বুলবুলি বল, ল কামার বাড়ি যাই দীনু।
দীনু আনমনে বলল, ক্যা?
কামার বাড়ি গিয়া কচুর লতি তুইল্লা আনি।
পাওয়া যাইব?
যাইতে পারে।
মাইনষে তুইল্লা লইয়া যায় নাই।
বেবাক কি আর নিছে!
তারপর একটু থেমে বুলবুলি বলল, বিচরাইলে মনে অয় পাওয়া যাইব। ল।
দীনু ক্লান্ত এবং বিরক্তির গলায় বলল, আমার হাঁটতে ভাল্লাগে না।
ভাইটিকে বুলবুলি তারপর বেশ একটা লোভ দেখাল। কামার বাড়ি গয়া গাছ আছে দীনু।
ম্যালা গয়া গাছ আছে। ল যাই গয়া পাইলে দেখবি খাইতে কী আরাম!
বুলবুলির কথা শুনে দীনুর চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। হাছা?
হ।
তয় লও বুবু। তাড়াতাড়ি লও।
অল্পবয়সী অনাহারী মানুষ দুটো তারপর মাঠ ভেঙে হাঁটতে থাকে।
দীনু বলল, বুবু মায় আইব কুসুম?
বুলবুলি একবার আকাশের দিকে তাকাল। ভিক্কা কিছু পাইলেই আইয়া পড়ব।
বাজানে?
বাজানে তো টাউনে গেছে। টাউনে কামকাইজ করব, তারবাদে চাউলের বস্তা কান্দে লইয়া ফিরা আইব।
চালের কথা শুনে কী যে খুশি হয় দীনু। চোখ দুটো আবার চকচক করে তার। হাছা?
বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে বুলবুলির। ময়লা নোংরা ছেঁড়া আঁচলে ঘষে ঘষে মুখ মোছে সে। আকাশের দিকে তাকায়। রোদও ওঠেছে! বেজায় রোদ। আকাশ ঝিমঝিম করছে। রোদে। মাথার ঘিলু পর্যন্ত টলমল করে। এই রোদে মা বেরিয়েছে ভিখ মাগতে। এ গাঁ ও –গাঁ ঘুরছে দুমুঠো চালের আশায়। এক মালসা ফেনের আশায়। বাপটা ঘুরছে শহরে রাস্তায় রাস্তায় কাজ খুঁজছে।
মা বাবার কথা ভেবে কী রকম এক কষ্ট যে হয় বুলবুলির! পেটের খিদে মুহূর্তের জন্যে ভুলে থাকে সে।
দীনু বলল, এখখান কিচ্ছা কও বুবু।
বুলবুলি চমকে ওঠে। কী কমু?
কিচ্ছা। কিচ্ছা কইতে কইতে হাঁটলে পথ তাড়াতাড়ি ফুরাইব। কোন ফাঁকে কামার বাড়ি যামুগা উদিস পামু না।
কিয়ের কিচ্ছা কমু?
ধানের কিচ্ছা কও বুবু। মাছের কিচ্ছা কও।
দীনুর কথা শুনে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুলবুলি। চোখ তুলে আরেকবার তাকায়। আকাশের দিকে। সূর্যমাখা নাড়ার পারার মতো জ্বলছে। কী তেজ! শীতকালের মাঠে, তুলে নেয়া ফসলের মাঠে খড়নাড়া স্কুপ করে সন্ধেবেলা আগুন ধরিয়ে দিত কৃষাণরা, রাতভর জ্বলত সেই আগুন। রাতেরবেলা সেই আগুনের তাপে উষ্ণ হয়ে থাকত দেশ গেরাম। অঘ্রাণ মাসের বাঘা শীত টের পেত না লোকে। সূর্যের তেজখানা এখন মনে হচ্ছে তীব্র শীতের রাতে মাঠময় জ্বলা খড়নাড়া। রোধের তাপখানা খড়নাড়ার উত্তাপের মতন।
ঘামে ঘাড়গলা চুটপুট করছে বুলবুলির। আঁচলে ঘষে ঘষে আবার ঘাড়গলা মোছে সে। দীনুর মুখটাও মুছিয়ে দেয়। বড় মাতায়, বড় ভালোবাসায়।
