রতনা গোয়াইলা কইলো। ঢাকা গেছিলো দুদ সাপলাই দিতে। হুইনা আইছে।
বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে আমার। ভগবান জানে কী হইবো! সাবধানে থাইকো ছিরিপদ।
হ। ডরডা তো আমাগঐ। আপনের কী কত্তা! আপনে কইলকাত্তা যানগা। আমাগ নাইলে যাওনের জাগা নাই, আপনের তো আছে! যান গা।
একথার পর কী বলব! আনমনে বাইরে তাকিয়ে থাকি। বুকটা কাঁপে। শেষ বয়সে মানুষের হাতে মরব! ভগবান, কী যে শুরু হল দেশে!
দুপুরবেলা খালে স্নান করতে গিয়ে বনগোটা গাছের তলায় বাতাসে কী একটা উড়তে দেখি। লম্বা দড়ির মতো, শাদা। বাতাসে একবার এদিক যায়, একবার ওদিক। ছোটখাটো জিনিস হলে চোখে পড়ত না। অনেকক্ষণ খেয়াল করে বুঝতে পারি, সাপের খোলস। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। এসবই অশুভ চিহ্ন। মন খারাপ হয়ে যায়। কাছে কোথাও একটা সাপ আছে। শীতকাল চলে গেল, এখন গর্ত থেকে বেরুবে। আর যে রকম জঙ্গুলে জায়গা, সাপ তো থাকবেই!
ভয়ে ভয়ে স্নান সেরে আসি।
খালে জল কমে গেছে। কোমর সমানও হয় না। ফাগুন মাসেই খরা শুরু হয়েছে এবার। ধানিমাঠ বুঝি শুকিয়ে ফুটিফাটা। খালে পাম্পমেশিন লাগিয়েছে লোকে, দোন। লাগিয়েছে। সব জল এখন ওঠে যাচ্ছে বোরোধানের মাঠে। কষ্টে কষ্টে স্নান করতে হয়। উঠে কাপড় ছাড়তে ছাড়তে ঘোলা চোখে চারদিকটা দেখি। বাঁদিকে ভাঙা দরদালান আছে। গাছপালার চাপে চোখে পড়ে না কিংবা আমি দেখতেই পাই না। ওই দরদালানেই নাকি ঘর বেঁধেছে রুহিতন। মেয়েটার কথা ভেবে আর একবার বুকের অনেক ভেতরে মৃদু কাঁপন টের পাই। সাপখোপের ভয় নেই রুহিতনের!
স্নান সেরে ফিরে আসতে আসতে আর একবার সাপের খোলসটা দেখ। বনগোটা গারছের তলায় উদাস হয়ে পড়ে আছে। এখন একটু একটু বাতাসও আছে। ভেজা। শরীরে টের পাই দখিন থেকে বইছে। বাতাসে খোলসটা নড়াচড়া করে, ফরফর শব্দ করে। স্পষ্ট দেখতে পাই না, শুনতে পাই না। আমার বুঝি দিন ফুরিয়ে এল। গুছিয়ে গাছিয়ে কর্তার কাছে চলে যাওয়া বুঝি আর হল না।
খেতে বসে ডাক্তারবাবুর কথা মনে হয়। কলকাতায় এখন বেদম সুখে আছেন মানুষটা। চিঠিপত্রও লেখেন না আজকাল। প্রথম প্রথম লিখতেন। কত কথা যে লিখতেন! দিনে দিনে সিই চিঠি কমে এখন প্রায় বন্ধের মুখে। আগে বাবুর চিঠির অপেক্ষায় থাকতাম। সেই অপেক্ষা শষ হয়ে গেছে। আজকাল মনে হয়, ডাক্তারবাবুর পুরো ব্যাপারটাই ছিল লোক দেখানো। ছেলেদের চিঠি পেয়ে গালাগাল দেয়া, দেশ ছাড়ার কথা উঠলে রেগে যাওয়া, এমনকি চলে যাওয়ার সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে মেয়েমানুষের মতো কান্না, সবই। এখন মনে হয় মানুষটা বোধহয় জেনে গিয়েছিলেন এদেশে থাকা যাবে না, কিংবা এটা পরদেশ। কষ্টেসিষ্টে চেপে থেকে যা-কিছু হাতিয়ে নেওয়া যায় তাই লাভ।
তবু দোকানটার কোনও বিধিব্যবস্থা করে যেতে পারেননি। পারলে বুঝি বেচে দিয়ে যেতেন। না পেরে আমার জন্য রেখে গেলেন। কিন্তু মানুষটা বোধহয় জানতেন আমি সারা জীবনেও দোকানটার কোনও ব্যবস্থা করতে পারব না। গুছিয়ে গাছিয়ে চলে যাওয়া কোনও দিনও হবে না আমার। ডাক্তার মানুষ তো, শেষ জীবনে বুঝি শরীরের রোগের সঙ্গে সঙ্গে মনুষের মনের রোগ, সরলতা জটিলতাও ধরতে শিখে গিয়েছিলেন। এসব ভাবলে জলে চোখ ভরে আসে আমার। সংসারে কেউ কারও নায়। মানুষ আসলে একা।
.
