তখনি দৃশ্যটা চোখে পড়ল তাদের। সেই মানুষটা এখন ওত পেতে বসে আছে ঝোপঝাড়ের আড়ালে। আর অন্য একটা মানুষ আস্তেধীরে,এগিয়ে আসছে তার দিকে। দৃশ্যটা দেখেই পাপের গন্ধ টের পেল তারা। মুহূর্তে মাথায় লাফিয়ে ওঠল রক্ত। গতি বেড়ে গেল তাদের। মুহূর্তে মানুষ দুটোর মাঝামাঝি চলে এল। তারপর দুজন দুদিকে। মুখ করে, বিশাল ফনা তুলে মানুষ দুটোর মুখোমুখি দাঁড়াল। তীব্র জ্যোৎস্নায় সাপ দুটোর কুলোর মতো ফনা শূন্যে দুলতে লাগল।
দেশভাগের পর
কালরাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছি। নিরেট অন্ধকারে কোথায় কোনও এক ঘরে শুয়ে আছি। বাইরে নিঝুম বৃষ্টি। কতকাল ধরে যে এরকম বৃষ্টি হচ্ছে কে জানে! বৃষ্টির তোড়ে হঠাৎই ঘরের একটা দরজা খুলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিভেজা হাওয়ায় দমবন্ধ ভাবটা কাটে আমার। বৃষ্টির ঝাপটায় ঘর ভিজে যাচ্ছে দেখতে পাই। বুক ভরে শ্বাস টানি। ওঠে দরোজাটা, যে বন্ধ করব শক্তি পাই না। বৃষ্টিজলে ঘর ভিজে যায় আর আমি অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখি। তখন কে একজন, ধপধপে সাদা থান পরা, মাথায় ঘোমটা, বাইরে থেকে দরজাটা টেনে বন্ধ করতে চায়। পারে না। বৃষ্টির ভেতর আবছা সেই নারীমূর্তি, কে, এত কষ্ট করেও আমার ঘরের দরজা বন্ধ করতে চাইছে।
স্বপ্নের ভেতরই অবাক হই। খেয়াল করে সেই নারীমূর্তি চেনার চেষ্টা করি। একটু যেন চেনা চেনা মুখটা। কে? দুতিনবার চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করি। জবাব আসে না। উঠে দরোজার কাছে গিয়ে দেখি বৃষ্টিতে সাদা থান পরে, মাথায় ঘোমটা, কমললতা দাঁড়িয়ে। আমাকে ওঠে আসতে দেখেই করুণ, বিষণ্ণ ভঙ্গিতে বৃষ্টির অভ্যন্তরে মিলিয়ে যায়। আমি পেছন থেকে চিৎকার করে ডাকি, কমল, কমললতা। সে শোনে না। মিলিয়ে যায়।
ঘুম ভেঙে আমি তারপর অনেকক্ষণ কিছু ভাবতে পারিনি। ঘুমিয়ে আছি না জেগে, বুঝতেই অনেকটা সময় কেটে যায়।
বয়েস হলে কী এরকম হয়! মত্যু ঘনিয়ে এলে কী এরকম হয়! কালরাতে কমলকে স্বপ্ন দেখার পরপরই ঘুম ভেঙে গেছে। জেগেও অনেকক্ষণ ধরে তারপর কমলকেই দেখেছি। স্বপ্নের মতো জাগরণেও কমল বারবার আমার চোখের ওপর দিয়ে, শাদা থান পরে, মাথায় ঘোমটা করুণ, বিষণ্ণ ভঙ্গিতে হেঁটে গেছে। বৃষ্টি হচ্ছিল, বৃষ্টিজলের ঝাপটায় ঘর ভিজে যাচ্ছিল। কমল বাইরে দাঁড়িয়ে দরজাটা বারবার টেনে বন্ধ করতে চাইছিল। কী অর্থ এসবের! বুঝতে পারি না কিছু। তবে স্বপ্ন দেখার পর থেকে কমলকে আর ভুলতে পারছি না। কমল আমার চোখ থেকে আর সরে না। কতদিন পর যে স্বপ্ন দেখলাম কমলকে!