শাড়িখানা ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে গেছে বুলবুলির। বাড়ন্ত শরীর এই শাড়িতে ঢাকা পড়ে না তবু যত্ন করে শরীরখানা ঢেকে রাখে বুলবুলি। পুরুষমানুষ দেখলে জড়োসড়ো হয়ে থাকে। মা শিখিয়েছে পুরুষজাত লোভীজাত। মেয়েমানুষের শরীর দেখলে মাথার ঘামে কুত্তা পাগল।
সামনে বিশাল একখানা মাঠ। শস্য নেই, ঘাস আগাছা নেই। মাঠের সাদা কঠিন মাটি চকচক করে। দুপুরবেলা দূর কোন প্রান্ত থেকে উড়ে আসে হু হু করা এক হাওয়া। রোদে সয়ে আসে বলে হাওয়ায় নেই শীতলতা। গা তো জুড়োয়ই না, উল্টো গরম। মাঠময় ঘুরে ঘুরে বয়ে যায় হাওয়াটি। ধুলোর চিকন একটি রেখা ওড়াউড়ি করে। দেখে কেমন আনমনা হয়ে যায় বুলবুলি। মাঠের ওপারে গাছপালায় অন্ধকার হয়ে থাকা কামার বাড়ি গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে ভাঙা দরদালান চোখে পড়ে। কামাররা এখানে কেউ নেই। পুরোনো পেশায় পেটের ভাত জোটে না দেখে গ্রাম ছেড়ে যার। যেদিকে সুবিধে চলে গেছে। বাড়িটা ছাড়া পড়ে আছে ম্যালা দিন। গাছপালা এবং আগাছায় জঙ্গল হয়ে আছে। জঙ্গলে কচুর লতি, মুখি এসব পাওয়া যায়। দেশগেরামের মানুষ সব লুটেপুটে নেয়। বুলবুলিও অনেকবার নিয়েছে। এখন আর পাওয়া যায় না। দেশে অনাহার। কচুর লতি, মুখি এ সব তো দূরের কথা, মাঠের পাশে অবহেলায় জন্মে থাকা সেচি শাকটা পর্যন্ত পাওয়া যায় না। অনাহারী মানুষ সব তুলে নিচ্ছে।
বুলবুলি জানে কামার বাড়ির ঝোপজঙ্গল তন্ন তন্ন করেও কিছু পাওয়া যাবে না। তবু যাচ্ছে, দীনুর জন্যে যাচ্ছে।
দীনুটাকে নিয়ে আর পারা যায় না। সকালবেলা মা ভিক্ষেয় বেরুতেই দীনু বলল, লও বুবু আমরাও যাই।
বুলবুলি ভিখ মাগতে যেতে পারে না। মার বারণ। বুলবুলির যে বয়স যে শরীর, ভিখ মাগতে গেলে বিপদে পড়বে। লোকে দুচার মুঠো চাল কিংবা আধলিটা সিকিটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঘরে নিয়ে দরজা আটকাবে। পুরুষজাত লোভীজাত।
মার মুখে পুরুষমানুষের এই স্বভাবের কথা শুনে বুলবুলি খুব ভয় পেয়েছে। বুকের ভেতরটা কেঁপেছে তার। না খেয়ে মরে গেলেও ভিখ মাগতে যাবে না বুলবুলি।
কিন্তু দীনু এসব বোঝে না তার এসব বোঝার কথা নয়। এই বয়সী বালক মেয়েমানুষের শরীরের জন্যে পুরুষমানুষের লোভের কী বুঝবে!
সকালবেলা দীনু বলেছে, লও বুবু আমরাও যাই।
শুনে ম্লান মুখে হেসেছে বুলবুলি। কই?
খরাত করতে।
মাইনষে পোলাপানগো খরাত দেয় না।
ক্যা?
কী জানি।
শুনে চুপ করে গেছে দীনু। মুখে ভারি দুঃখের একটা ছায়া পড়েছে তার।
তারপরই দীনুকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে বুলবুলি। বেরিয়ে গ্রামের এদিকওদিক হেঁটে সময় কাটিয়েছে। তারপর দুপুরে মুখে মুখে এসে দাঁড়িয়েছে মাঠের কিনারায়। দীনু বলল, কও না বুবু।
