বুলবুলি চমকে ওঠল। কী কমু?
ধানের কিচ্ছা কও। ভাতের কিচ্ছা কও।
দুঃখী বিষণ্ণ চোখে একবার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায় বুলবুলি। ম্লান হাসে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমাগো কাউন্না বিলের জমিনের ধান পাকত আগন মাসে। বাজানের মুখে হুনছি আগন মাসে বিলের কিনারে গিয়া খাড়াইলে দেহা যাইত চাইরদিকে খালি পাকা ধান, পাকা ধান। সোনার লাহান বরণ সেই ধানের। গেন্দাফুলের পাপড়ির লাহান বরণ। বিয়ানবেলা বিলে যহন রইদ পড়ত সেই রইদে বিলের পাকা ধান সোনার লাহান ঝকমক ঝকমক করত। বাতাস অইলে গাঙ্গের ঢেউয়ের লাহান দোল খাইত। বাজানে কইত বিলের কিনারে খাড়াইলে বুকটা তার ভইরা যায়। ফূর্তিতে আমুদে ভইরা যায়।
দীনু অবাক গলায় বলল, তারবাদে?
হেই পাকা ধান মুখে কইরা কাইটা নিত টিয়ায়, বাইয়ে। মাইট্টা ইন্দুরেও গদে ভইরা রাখত বচ্ছরের ধান। ধান কাডা অইয়া গেলে ইন্দুরের গদের ধান উড়াইয়া আনত গরিব মাইনষে। ইন্দুরের গদের ধানে তাগো দুই তিন মাসের খাওন অইয়া যাইত।
বুলবুলি একটু থামল। খিদেটা পেটের ভেতর এমন হয়েছে, কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কীরকম এক ক্লান্তি, অবসাদ। কিন্তু দীনু আছে সঙ্গে। কথা তো বলতেই হবে। কথা। বলে খিদে ভুলিয়ে রাখতে হবে দীনুর।
বুলবুলি বলল, বুঝলি দীনু, মাইট্টা ইন্দুরের গদে আবার সাপ গিয়া থাকত। জাইত সাপ, দাঁড়াইস সাপ। ধানের লেইগা গদে হাত দিলে সাপে কাটত। হাজামবাড়ির মজিদরে তো সাপেই কাটছিল।
দীনু বলল, কেমনে! কেমনে সাপে কাটল!
গেছিল ইন্দুরের গদ থিকা ধান উডাইতে। একছালা উডাইছে এমুন সুময় উদ্দিস পাইল হাতের বুইড়া আঙ্গুলে খাজুর কাড়ার লাহান কী একটা জানি বিনদা গেল। কী বিষ! গদ থিকা হাত আর উডাইতে পারে নাই মজিদ। ইন্দুরের গদের মদ্যে হাতখানা রইল, মজিদ গেল মইরা।
সাপের গল্প ভালো লাগল না দীনুর। সে বলল অন্য কথা। আমাগো ডোল আছিল বুবু? বুলবুলি বলল, কচ কী! আছিল না!
কয়ডা?
চাইর পাঁচটা আছিল।
মলনের গরু আছিল?
না হেইডা আছিল না। বাজানে চউরা কামলা লইয়া ধান কাইট্টা আনত। আইন্না উডানে। হালাইত। বিয়াইন্না রাইতে কামলারা গান গাইত আর ধান পাড়াইত। ছোড গিরস্থগো ধান পাড়াইয়াই লয়।
কামলারা কী গান গাইত?
ওই যে হেই গানডা। সোনার ধান কাইট্টা আনো, গোলায় তোলো। গান হুনলে আমার আর ঘুম আইত না। জাইগা থাকতাম। একখান পিড়ি লইয়া দরজার সামনে বইয়া থাকতাম।
চউরা কামলাগো ধান পাড়ান দেখতাম। গান হুনতাম।
চউরা কাগো কয় বুবু?
আগন মাসে পদ্মার চর থিকা শয়ে শয়ে মানুষ আইত দেশ গেরামে। হেগো কয় চউরা। আইত ধান কাটতে। যা ধান কাটত তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ পাইত হেরা। ধান কাটা শেষ অইলে হেই ধান বস্তায় ভইরা চউরারা চইলা যাইত। চউরারা বড় আমুদে মানুষ ভারি সোন্দর গান করত।
কোন ধানের চাউল ভালা বুবু?
