উমাচরণের সব মনে আছে।
রুহিতনের তখন দশ এগার বছর বয়েস। কোত্থেকে যে কাজিরপাগলা বাজারে এসে জুটল কে জানে! গায়ে ছেঁড়াখোঁড়া ন্যাকরা জড়ান, দুর্গন্ধ ময়লা, এটোকাটা খায়। রাতেরবেলা বাজারের গলিঘুচিতে পড়ে থাকে। উমাচরণের তখন মধ্য বয়স। ডাক্তার বাবুর মাথায় সাদা টাক মাত্র পড়তে শুরু করেছে।
রুহিতন সারা বাজর ঘুরে বেড়ায়, উমাচরণ দেখে। এঁটোকাটা খায়, দেখে। সময়ে একআধটা পয়সাও দিয়েছে সে। বাসিপচা খাবারও দিয়েছে। মেয়েটির চেহারায় কী যেন একটা ছিল। উমাচরণ খেয়াল করে দেখেছে, বড় সরলতা মাখা মুখ। বোকাসোকা। ড্যাবড্যাবা চোখে তাকালে মায়া হয়।
একদিন খুব সকাল সকাল ঘুম ভেঙেছে উমাচরণের। তখন কানে ভাল শুনতে পায় সে, চোখও চলে টর্চ লাইটের মতো। ঘুমের ভেতর উমাচরণের মনে হয়েছিল ছাইছে ঘিরের পেছনে বসে কে যেন গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে। প্রথমে উমাচরণ ভেবেছে কানের ভুল কিংবা স্বপ্নের ভেতর হচ্ছে শব্দটা। পরে স্পষ্ট হয়েছে। উমাচরণ বাইরে এসে দেখে ঘরের পিছনে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে রুহিতন। সারারাত ঘুমোয়নি বোঝা যায়। চোখমুখ বসা। হাঁটুতে মাথা গুঁজে মিহি সুরে কাঁদছে।
উমাচরণ কাছে গিয়ে এক ধমক লাগিয়েছে, এই ছেমরি কান্দস ক্যা?
রুহিতন কথা বলে না, কাঁদে। কেঁদেই চলে।
উমাচরণ তারপর আর রেগে গেছে। ঘরের ভেতর ডাক্তারবাবু ঘুমোচ্ছেন। জেগে গেলে রাগ করবেন।
উমাচরণ মেয়েটির হাত ধরে টেনে তুলেছে। আঐলে [ আড়ালে ] যা। বাবু জাগলে মুক্তি [ এক ধরনের কিল ] দেবে।
.
কিন্তু মেয়েটিকে টেনে তুলেই অবাক হয়েছে উমাচরণ। নিম্নাঙ্গে চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে আছে। দুএক ফোঁটা তাজা রক্তও দেখতে পায় উমাচরণ। প্রথমে ভাবে মেয়েটি বুঝি ঋতুমতি হয়েছে।
কিন্তু ওসব হলে কান্নার কী আছে!
চকিতে অন্য একটা ব্যাপার তারপর মনে হয়েছে উমাচরণের। মনে হয়ে শিউরে উঠেছে সে। নিচু গলায় রুহিতনকে তারপর জিজ্ঞেস করেছে, কী হইছে ক আমারে? সহজে কথা বলেনি রুহিতন। উমাচরণ জোরাজুরি করায় অনেকক্ষণ পর কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, রাইতে কেডা জানি আমারে….।
বাকি কথা উমাচরণ বুঝে নিয়েছিল। বুঝে ঘৃণায় দুঃখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। তারপর গোপনে চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলেছিল রুহিতনকে।
কিন্তু সারিয়ে তুলেই বা কী হবে। রুহিতন ততদিনে নিজের শরীর চিনে গেছে। তার ওপর বাজারের দামড়াগুলো আধলিটা সিকিটা ধরিয়ে দেয়।
রুহিতন বেশ্যা হয়ে গেল।
ওদিকে উমাচরণের বড় মায়া পড়ে গেল মেয়েটির ওপর। সময়ে অসময়ে রুহিতন তারপর থেকে উমাচরণের কাছে আসে। বাবাজী বলে ডাকে। আর ঐ ডাকে কিযে মায়া, উমাচরণ মেয়েটিকে নিজের বাইরে ভাবতে পারে না। হোক না বেশ্যা, মানুষতো!
