সোনার লাহান, গেণ্ডাফুলের পাপড়ির লাহান।
ঘেরান অল না?
অয় না আবার! সাই ঘেরাই অয়। কাতি আগন মাসে ধান পাকলে ঘেরানে দেশ গেরাম ভইরা যায়। রম রম করে। ধানের ঘেরানে দেশগেরামের মানুষ যায় জোয়াইরা মাছের লাহান পাগল অইয়া।
পাগল অইয়া কী করে?
দিনরাইত ধানক্ষেতে পইড়া থাকে। গান গায় আর ধান কাড়ে। গান গায় আর ধানের বোজা আইন্না বাড়ির উড়ানে হালায়। ছোড গিরস্তরা হারাদিন ধান কাইট্টা হাইঞ্জাবেলায় বোঝা বাইন্দা বাড়িতে আনে। তারবাদে বিয়াইন্না রাইতে উইট্টা হেই ধান পাড়ায়। দুইআতে দুই খান চিকন বাঁশের লাডি লইয়া, পায়ের নিচে ছোড ছোড ধানের আডি, নাইচ্চা নাইচ্চা ধান পাড়ায়। বেইল উটতে না উটতে ধান পাড়ান শেষ। আগইল ভইরা, ছালা ভাইরা হেই ধান ঘরে রাইখা আবার যায় ধানক্ষেতে। আগের দিনে ছোড গিরস্তগো ক্ষেতের ধানও একদিনে কাডা অইত না।
আর বড় গিরস্তগো?
হেগ কতা আর কইস না। পুরা মাস লাইগা যাইত হেগ ধান কাড়া শেষ হইতে। শয়ে শয়ে মাইনষে কাইট্টাও মাসের আগে শেষ করতে পারত না। আর বড় গিরস্ত বাড়ির ধান তো মাইনষে পাড়াইয়া কুলাইতে পারত না গরু দিয়া মন দেওন লাগত।
তারবাদে?
তারবাদে হেই ধান ডোলে ভইরা গিরস্তরা হুইয়া বইয়া দিন কাডাইত গান গাইত আমোদ ফূর্তি করত আর তামুক টানত।
আমাগো ধানক্ষেত আছিল না বুবু? আমাগো কুনোদিন ধান অইত না?
অইত না আবার! কত ধান যে অইত! দীনুরে তুই কিচ্ছু দেখলি না। পোড়া কপাল লইয়া পয়দা হইছচ। তর জন্মের আগে, আমি তহন তর লাহান না, তর থিকা আরও ছোড অমু, কাউন্না বিলে ম্যালা ধানের জমিন আছিল বাজানের হেই জমিন আমি কুনদিন চোকে দেহি নাই বাজানের মুকে হুনছি। বাজানরে তখন দেকতাম বিয়াইন্না রাইতে ঘুম থিকা ওডে। উইট্টা এক বাসন পান্তা লইয়া বইত। হেয় পান্তা খাইত আর মায় নাইরকলের উক্কায় তামুক সাজত পান্তা খাইয়াই এক ছিলিম তামুক খাইত বাজানে। হেরবাদে মাজায় লাল গামছাখানা বাইন্দা ঘর থনে বাইর অইত যাইত বিলে। কাউন্না বিলে। যাওনের সময় মায় কইত, বেইল থাকতে আইয়া পইড় বুলবুলির বাপ। দেরি কইর না। বাজানে কইলাম আইত না। দোফরে সোনাদিগা চাউলের ভাত রাইন্দা, কাজলি মাছের ঝোল রাইন্দা মায় বইয়া থাকত। বাজানে হেই ভাত খাইত রাইত দোফরে আয়া।
কাজলি মাছ কেমুন বুবু?
হায়রে পোড়া কপাল। কাজলি মাছ তুই দেহচ নাই দীনু?