সোনাদিগা ধান।
ভাতের স্বাদ কেমুন?
হেই কথা আর কইচ না ভাই!
তারপর একটু থেমে বুলবুলি বলল, কাঁচা নাইরকল খাইছচ?
দীনু বলল, না।
খাচ নাই! না খাইলে বুজবি কেমনে!
তুমি কও।
কাঁচা নাইরকলের যেমুন স্বাদ অয় হেমুন স্বাধ অয় সোনাদিগার ভাতে। তরকারি ছাড়া দুই তিন বাসন ভাত খাইয়া হালান যায়।
শুনে পেটের ভেতর কেমন করে দীনুর! খিদেটা মনে হয় সারা শরীরে ছড়িয়ে গেছে। গলাটা শুকিয়ে মাঠের বাঁজা মাটি হয়ে গেছে।
দীনু একটা ঢোক গিলল। এইবার মাছের কিচ্ছা কও বুবু। দুধের কিচ্ছা কও।
কথা বলতে আর ভালো লাগছে না বুলবুলির। খিদেয় শরীর কেমন অবশ হয়ে আসছে। হাঁটতে ভাল্লাগে না, কথা বলতে ভাল্লাগে না।
দীনুর ওপর কী রকম একটা বিরক্ত লাগছে। চারদিকের আলো হাওয়া মাটি কোনও কিছুই বাস্তব মনে হচ্ছে না। অতিরিক্ত খিদেয় নেশার মতো কী রকম একটা ঘোর তৈরি হয়েছে চোখে। তিনদিন কিছুই প্রায় খাওয়া হয়নি। পরশু দুপুরে ভিক্ষা মেগে একমুঠ চাল পেয়েছিল মা। সেই চালে জাউ বেঁধে খেয়েছে তিনজন মানুষ। তাতে পেটের এক কোণাও ভরেনি। তারপর থেকে টানা উপোস। শরীর থরথর করে কাঁপে বুলবুলির। পা চলতে চায় না।
কিন্তু এসব দীনুকে বুঝতে দেয়া যাবে না। সেইও তো বুলবুলির মতোই। অতটুকু ছেলে না খেয়ে কেমন করে যে এখনও বেঁচে আছে!
দীনুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা জ্বলে যায় বুলবুলির। মরা মাছের মতো ফ্যাকাসে। হয়ে গেছে দীনুর মুখ। হাঁটছে, যেন প্রচণ্ড মার খাওয়া এক কুকুরছানা।
দীনুকে দেখে ভেতরে ভেতরে নিজেকে গুছিয়ে নেয় বুলবুলি। ভাইটিকে তার মাছের গল্প বলে। দুধের গল্প বলে। এক দুর্দান্ত সুখের দিন এসে দাঁড়ায় বুলবুলির চোখের সামনে। বাইষ্যাকালে তো দেশ গেরাম পানিতে ডুইবা যায়। খাল দিয়া পদ্মার গাং থিকা ঘোলা পানি আইয়া তো দেশগেরাম ভাসাইয়া দেয়। পানি থাকে তিন মাস। হেই তিন মাস মাছের আকাল অইত না। কত পদের যে মাছ! বাড়ির ঘাডা থিকা জালি দিয়া ম্যালা মাছ ধরত বাজানে। পাবদা টেংরা চটাচটা পুডি রয়না টাকি বাইল্লা, খাও কত মাছ খাইবা। কাতিমাসে পানিতে টান ধরত। তখন দুনিয়া ভইরা যাইত মাছে। বশ্যি হালাইলেই মাছ। জাল হালাইলেই মাছ। ফলি কাউন্না মাগুর আইর বোয়াল। বাজানে এক বিয়াইল মাছ ধরলে হেই মাছ আমরা তিন চাইর দিনে খাইয়া ছাড়াইতে পারতাম না। আর জিউল মাছ তো আছিলই। জিওল মাছ কারে কয় জানসনি দীনু?
