নাড়ি ধোয়া পীর হুজুর গত হয়েছে তিন পুরুষ আগে। মাজারটা আছে। বর্তমান পীর হুজুর নিজে তদারক করেন। তিনি ছাড়া মাজারে অন্য কেউ যায় না। গরম মাজার। একটু গরমিল হলে গলা দিয়ে রক্ত ওঠবে। নিশ্চিত মরণ। দুনিয়ার বেবাক ডাক্তার বাইটা খাওয়ালেও বাঁচাইতে পারব না কেউ।
আর নাড়ি ধোয়া পীর হুজুরের মাজারে আছে দুখান সাপ। কী সাপ কে জানে। তেল চকচকে কালো লম্বা শরীর। যখন তখন মাজারের আশেপাশে দেখা যায় তাদের। ইট পাজার আড়ালে দেখা যায়। কারো অনিষ্ট করে না।
লোকে বলে, সাপ দুখানা নাড়ি ধোয়া পীর হুজুরের প্রিয় দুই তালবেলাম। দেহান্তরিত হয়ে সাপ হয়েছে। কারো অনিষ্ট করে না সত্য, কিন্তু চোখের সামনে, পীর হুজুরের মাজারের আশেপাশে কোন পাপ কর্ম দেখলে সহ্য করবে না। বাড়ি গিয়ে হলেও দংশাবে।
সাপ দুটোর কথা মনে হতেই গজু একটু কেঁপে ওঠল। জ্যোৎস্নারাতে আহারে বেরোন তেনারা। বাগে পেলে পাপী মানুষের জান কবচ করবেন। পীর হুজুরের প্রিয় শিষ্য। হুজুর নিজেই দেহান্তরিত করিয়ে মাজার পাহারায় রেখে গেছেন তাদের।
কথাটা মনে করে, নাড়ি ধোয়া পীরহুজুরের মাজারের বহুদূর দিয়ে তাঁতীপাড়ার দিকে পা চালায় গজু। মনে মনে পীরহুজুরের উদ্দেশে বলে, পীরহুজুর আমি মহাপাপী। ম্যালা পাপ করছি জীবনে। ম্যালা মাইনষের গলায় ছুরি ধরছি, মালসামানা ছিনাইয়া লইছি! শইল্লের জ্বালায় আর একখান পাপ কাম করতে আইছি হুজুর। আপনে তো বেবাকঐ জানেন হুজুর। শইল্লের জ্বালা বড় জ্বালা। হের লেইগাই হুজুর, আপনা পেডের পোলার পিরিতির মাইয়া ছেইলাডারে ভোগ করুম আইজ। তয় আপনেরে আমি কতা দিতাছি, নাড়ি ধোয়া পীর, হুজুর, আপনেরে আমি কতা দিতাছি, এইডাই আমার শেষ পাপ কাম। কাইলথন আমি ভালা অইয়া যামু। জীবনে আর কুন পাপ করুম না।
পারুদের বাড়ির দিকটা খুব নিঝুম হয়ে আছে। তাঁত বন্ধ করে পারুর বাপভাইরা ঘুমিয়ে পড়েছে। এটাই বেরুবার সময় পারুর। প্রায় রাতেই রতনের সঙ্গে নদীতীরের ঐ ঝোপটার আড়ালে দেখা করে সে। গজু সব খবর রাখে। আজ দুপুরে নিজ কানে শুনেছে, পারু বলেছে রাইতে যামু। তই কইলাম থাইক্কো।
গজু তখন নাইতে যাচ্ছিল করতোয়ায়। রতন-পারু কেউ দেখেনি তাকে।
তখন থেকেই শরীরটা গরম হয়ে আছে গজুর। শরীরের ভেতর হিংস্র এক জন্তু যখন তখন ছটফটানি শুরু করেছে। গজু মনে মনে বলেছে, ডাকাতি ছাইড়া দিছি ম্যালাদিন। অইলে অইব কী, আইজ শেষ ডাকাতিডা করুম আমি। পারুর সতীত্ব ডাকাতি করুম। বিকেলবেলা কায়দা করে রতনকে পাঠিয়ে দিল বাদলবাড়ি। কালু ওস্তাদের কাছে।