না বুবু।
কাজলি মাছ দেখতে পাবদা মাছের লাহান। তয় পাবদা মাছের লাহান বড় না চেপটা না। আরো ছোড আরো চিকন ফকফইক্কা সাদা। খাইতে বহুত স্বাদ! একখান মাছ দিয়া দুই বাসন ভাত খাইতে পারবি তুই।
এই কথা বলে বুলবুলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে বুলবুলির চোখের ওপর ভেসে উঠল বাসন ভর্তি সাদা মুক্তোদানার মতো ফুরফুরে ভাত। বাটিভর্তি কাজলি মাছের ঝোল। রান্নাঘরে বসে বুলবুলি আর দীনু গাপুসগুপুস করে ভাত খাচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখতে দেখতে বুকের ভেতর কেমন হাহাকার করে ওঠল বুলবুলির। কতকাল অমন বাসনভর্তি ভাত দেখে না তারা! পেটপুরে ভাত খায় না! পেটপুরে ভাত খাওয়ার যে কী স্বাদ দীনু তা কোনওদিন জানলই না! জন্মে তো ধানের ক্ষেতই দেখল না। পাকা ধানের রং কেমন হয় জানলই না। অথচ দীনুর সাত আট বছর আগে জন্মে কত কী দেখেছে বুলবুলি! সুখের দিন ছিল তখন। বছরভর গোলা ভরা ধান থাকত বুলবুলিদের ঘরে। ঘরের কোণে বিশাল মটকা ভরা থাকত মণকে মণ সরু লালচে চাল। গোয়ালে ছিল দুধের গাই। ভোরবেলা দুধ দোয়ালে কাঁচা দুধের মিঠেল গন্ধে ভরে যেত বাড়ি। কী ঘন, কী স্বাদের দুধ। বাড়ির সঙ্গে ছোট্ট পুকুরটি ভরা থাকত মাছে। কই, শিং, শোল, গজার, মাগুর, ফলি,রয়না, কত পদের মাছ যে ছিল পুকুরে! এক দুবার ঝাঁকি জাল ফেললেই দুবেলার মাছের বন্দোবস্ত হয়ে যেত।
তখন কার্তিক-অঘ্রাণ মাসে খুব শীত পড়ত। একদিকে শীত আরেক দিকে পাকা ধানের ম ম করা গন্ধ। ভোরবেলা সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রোদের আঁচে গিয়ে বসলে কী যে আরাম হত! কী যে সুখের দিন মনে হত একেকটি দিনকে!
সেই সুখের দিন কি আর কখনও ফিরে আসবে!
দীনু বলল, বুবু খিদা লাগছে।
বুলবুলি একবার ভাইটির মুখের দিকে তাকাল। রোদে পোড়া ম্লান মুখে হাসল। খিদা লাগলে খিদার কথা মনে করতে অয়না মিয়াভাই।
বুবুর কথা শুনে দীনু খুবই অবাক হল। অনাহারী শীর্ণ চোখ তুলে বুলবুলির দিকে তাকাল। করুণ দুঃখী গলায় বলল, তয় কি করতে হয়?
বুলবুলির বুকের ভেতরটা আবার হু হু করে তার পেটেও তো খিদে। কেঁচোর দলার ওপর তীব্র রোদ পড়লে কেঁচোরা যেমন আকুলি-বিকুলি করে, বুলবুলির পেটের ভেতর নাড়িভুড়ি তেমন করছে। তীব্র রোদের মতো রাক্ষুসে এক খিদে ঢুকে আছে পেটের ভেতর। এই খিদে তাড়াবার উপায় বুলবুলির নেই।
দীনুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুলবুলি বলল, খিদা লাগলে খালি অন্য কথা মনে করতে অয়।
শুনে দীনু বলল বুলবুলির মুখের দিকে তাকায় না, কথাও বলে না। ক্লান্ত পা ফেলে ফেলে দুঃখী ভঙ্গিতে হাঁটে।
মাঠময় এখন মেহেদি রঙের রোদ পড়ে আছে। শস্যহীন খাঁ খাঁ বিষণ্ণ মাঠ। তীব্র খরায় শস্যচারা ঘাস, আগাছা পুড়ে বিবর্ণ হলুদ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নিশ্চিহ্ন। ঠনঠনে সাদা মাটি উজবুকের মতো পড়ে আছে। পাকা ধানের রং এবারও চোখে দেখবে না দেশ গেরামের মানুষ।
