ঘর ঝাট দিতে দিতে মনে হয় দূর দিয়ে কেউ যেন হেঁটে যায়। স্পষ্ট দেখতে পাই না, বুঝতে পরি, কোনও মানুষ। হয়তো রুহিতনের ঘরে রাত কাটিয়ে লোকজন জেগে ওঠার আগেই সরে পড়ছে।
আমি চোখ তুলে মানুষটাকে চেনার চেষ্ট করি। পারি না। বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে। চোখ দুটো একেবারেই গেছে।
তারপর সারাঘরে গঙ্গাজল ছিটাতে ছিটাতে মনে হয় এসময় তো কাকপক্ষি ডাকার কথা! ডাক বোধহয়। আমি শুনতে পাই না। বুকের ভেতর হাহাকার ওঠে। দিন ফুরিয়ে এল। কবে যে ডাক পড়বে!
সকালের দিকে দুএকজন বাঁধা রোগী আসে। বয়সী মানুষ সব। ওষুধপত্র নেয় আনা দুআনার। মাথা ধরার বড়ি, পেট ব্যথার বড়ি, এইসব। তাছাড়া দোকানে ওষুধপত্র বলতে গেলে নেই। খালি হয়ে গেছে। তবু রোগী আসে। আড্ডা দিতেই আসে। গল্পগাছা করে চলে যায়। নিয়মিত। মাঝেমধ্যে খুবই বিরক্ত হই। মানুষগুলো গল্প করে তো করেই যায়, ওঠতে চায় না। বেলা বাড়ে। তবু রাগ করতে পারি না। ডাক্তারবাবু বলতেন, রোগী হচ্ছে দেবতা। খারাপ ব্যবহার করিস না।
কথাটা মনের ভেতরে বাঁধা। সয়ে যাই।
সকালবেলা নুন চা খাওয়ার অভ্যেস আমার। বাবুরও ছিল। দার্জিলিং থেকে খাঁটি চা পাতা আসত। গরম জলে কয়েক রোয়া নুন মিশিয়ে, কটা পাতা মিশিয়ে গেলাস ভরে সেই চা খেতেন বাবু। পরে আমারও অভ্যেস হয়ে যায়।
রোগীরা সব ভাঙা বেঞ্চিতে বসে গল্প করতে শুরু করে আর আমি কেরোসিনের চুলোয় চায়ের জল চাপিয়ে আসি। বাড়তি থাকলে দুএকজনকে খাইয়েও দিই।
বেলা বাড়ার পর, রোগীরা চলে যাওয়ার পর, ভাত চড়িয়ে চান করতে যাই। এসে সালুন। রান্না। একটু ভাজি, একআধটু ভর্তা, এই তো খাওয়া। দিন আর যেতে চায় না। রোগীও আসে কম। ডাক্তারবাবু নেই, আমার কাছে আসবে কী! ওষুধও তো শেষ। হয়ে এল। বাবু চলে যাওয়ার পর আমি আর মাল তুলিনি ঘরে। ওষুধের আলমারি দুটো দিনকে দিন খালি হয়ে যাচ্ছে। মাল তুলে কী হবে! কদিন পর চলেই তো যাব। বাবুই বলে দিয়ে গেছেন এসব। মাল যা আছে বেইচ্চা শেষ কর। ফাঁক বুইজ্জা সামানপত্র বেচবি, তারপর সোজা কইলকাত্তা। বড় রকমের কোনও ঝুঁকি নিবি না।
আমিও সেই মতো কাজ করেছি। এখন দোকান খালি। হাতে পয়সাও জমেছে বেশ। তবু কী যেন বাকি থেকে যাচ্ছে।
কাল রাতে কমলকে স্বপ্ন দেখার পর থেকে মনটা বড় খারাপ হয়ে আছে। ডাক্তার বাবুর কথা বারবার মনে হয়েছে। কমল মারা যাওয়ার পর তিনিই তো আমার একমাত্র আপনজন ছিলেন।