বাকি রাতটা আর ঘুমোতে পারিনি। এমনিতেই ভালো ঘুম আজকাল হয় না। রাতেরবেলা হাঁসফাঁস করি, এপাশ ওপাশ করি, ওঠে জল খাই। ঘুম কী আসে! আগে ঘুম না এলে কুপি জ্বালিয়ে রামায়ণ পড়তাম। টুকটাক কাজও করেছি অনেক রাত জেগে। কখনও ওষুধের আলমারি খুলে গোছগাছ করেছি, চেয়ার টেবিল ঝেড়েমুছে রেখেছি। বহুকাল এসব আর করা হয় না। চোখে ভালো দেখতে পাই না। কানেও শুনি কম। রাতেরবেলা তাই বড় বেশি অসহায় লাগে। নিঝুম হয়ে পড়ে থাকি। অন্ধকার ডাক্তারখানায় শুয়ে নিজের ভেতরের কত ছবি যে দেখতে পাই, কত কথা যে শুনতে পাই! বেঁচে থাকতে ভাল্লাগে না। কতকাল ধরে যে এইরকম একলা হয়ে আছি! এভাবে জীবন কাটে মানুষের, নির্বান্ধব অবস্থায়!
ডাক্তারবাবু চলে গেলেন সেও এক বছর। কথা ছিল গুছিয়ে গাছিয়ে আমিও চলে যাব। একটা বছর কেটে গেল, কিছুই গোছান হয়নি। আজকাল মনে হয় একটা বছর কী একটা পুরো জীবনেও বুঝি গোছান হবে না আমার। চতুর সময় কেবল পিছলে যাবে।
ডাক্তারবাবু বলেছিলেন দোকানটা বিক্রি করে দেবেন। দিয়ে একবারেই নমস্কার। আমি হতে দিইনি। এত পাষাণ হই কী করে! বললাম, আপনে যান গিয়া কর্তা। আমি আর কয়দিন থাইকা আসি। আমি গরিব মানুষ, আমারে মারব কেডা? ভগবান আছেন। তিনিই দেখবেন। আমার কথা শুনে মানুষটা খুব কাঁদলেন। যেতে কী চান! সারাজীবন যে মাটিতে কাটালেন তাকে ছেড়ে যেতে চায় কে!
কিন্তু না গিয়েই বা উপায় কী! দেশ কি আর দেশ আছে! মানুষ কি আর মানুষ আছে! গত বছরই তো বর্ষাকালে মনীন্দ্র খুন হল। বাবু তো ভয়ে মরেন। একদিন চুপি চুপি। বললেন, উমা রে আর বুঝি থাকন গেল না। মোল্ল সতরডা বচ্ছর তো কাডাইলাম। শেষকালে কি মাইনষের হাতে মরুম! শেষকালে নি খুন হইয়া যামু!
আমি বললাম, কাম নাই কর্তা। চইলা যান। এখনে থাইকা কষ্টই বা করবেন ক্যা? শেষ। বয়েসে একটু আরাম করেন গা। মাইয়ারা আছে, বউমারা আছে তারা যত্নআদি করবো। যান গা।
বাবু অনেকক্ষণ কথা বলেননি। থম ধরে রইলেন। তারপর চারদিকে একবার তাকিয়ে বললেন, বড় মায়া হয়রে। এই মাডি মানুষ ছাইড়া যামু!
বাবুর চেহারা তখন বিবেকানন্দের মতো ভারী দেখাচ্ছিল। দেখে চোখ ছলছল করে আমার। আমি কিছু বলতে পারিনি!
এক সন্ধ্যায় তারপর মাওয়ার ঘাটে গিয়ে চুপি চুপি বাবুকে লঞ্চে চড়িয়ে দিলাম। মতলেব মুদি, গান্ধি ময়রা ওরা বারবার জিজ্ঞেস করেছে, ডাক্তারবাবু কই যাইতাছেন?
বাবু জবাব দিতে পারেননি। আমি মিথ্যে বলেছি সবার কাছে। বাবু একটু কামে ঢাকা যাইতেছেন। তিন চাইরদিন পর আইসা পরবেন।
বাঁধা রোগীদের কাছ থেকে বাবু বিদায় নিয়েছিলেন অন্যভাবে। কাকে কী বলেছেন আমি সব শুনিনি। তো যাওয়ার কদিন আগ থেকেই আমাকে বারবার করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কাকে কোন ওষুধ নিয়মিত দিতে হবে, কোন রোগের কী সাধারণ চিকিৎসা। আমি ওসবে মনোযোগ দিইনি। একটা জীবন কাটল বাবুর কম্পাউণ্ডারি করে, বুঝব না কোন রোগের কী চিকিৎসা! বাবুর কথা ভেবে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। কমল বেঁচে থাকতে কমল, সে মারা যাওয়ার পর এই জলধর ডাক্তার, আমরা দুজনে দুজনার ছায়ার মতো ছিলাম। তাই ডাক্তার বাবু চলে যাওয়ার পর আমি দ্বিতীয়বারের মত একলা হয়ে গেলাম। বাবু অবশ্য বারবার বলেছেন, এখানে থাইকা কাম নাই। তুইও ল আমার লগে। টেকা পয়সা দিয়া কী হইবো!
