দীনু মাথা নাড়ল। না।
যেই হগল মাছ ঘোপায় পানি ভইরা রাখন যায় হেই মাছরে কয় জিওল মাছ। কই শিং মাগুর।
বুজছি
জিওল মাছ পাওয়া যাইত শীতের দিনে। কচুরির মইদ্যে, পানির মইদ্যে যেই হগল জাগায় জঙ্গল অয় হেই হগল জাগায় পাওয়া যায় জিওল মাছ। বাজানে ডুবাইয়া ডুবাইয়া ধরত।
শীতের দিনে আমরা খালি জিওল মাছ খাইতাম। কী স্বাদ যে আছিল হেই মাছে!
এতক্ষণে মাঠটা শেষ হয়। কামার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় বুলবুলি আর দীনু। ঝোপঝাড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে সাপের মতো বাঁকা একটা পথ চলে গেছে বাড়ির ভেতর। ওরা দুজনে সেই পথে বাড়ির ভেতর ঢুকে যায়।
কিন্তু পুরো বাড়িটা দুতিনবার চষেও কিছুই পায় না ওরা। না দু-একটা কচুর লতি, না এক আধখানা মুখি। দীনু পাগলের মতো পেয়ারা গাছগুলো দেখে। এক আধটা কড়া পেয়ারাও নেই।
দীনু হতাশ গলায় বলল, কই লইয়াইলা বুবু। কিচ্ছু নাই তো!
বুলবুলি বলল, কী করুম ক। মাইনষে বেবাক কিছু খাইয়া হালাইছে।
তারপর হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পেছনে দিকটায় চলে আসে ওরা। বাজারের দিককার বড় সড়কটা চলে গেছে কামার বাড়ির পেছন দিয়ে। সেখানে বাড়ির মুখে একটা দেবদারু গাছ। বহুকালের পুরোনো গাছ। মাথায় ঘন ডালপালা বলে দিনমান তলায় পড়ে থাকে মিঠেল একখানা ছায়া। ক্লান্ত বাজারীরা কখনও কখনও জিরোতে বসে দেবদারুতলায়। মাঠ ছাড়া দু-একটা গরুছাগল এসে অলস ভঙ্গিতে বসে জাবর কাটে। দেবদারুর ডালে বসে থাকে কাক, শালিক।
দীনুকে নিয়ে দেবদারু তলায় চলে এল বুলবুলি। পা আর চলতে চাইছে না। একটু জিরোবে। কিন্তু দেবদারু তলায় একটি লোক বসে আছে। বসে আরামসে বিড়ি কুঁকছে। গায়ে নীল একখানা পিরান তার। সেই পিরানের ওপর গলার কাছে বাঁধা লাল টকটকে রুমাল।
বুলবুলি এবং দীনুর পায়ের শব্দে চমকে মুখ ফেরাল লোকটি। সঙ্গে সঙ্গে বুলবুলি দেখতে পেল মুখভর্তি কুৎসিত বসন্তের দাগ তার। রোদেপোড়া তামাটে চেহারা। মাথার কদমছাটি চুল আর মুখ দেখে বোঝা যায় বহুঘাটের জল খাওয়া লোক সে।
বুলবুলিকে দেখেই হা করে, কী রকম চোখে যেন তাকাল লোকটি। তাকিয়ে রইল। চোখে পলক পড়ে না। দেখে শরীরের খুব ভেতরে অদ্ভুত এক কাঁপন লাগল বুলবুলির। দরকার নেই তবু বুকে আঁচল টানল সে। কেমন জড়োসড়ো হয়ে গেলে।
লোকটির পায়ের কাছে খুবই অবহেলায় পড়ে আছে মুখ বাধা বিশাল ভারি একটি বস্তা। সেই বস্তা দেখে চোখ দুটো চকচক করে উঠল বুলবুলির। লোকটির চোখে দেখে শরীরের খুব ভেতরে যে কাঁপনটা লেগেছিল মুহূর্তে কোথায় যে হাওয়া হয়ে গেল সেই কাঁপন।
বস্তার ভেতর কি আছে।
চাল!