সকালবেলা ওঠে ঘর ঝাঁট দিয়ে, গঙ্গাজল ছিটিয়ে শেষ করতে করতে একটু বেলা হয়ে গেছে। বাবুয়ার চায়ের দোকানে একজন দুজন খদ্দের লাগতে শুরু করেছে তখন। মতলেব রমেশরাও বোধহয় দোকান খুলে বসেছে। মাছও বোধহয় আসতে শুরু করেছে বাজারে। আনাজপাতিও। বাজারটা এবার জমবে। অনেকদিন পর নিত্যকার এই জীবন। সকাল থেকেই আমার আজ খারাপ লাগতে শুরু করে। ডাক্তারবাবুর হাতাওয়ালা চেয়ারটা মুছে রাখতে রাখতে কেন যেন জলে চোখ ভরে আসে! যেন বা ডাক্তারবাবুকেই ছুঁয়ে দিলাম এরকম মনে হয়।
বাবু চলে যাওয়ার পর চেয়ারটা আমার হয়ে গেছে। কিন্তু আমি ভুলেও কখন বসিনি। বাবু চলে গেছেন কথাটা বারবার ভুলে যাই। কখনও আনমনে খালি চেয়ারটার দিকে। তাকালে মনে হয় ডাক্তারবাবু বুঝি কলে গেছেন। এক্ষুনি ফিরে এসে চেয়ারটায় বসবেন। গলা খাকারি দিয়ে, কপালের ঘাম আঙুলে মুছে বলবেন, উমা জল খাওয়া রে! মানুষ চলে যায়, রেখে যায় হরেক রকমের চিহ্ন। সারাটা ঘর জুড়ে বাবুর কত রকমের যে চিহ্ন ছড়ান! বিছানাপত্র, কাঁসার থালা গ্লাস, বইলাঅলা খড়ম, একখানা ছেঁড়া পানজাবি, খান দুয়েক মিহি শান্তিপুরি ধুতি। এইসব দেখে আমার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।
কেরোসিনের চুলোয় চায়ের জল চাপিয়ে বসে থাকি। ওঠে আলমারির সামনের দিকটায় গিয়ে বসব ইচ্ছে করে না। চায়ের জল বলকায়, আমি উদাস চোখে পেছনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। চোখে ভালো দেখতে পাই না, তবু বাইরে যে রোদ উঠেছে বুঝতে পারি। পায়ের কাছে তুরতুর করে কী! বাইত্তা? ম্যালা ইঁদুর বাইত্তা হয়েছে ঘরটায়। চোখে ভালো দেখতে পাই না, কানেও হালকা শব্দটব্দ ঢোকে না, তবু মনে হয়। ঘরের ভেতর অবিরাম খুঁটখাট শব্দ হচ্ছে। ইঁদুরে সব কেটেকুটে বিনাশ করছে। পুবদিকের পাটাতনে বুঝি উঁই ধরেছে। দেখতে কী পাই! কাল সন্ধ্যায় গায়ে পিরপির করেছিল অসংখ্য পোকা। বুঝতে পেরেছি উঁই! ঘরের ভেতর সংগোপনে চলছে ক্ষয়কৰ্ম। কানে শুনতে পাই না, দেখতে পাই না চোখে, তবু একাগ্রতায় থাকলে মাথার ভেতর মিহিন একটা ক্ষয়ের শব্দ ধরা পড়ে।
গ্লাসে চা ঢেলে নিয়েছি, তখন বাইরে থেকে কে একজন ডাকল, ঘরে আছেননি? কর্তা? চায়ে চুমুক দিয়ে বলি, কেডা?
আমি ছিরিপদ।
আস।
শ্রীপদ ঘরে ঢোকে। তার পদভারে। পাটাতন ঘরের শিরায় মুদু একটা কাঁপন লাগে। শব্দটব্দ হয় বোধহয়। শুনতে পাই না। ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছে সব।
চা শেষ করে সামনের ঘরে আসি। খবর কি ছিরিপদ?
শ্রীপদ বসেছিল বেঞ্চে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। ফিসফিসে গলায় বলল, খবর হুনছেন নি কত্তা? রায়ট লাগবো বলে?
শুনে আপাদমস্তক কেঁপে উঠি। খানিক কিছু বুঝতে পারি না। বুকের ভেতর কেমন একটা কাঁপন লেগে থাকে। ঢোক গিলে বলি, কই হুনলা?
