না হোক তাতে তোমার কী?
এ কথায় সাহেব ভীষণ অবাক হয়ে যান। কী বলছ, আমি তো নীলকণ্ঠবাবুদের উপদেষ্টা। ওদের নাটকটি যাতে ভালোভাবে হয়, তা আমি দেখব না! তাছাড়া মেয়েটার যদি উৎসাহ না থাকত তাহলে অন্য কথা। ওর ইচ্ছে তো ষোলোআনা। নীলকণ্ঠবাবু বলার সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়েছে। বলেছে, বাবাকে বলবেন। কিন্তু পেশকার সাহেবকে বলায়, তিনি পারলে নীলকণ্ঠবাবুকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদেয় করেন। তখন বাধ্য হয়েই আমি—
এসডিও সাহেব একটু থামেন। তারপর কথা নেই বার্তা নেই হো হো করে হেসে ওঠেন। বুঝলে, পেশকার সাহেবকে কীরকম ম্যানেজ করলাম। লোকটার ঘুষফুষ খাওয়ার অভ্যেস। আমি এখানে আসার পরপরই কিছু কাগজপত্র হাতে এসেছে। প্রমাণাদি। সেগুলো হাতে নিয়ে ধীর গলায় বললাম, পেশকার সাহেব চাকরিটা করার ইচ্ছে থাকলে আজ থেকে মেয়েকে রিহার্সেলে পাঠিয়ে দেবেন।
তারপর আবার সেই হাসি। প্রাণখোলা। দেখে স্ত্রী সেই মুহূর্তে আরেকবার ভেবেছেন, সত্যি কি এই লোকটা তার সন্তানের পিতা!
সেই নাটকের টাকা-পয়সাও জোগাড় করে দিয়েছিলেন এসডিও সাহেব। কোর্ট থেকেই টাকা উঠেছিল বেশি। যাকে যাকে জামিন দিয়েছেন, তাদের উকিলদের বলেছেন, জামিন দিলাম। কিন্তু একটা কথা আছে আমার। নীলকণ্ঠবাবুদের নাটকে পঞ্চাশ টাকা চাঁদা দেবেন।
সেই নাটক স্ত্রীকন্যা নিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন এসডিও সাহেব। মফঃস্বল শহরের নাটক ইত্যাদি শুরু হয় রাত আটটার পর। চলে রাত একটা দুটো অব্দি। এই ব্যাপারটা স্ত্রীর খুব অপছন্দ। তিনি যেতে চাননি। বলেছিলেন, রাণীকে নিয়ে তুমি যাও।