বুলবুলির মতো দীনুও তাকিয়ে ছিল বস্তাটির দিকে। দেখে দাঁত কেলিয়ে হাসল লোকটি। বলল, বস্তা ভরা চাউল, বাজলা। শিমইল্লা বাজার লুট অইল তো, এক বস্তা মাথায় লইয়া আইয়া পড়লাম।
শুনে অবাক হয়ে লোকটির মুখের দিকে তাকায় বুলবুলি। ভাবে, চাইব নাকি দুমুঠো চাল। এত বড় এক বস্তা চাল। চাইলে কি দুমুঠো দেবে না লোকটি!
বুলবুলির মুখ দেখে লোকটি কী বুঝল কে জানে, বুলবুলির সঙ্গে কোনও কথা বলল না সে। হাত ইশারায় দীনুকে ডাকল, আস, আমার কাছে আস খোকা।
দীনু একবার বুলবুলির দিকে তাকাল। তারপর পায়ে পায়ে লোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কি কন? তোমার নাম কি?
দীনু।
বইনের নাম?
বুলবুলি।
লোকটি আবার বুলবুলির দিকে তাকাল। হাসল। বাহবা, বুলবুলি। বুলবুলি পাখি। ভারি সোন্দর নাম!
সেই ফাঁকে বুলবুলি দেখতে পেল লোকটির মুখের দাঁত পোকায় খাওয়া। নোংরা। হাসলে কুৎসিত দেখায়।
লোকটি তখন পিরানের পকেট থেকে চকচকে একটা সিকি বের করেছে। করে দীনুর চোখের সামনে তুলে ধরেছে। এইডা নিবা দীনু। নেও। নিয়া সোজা বাজারে যাও বিসকুট খাইয়া আস। চোখের সামনে চার আনা পয়সা দেখে দীনু একদম পাগল হয়ে। যায়। চার আনায় অনেকগুলো বিসকুট পাওয়া যাবে। খেয়ে বাজারের চাপকল থেকে পানি খেলে পেট এমন ভরা ভরবে, চার দিন আর খিদে লাগবে না।
ছোঁ মেরে পয়সাটা নিল দীনু। তারপর বাজারের দিকে এমন একটা দৌড় দিল, বুলবুলি কিছু বলার আগেই বহুদূর চলে গেল।
দীনু চলে যেতেই বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলল লোকটি। তারপর বুলবুলির দিকে তাকিয়ে হাসল। বুলবুলি পাখি, চাইল নিবানি?
শুনে বুলবুলির অবস্থা হল দীনুর মতো। এমন একটা আনন্দের ঢেউ ওঠল শরীরে। চোখের ওপর বুলবুলি দেখতে পেল লোকটির দেয়া চালে হাঁড়িভরা ভাত রান্না হয়েছে। মুক্তোদানার মতো ফুরফুরে সাদা ভাত। মা সে আর দীনু বাসন ভর্তি করে ভাত খাচ্ছে। লোকটি ততক্ষণে ওঠে দাঁড়িয়েছে। বুলবুলির একটা হাত ধরেছে। দিমু ম্যালা চাইল দিমু। আস।
বুলবুলিকে জঙ্গলের দিকে টেনে নেয় লোকটি। বুলবুলি কথা বলে না। বাধা দেয় না। চোখ জুড়ে তার তখন বাসন ভর্তি ভাতের স্বপ্ন।
.
চড়ুই পাখির মতো লাফাতে লাফাতে ফিরে এল দীনু। বাজারের মুদি দোকান থেকে চার। আনার বিসকুট কিনে খেয়েছে। তারপর আজলা ভরে পানি খেয়েছে চাপকল থেকে। পেট একদম ভরে গেছে। পেট ভরা থাকলে মনে বেদম ফূর্তি আসে মানুষের। দীনু এখন তেমন স্ফুর্তিতে আছে।
হাঁটুতে মাথা গুঁজে গাছতলায় বসেছিল বুলবুলি। আঁচলে দুআড়াইসের পরিমাণ চাল। চালটা বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রেখেছে সে।
