দীনুকে দেখেই ওঠে দাঁড়াল বুলবুলি। খিদের চেয়েও বড় কোনও যন্ত্রণায় তখন ধুকছে সে। চোখে মুখে অদ্ভুত এক কষ্টের ছাপ।
কিন্তু দীনু ওসব খেয়াল করে না। বুবুর আঁচলে চাল দেখে খুশিতে পাগল হয়ে যায় সে। উচ্ছ্বাসের গলায় বলল, হেয় তোমারে চাইল দিছে বুবু?
বুলবুলি ক্লান্ত গলায় বলল, হ.
ইস আইজ তাইলে পেড ভইরা ভাত খাওন যাইব।
হ। ল বাইত যাই।
ঠিক তখুনি দীনু দেখতে পেল বুলবুলির পেছন দিকে ছেঁড়াখোঁড়া মলিন শাড়িতে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। দেখে চমকে উঠল সে। বুবু তোমার কাপড়ে দিহি রক্ত! এত রক্ত বাইর অইল কেমনে!
বুলবুলির বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। উদাস দুঃখি গলায় বলল, একবার ধান কাটতে গিয়া বাও হাতের লউঙ কাইট্টা হালাইছিল বাজানে। ম্যালা রক্ত বাইর অইছিল। দেইখা মায় কইল ধানক্ষেতে রক্ত দিয়া আইলানি। হুইনা বাজানে কইছিল, পেড ভইরা ভাত খাইতে অইলে রক্ত তো ইট্টু দেওন লাগবই। আমিও আইজ পেড ভইরা বাত খাইওনের লেইগা রক্ত দিছি। এইডি হেই রক্ত। বাজানে দিছিল লউঙ কাইট্টা আমি দিছি অন্য জিনিস কাইট্টা।
কথা বলতে বলতে জলে চোখ ভরে এল বুলবুলির।
নেতা যে রাতে নিহত হলেন
পুলিশ অফিসারটি বেশ মার্জিত ধরনের। চেয়ারে গা এলিয়ে খুবই আয়েশি ভঙ্গিতে সিগ্রেট টানছিলেন তিনি। টেবিলের সামনে দুজন সাধারণ পুলিশের সঙ্গে অত্যন্ত নিরীহ, গোবেচারা, গ্রাম্য লোকটিকে দেখে চোখ তুলে তাকালেন। কিন্তু বসার ভঙ্গিটি বদলালেন না। সিগ্রেটে টান দিয়ে বললেন, কি, ঘটনা কি?
দুজন পুলিশের একজন বলল, আমার খুব সন্দেহ হচ্ছিল।
অপরজন সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমারও স্যার। লোকটির চাল-চলন আচার-আচরণ খুবই সন্দেহজনক। নেতার বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল সে।
নেতার কথা শুনে পুলিশ অফিসারটি বেশ ধাক্কা খেলেন। গা এলানো ভাবটা মুহূর্তে কেটে গেল তার। চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন তিনি। টেবিলের ওপর, হাতের কাছে ছিলো তাঁর পুলিশি টুপি। টুপিটা নিয়ে যত্ন করে মাথায় পরলেন। যেন এইমাত্র দায়িত্বে বহাল হলেন। এতক্ষণ যেন ছুটি কাটাচ্ছিলেন।
হাতের সিগ্রেট এসট্রেতে গুঁজে দিয়ে তীক্ষ্ণ চোখ তুলে লোকটির দিকে তাকালেন অফিসার। আকাশি রঙের ঝুল পকেটঅলা শার্ট পরা। ডোরাকাটা লুঙি বেশ খানিকটা উঁচু করে পরেছে। যেন নিচু করে পরলে ধুলোময়লা লেগে যাবে। লোকটির খালি পা এবং মুখের রঙ প্রায় একই রকম। রোদে পোড়া, নিরেট কালো। মাথার ঘন কালো চুল কদমছাট দেয়া। দাড়িগোঁফ দু একদিন আগে কামিয়েছে। থানার ভেতরকার উজ্জ্বল আলোয় অফিসার দেখতে পেলেন, লোকটির গালের শক্ত চামড়া ভেদ করে ধারালো দাড়িগোঁফ মাথাচাড়া দিচ্ছে।
লোকটির ঠোঁট খুব পুরু। নাক থ্যাবরা। পরিশ্রমী, পেশিবহুল শরীর। কিন্তু চোখ দুটি বেশ কৌতূহলী। বুকের কাছে জীর্ণ কাপড়ের একটি পুঁটলি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে সে।
অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন, নাম কী?