তার আর কমলের মেয়েটি বেঁচে থাকলে তো রুহিতনের বয়সীই হত!
আবার কমললতার কথা মনে হয় উমাচরণের। মেয়েটির কথা মনে হয়।
উমাচরণ আনমনা হয়ে গেছে দেখে রুহিতন ডাকে, বাবাজী।
উমাচরণ চমকে ওঠে। নারকেলের কাটা শব্দ করে গড়িয়ে পড়তে চায়। রুহিতন খপ করে ধরে ফেলে। তারপর কাটা হাতে নিয়ে যেন নিজের ঘর এরকম অবলীলায় উমাচরণে ঘরের ভেতরে চলে যায়। সযত্নে জায়গামতো রেখে ফিরে আসে।
রুহিতন এসে আগের জায়গায় বসার পর উমাচরণ একটু গলা খাঁকারি দেয়। তারপর বলে, মাইনষেরে অত একিন [ বিশ্বাস করুন ভালো না রুহি। এহেনে আছচ দশজনে। তরে চিনে, কিছু হইলে হগলেই দেখব। পরদেশে নিয়া মানুষটা যুদি তরে হালাইয়া দেয়, তখন কী করবি! দেখব কেডা তরে!
রুহিতন কথা বলে না। উমাচরণ খুব জোরে জোরে কথা বলছে দেখে একটু হাসে। রুহিতনের সেই হাসি উমাচরণ খেয়াল করে না। বলে, মহারাজা তো মানুষ খারাপ না। বাইরে থিকা তো ভালই দেখা যায়। তয় কওন যায় না কার ভিতরে কী আছে।
আবার একটু থামে উমাচরণ। তারপর বলে, তুইই বুইজ্জা দেক রুহি। যা ভাল মনে হয় কর।
রুহিতন তবু কথা বলে না। খানিক বসে থাকে তারপর ওঠে চলে যায়। ছানিপড়া চোখে উমাচরণ দেখে স্বপ্নের মতন কুয়াশার ভেতর রুহিতনের ছায়া মিলিয়ে যাচ্ছে। দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে উমাচরণের।
রুহিতনও এখান থেকে চলে যেতে চায়! মহারাজার সঙ্গে! মহারাজা সার্কাসের জোকার। কেমন মানুষ কে জানে। একদিন উমাচরণ জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি হিন্দু না মুসলমান? মহারাজা বলেছে, জানি না।
মা বাপের বুঝি ঠিক নেই। রুহিতনেরও তাই। দুজনে মিলত ভালই, কিন্তু সব জেনেশুনে একটি বেশ্যা মেয়েকে যে বিয়ে করতে চায়, তার ভেতর নিশ্চয়ই কোনও চালাকি আছে। বিদেশ বিভুয়ে নিয়ে ব্যবসা করাবে মেয়েটিকে দিয়ে। তারপর বয়েস হয়ে গেলে, মূল্যহীন হয়ে গেলে, খেদিয়ে দেবে।
এসব ভেবে কষ্ট হয় উমাচরণের। রুহিতন তার চোখর ওপর বড় হল। বেশ্যাগিরি করে বেঁচেবর্তে আছে ভালো মতোই। দেশ গেরামের ব্যাপার, এভাবেই চলে যেতে পারবে। কষ্ট হবে না। ভগবান বড় সদয় রুহিতনের ওপর। পেটটা বাঁজা করে দিয়েছে। বেঁচে থাকতে ঝামেলা নেই রুহিতনের।
রুহিতনকে দুতিনবার বাজার থেকে তাড়িয়ে দেবার চেষ্টা হয়েছে। গ্রামের মাথা মাথা লোকগুলোও ওঠে পড়ে লেগেছিল মেয়েটির পেছনে। ওঠতি বয়েসী পোলাপান সব নাকি খারাপ হয়ে যাচ্ছে রুহিতনের জন্য। উমাচরণ প্রায় হাতে পায়ে ধরে ঠেকিয়েছিল লোকগুলোকে। তখন রুহিতনকে দেখলেই তার নিজের মেয়ে গৌরীর কথা মনে পড়ত। কিন্তু রুহিতনটা বোকার হদ্দ। নইলে এতদিনে বিস্তর পয়সা করতে পারত। ভদ্রানতিও আছে ছেমড়ির! হাতে পয়সা থাকলে লাখ টাকায়ও খদ্দের নেবে না ঘরে।