ছেলেবেলায় এক উদাস বাউল একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে যেত, গাওয়ালেতে আইলারে মন। গানটার সঠিক অর্থ সেই বয়সে বুঝতে পারত না উমাচরণ। এই শেষ বয়েসে আজকাল একাকী নির্জনে মাঝেমধ্যে সুদূর শৈশবের সেই বাউল তার বিষণ্ণ একতারা বাজিয়ে মাথার ভেতরে গান গেয়ে যায়। গাওয়ালেতে আইলারে মন।
এখন গানের অর্থটা একটু একটু বুঝতে পারে উমাচরণ। পৃথিবীতে বাণিজ্য করতেই তো আসে মানুষ। বাণিজ্য শেষ হলে যে অচিনদেশ থেকে আসে আবার সেই অচিনদেশেই ফিরে যায়। মাঝখানে পড়ে থাকে অদ্ভুত এক মায়া। সেই মায়ার নাম জীবন।
বয়স হয়ে গেলে কি মৃত্যু ছায়ার মতো অনুসরণ করে মানুষকে! আজকাল এসব মনে হয় উমাচরণের। কাল রাতে কমলকে স্বপ্নে দেখার পর থেকে বারবারই মনে হচ্ছে, গাওয়াল বুঝি শেষ হয়ে এল তার। এবার ফিরতে হবে।
উমাচরণের ভালো লাগে না কিছু। দরজার সামনে জলচৌকিতে বসে নারকেলের হুঁকায় গুরুক গুরুক করে তামাক টানে। বাইরে রোদের দুপুর ফুরিয়ে গেছে। বাজারে। লোকজনের সাড়াশব্দ কম। দখিনা হাওয়া বইছে। এই সময় মন উদাস হয়ে যায় কেন উমাচরণের!
তখুনি এল রুহিতন। বাবাজী।
উমাচরণ নড়েচড়ে ওঠল। তামাক টানা বন্ধ করে বলল, কেডারে, রুহি?
হ।
উমাচরণ ঘোলা চোখে রুহিতনকে চেনার চেষ্টা করে। ভগবান, চক্ষু দুইডায় যে কী হইল, মানুষজনও চিনতে পানি না।
রুহিতন কথা বলল না। উমাচরণের পাশে পাটাতনের ওপর বসে পড়ল। তারপর আঁচলে আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলল, হেয় আমারে লইয়া যাইতে চায়।
কে?
জোকার মানুষটা।
কই লইয় যাইতে চায়?
হেয় যেহেনে যাইবো। কয় আমারে ঘর দিবো।
রুহিতনের কথা শুনে উমাচরণ একটু চুপ করে রইল। তারপর হুঁকা নামিয়ে রেখে বলল, তুই কি কচ, যাবিনি?
হেইডা জিগাইতেই তো আপনের কাছে আইলাম।
উমাচরণের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। রুহিতনের জন্য অদ্ভুত এক টান আছে তার। মেয়েটি বোকা। ভালোমন্দ অনেক কিছুই বোঝে না। বোঝে কেবল খাওয়াটা আর শোয়াটা। এই খাওয়া শোয়া বুঝতে গিয়েই বেশ্যা হয়ে গেল।