প্রশ্নটি কাকে করা হয়েছে বুঝতে পারল না লোকটি। সঙ্গের পুলিশ দুজনের দিকে তাকাল সে।
একজন বলল, আমাদের নয়, তোমার নাম জানতে চেয়েছে।
অপরজন বলল, আমাদের নাম স্যারে জানেন। তোমার নাম বল।
লোকটি সামান্য গলা খাকারি দিল। তারপর অমায়িক মুখ করে বলল, আমার নাম সাহেব রতন। রতন মাঝি।
কি কর?
দুজন পুলিশের একজনের স্বভাব হচ্ছে কথা একটু বেশি বলা। আসলে অফিসারকে তোয়াজ করা। সে হাসি হাসি মুখ করে বলল, নামের শেষে যখন মাঝি আছে নিশ্চয় নৌকা বায় স্যার।
সঙ্গে সঙ্গে রতন নামের লোকটি হা হা করে উঠল। না না সাহেব, না, নৌকা বাইনা। নৌকার মাঝি না আমি। আমার বাবা-দাদায় আছিল মাঝি। সেই থেকে আমাদের পদবি হয়েছে মাঝি।
অফিসার আগের মতোই গম্ভীর গলায় বললেন, তাহলে কি কর তুমি?
রতন বলল, আমি সাহেব ভাগচাষী।
বেশি কথা বলা পুলিশটি বলল, চাষী বুঝি। কিন্তু ভাগচাষী তো বুঝি না। ভাগচাষী জিনিসটা কি!
অফিসার এবার রেগে গেলেন, আঙুল তুলে বললেন, তুমি চুপ কর। আমি যতক্ষণ কথা বলব আমার সামনে একটিও কথা বলবে না। একদম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে।
জ্বি আচ্ছা স্যার।
আবার কথা। তোমাকে না বললাম একদম চুপ। একদম পাথর।
লোকটি যেন সত্যি সত্যি পাথর হয়ে গেল।
অফিসার আবার রতনের দিকে তাকালেন, বল।
রতন বলল, কি বলব সাহেব?
কি কর তুমি?
ওই যে বললাম, ভাগ চাষী। নিজের জমি নাই। পরের জমি আধাআধি ভাগে চাষ করি।
বাড়ি কোথায়?
তা অনেক দূর সাহেব। পদ্মার ওপার দিয়ে তিন চার ঘণ্টা একটানা হাঁটতে হয়। গ্রামের নাম উদয়পুর।
এখানে এলে কি করে?
এখানে তো সাহেব আপনার লোকজন ধরে নিয়ে এল।
অফিসার বেশ বিরক্ত হলেন। কিন্তু তার স্বভাব হচ্ছে একটু একটু করে অনেকক্ষণ ধরে রাগেন। তারপর এক সময় ফেটে পড়েন। রাগের প্রাথমিক পর্যায়টা শুরু হয়ে গেছে। গম্ভীর গলায় অফিসার বললেন, এখানে মানে আমি শহরের কথা বলেছি।
রতন সরল ভঙ্গিতে হাসল। শহরে সাহেব লঞ্চে করে এসেছি। পদ্মার পার থেকে সকালবেলা চড়েছি, শেষ বিকালে শহরে এসে নামলাম। বাড়ি থেকে বেরিয়েছি কাল দুপুররাতে। ওই যে বললাম, তিন চার ঘণ্টা হেঁটে নদীতীর, তবে লঞ্চঘাট।
তুমি কি কথা একটু বেশি বল?
রতন খুবই লজ্জা পেল। জ্বি না সাহেব। আপনে জিজ্ঞেস করলেন তাই বললাম।
