কথাটা ভেবে হেসে ফেলে উমাচরণ। ঈশ্বরের পৃথিবীতে কত কিসিমের মানুষ যে আছে! ছেলেবেলায় দেখ একটা স্বপ্নের কথা মনে পড়ে উমাচরণের। তার বাবা প্রথম জীবনে। বাড়ি থেকে পালিয়ে জাহাজে চাকরি নিয়েছিল। খালাসির চাকরি। তখন বৃটিশদের। রাজত্ব। তাদেরই জাহাজ। নামটা আজও স্পষ্ট মনে আছে উমাচরণ্রর। জনার্দন। উমাচরণ ছেলেবেলায় সেই জাহাজের গল্প শুনত বাবার কাছে। কত দ্বীপ দ্বীপান্তরে ঘুরেছে বাবা তার গল্প। সেই গল্প শুনতে শুনতে উমাচরণ রোজ রাতেই দ্বীপ দ্বীপান্তরের স্বপ্ন দেখত তখন। কখনও দেখত একটা অতিকায় জাহাজ আর ধু ধু নীল সমুদ্র। অগাধ জলরাশি বুকে ধরে পড়ে আছে সমুদ্র। দূরে আকশ নেমে এসেছে সমুদ্রে। জাহাজটা সেই আকাশসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ছেলেবেলায় স্বপ্নটা শুধুমাত্র স্বপ্নই ছিল। কোনও অর্থ ছিল না স্বপ্নের। এই শেষ বয়েসে এখন সেই স্বপ্নটির কথা মনে হলে কখনও কখনও ভীষণভাবে চমকে ওঠে উমাচরণ। স্বপ্নটা বড় অর্থময় হয়ে যায় আজকাল। মনে হয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কোথায় যেন স্বপ্নটার বড় মিল!
সন্ধ্যের দিকে বাজারটা আবার জমে ওঠে। সার্কাস পার্টিটার জন্যে। পার্টিটা চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। উমাচরণ শুনেছে দুচার দিনের মধ্যেই ওঠে যাবে। এজন্যে ভিড়ভাট্টা একটু বেশি। সন্ধ্যেবেলা হ্যাজাকের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে বটতলা। মাইকে গান বাজনা হয়, কখনও মোটা গলায় হয় ঘোষণা। ঘরে বসে বয়রা হয়ে আসছে। এই রকম কানে সেই বিশাল শব্দকে ক্ষীণ করে শোনে উমাচরণ। তার ভাল্লাগে না। একাকী বিড়বিড় করে মানুষটা। কী যে বলে নিজেই শুনতে পায় না। তবু বলে। বয়েস হয়ে গেলে কত রকমের উপসর্গ যে দেখা দেয় মানুষের!
ঘরের ছাইছে একটা তুলসী গাছ আছে। সেখানে মাটির ধূপতিতে সন্ধ্যেবেলা ধূপ দেয় উমাচরণ। আর বিড়বিড় করে কমলকে ডাকে, কমল, কমললতা, আমার। আর ভাল্লাগে না গো। আমার আর বাঁইচা থাকতে ভাল্লাগে না। তুমি আমারে নিয়া যাও।
ঘরে এসেও সেই একই ব্যাপার। খালি গায়ে ঘনায়মান অন্ধকারে কিছুই ঠাওর পায় না উমাচরণ। খুঁজে পেতে কুপি জ্বালায়। গাছার [কুপিদানি] ওপর সেই ম্লান কুপি জ্বালিয়ে রেখে কষ্টেশিষ্টে হাত পা ধোয়। তারপর ক্লান্ত হয়ে চৌকির ওপর বসে থাকে।
এই চৌকিতে ডাক্তারবাবু শুতেন। এখন উমাচরণ শোয়। বাবুর এই একটা জিনিসই ব্যবহার করে সে। না করে উপায় নেই। পাটাতনে শুলে ফাঁকফোকর দিয়ে শীত ওঠে। বুড়ো শরীরে ঠান্ডা সহ্য হয় না। বুকে বসে যায়।
কুপির আলোয় ঘরের ভেতর ভৌতিক ছায়া নড়াচড়া করে। বটতলায় লোকজনের হল্লা, মাইকে গানবাজনার শব্দ, উমাচরণের কানে যাবতীয় শব্দই ক্ষীণ হয়ে যায়। চৌকিতে বসে ডাক্তারবাবুর কথা ভাবে সে, কমললতার কথা ভাবে। তার একটা মেয়ে ছিল, গৌরী, চার বছর বয়সে পরীর মতন মেয়েটি বাবুদের দিঘিতে ডুবে মরল। সেই শোক সামলাতে না সামলাতে কমলও গেলে। আজ কত বছর উমাচরণ বড় একলা হয়ে আছে। উমাচরণের এখন কেউ নেই। এসব ভাবলে কান্না পায়। ছানিপড়া চোখে জল আসে। বেঁচে থাকতে ভাল্লাগে না।
তবু কী যেন এক আশায় আছে উমাচরণ। দোকানের সব ওষুধপত্র বিক্রি হয়ে গেছে। ছয়শো তিরিশ টাকা জমেছে হাতে। আর কিছু খুচরো। আলমারি দুটো আর অন্যান্য আসবাব ফাঁক বুঝে বেচে দিলেই খারিজ। একদিন ভোর ভোর মাওয়ার ঘাটে গিয়ে লঞ্চে চড়বে। তারপর কলকাতা।
তখন মন আবার আস্তেধীরে ভালো হয়ে যায় উমাচরণের। ছেলেবেলার সেই জাহাজের স্বপ্নটা দেখে জেগে জেগে। একটা অতিকায় জাহাজ আর নীল ধু ধু সমুদ্র। অগাধ জলরাশি বুকে ধরে পড়ে আছে। দূরে আকাশ এসে নেমেছে সমুদ্রে। সেই কেন্দ্রবিন্দুর দিকে নিঃশব্দে এগুচ্ছে জাহাজ।
তারপর সেই ভর সন্ধ্যেবেলাই উমাচরণ ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ করে দেয়। মানুষ আর মানুষ নেই। শুয়োর হয়ে গেছে সব। চোর হ্যাঁচরে ভরে গেছে দেশ। উমচরণ ভয়ে ভয়ে থাকে। দরজা-জানালা বন্ধ করে নিঃশব্দে চৌকির তলা থেকে টিনের বাক্সটা বের করে। কোমরের কাছে ধুতির ভেতর থেকে সুতোয় বাঁধা চাবি বের করে। বাক্সটা খোলে। তালা খুলতে একটু কষ্ট হয়, সময় লাগে। তবু বড় যত্নে তালাটা খোলে উমাচরণ। বাক্সের ভেতর থেকে আবদ্ধ বাতাস ন্যাপথলিনের গন্ধ নিয়ে লাফিয়ে ওঠে। ডাক্তারবাবুর কিছু পুরনো ধুতি পাঞ্জাবি ভঁই করে রাখা বাক্সে। এসবের তলা থেকে হাতড়ে হাতড়ে একটা ওষুধের কৌটো বের করে উমাচরণ। তারপর অকারণেই ঘরের ভেতরটা দেখে নেয়। চোখ চলে না, তবু দেখে। কাজটা যে সে করছে কেউ দেখছে। কিনা। পায়ের কাছ দিয়ে বাইত্তা দৌড়ে যায়। গলা চড়িয়ে ধুর ধুর করে উমাচরণ। পাটাতনে শব্দ করে। তারপর কৌটোটা খুলে জিভে আঙুল ভিজিয়ে অনেকক্ষণ ধরে টাকাটা গুণে দেখে। ঠিকঠাকই থাকে সব। তবু রোজ একবার করে গুণে দেখে উমাচরণ। কেন যেন মনে হয়, একদিন দেখবে বাক্সটার তালা ভাঙা, ভেতরের জিনিসপত্র ওলটপালট হয়ে আছে, টাকার কৌটোটা নেই।
উমাচরণ ভয়ে ভয়ে থাকে। কে জানে কখন কী অঘটন ঘটবে! কাল রাতে কমলকে স্বপ্নে দেখেছে। বৃষ্টির জলের ঝাপটায় ঘর ভিজে যাচ্ছে, বাইরে থেকে দরজাটা টেনে বন্ধ করতে চাইছে কমললতা, পারছে না। দুপুরবেলা খালপাড়ে স্নান করতে গিয়ে বনগোটাগাছের তলায় ছানিপরা চোখেও সাপের খোলস পড়ে থাকতে দেখল। হাওয়ায় এদিক ওদিক উড়ছে। এসবই অশুভ চিহ্ন। বড় ভয় করে উমাচরণের। অনুক্ষণ মন্ত্র পড়ার মতো বিড়বিড় করে বিপদ তাড়ায় সে, আলায় বালায় [বিপদ আপদ] দূর হ, দূর হ।
নিরন্নের কাল
পাকা ধানে রং কেমুন অয় বুবু?