কালু ওস্তাদ নিজেও আজকাল কামকাজ করে না। ছেড়ে দিয়েছে। বয়েস হয়েছে তো! কিন্তু দলটা আছে। সাগরেদরা আছে। ডাকাতি করেই ওস্তাদের বখরাটা দিয়ে যায়। ওস্তাদ একা মানুষ। বিয়ে-শাদি করে নাই। বউপোলাপান নাই। অত টেকা-পয়সা তার লাগে না। গজুকে দেয় কিছু।
সেই টাকা আনতে রতনকে ওস্তাদের কাছে পাঠিয়েছে গজু। আসলে ভাঁওতা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। টাকাটা জরুরি না। হাতে যা আছে বাপপুতের মাসখানেক চলে যাবে। ব্যাপারটা কি টের পেয়েছিল রতন।
বিকেলবেলা গজু যখন বলল, ওস্তাদের কাছে যা রতন। টেকা-পয়সা লইয়া কাইল বিয়ানে আইয়া পড়িছ।
রতন জানে বাদলবাড়ি গেলে আজ রাতে ফেরার উপায় নেই অথচ পারু বলেছে—
রতন কাঁচুমাচু গলায় বলেছিল, কাইল বিয়ানে গেলে খাবি কী মামদার পো। উপাস দিবি! বুড়ো বয়সে আমারে না খাওয়াইয়া রাকবি!
রতন তারপর মন খারাপ করে চলে গেছে।
তখন থেকেই আমোদে আছে গজু। নন্দর দোকান থেকে দুপ্যাকেট বিড়ি কিনেছে। সেই বিড়ি কোমরে, ভোজালিটা কোমরে, গজু এসে বসেছে নদীতীরের ঝোপঝাড়ের আড়ালে।
বিড়ি টানতে টানতে, পারুর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে রাত একপ্রহর।
কিন্তু পারু এখন বেরুচ্ছে না কেন?
ঠিক তখনি ঘরের ঝপ খুলে একটি মেয়েমানুষ নিঃশব্দে উঠোনে নামল। জ্যোৎস্নায় দূর থেকে মেয়েমানুষটাকে চিনতে পারল গজু। পারু।
দেখে উত্তেজনায় বুকটা ফেটে যেতে চাইল গজুর।
পারু তখন নাজুক পায়ে বাড়ি থেকে নামছে। সাবধানে চারদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। জ্যোৎস্নায় স্পষ্ট দেখা যায় তাকে। শাড়ি খান পাছকোমর করে পরেছে। হাঁটছে। এত সুন্দর ভঙ্গিতে, পরীর মতো লাগে পারুকে। আর সেই দৃশ্য দেখে দমবন্ধ হয়ে আসে গজুর। শরীরের উত্তাপ বেড়ে যায়। ঝোপঝাড়ের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। মনে মনে ডাকে আয় পারু, আয়। কখন কোন ফাঁকে কোমর থেকে ভোজালিটা বের করে হাতে নিয়েছিল, গজুর খেয়াল নেই। জ্যোৎস্নায় ভোজালির ধারটা নদীর জলের মতো ঝিলিক দিচ্ছিল।
হাতের ভোজালিটা একবার তাকিয়ে দেখে গজু। দেখে বুকের ভেতরটা জীবনে প্রথমবারের মতো কেন যে একটু কেঁপে ওঠে, বুঝতে পারে না।
পারু আসছে।
ধানি মাঠে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে সাপ দুটো। আহার পায় না। ইঁদুরগুলো বেজায় চালাক। কেমন করে যে টের পেয়ে গেল সামনেই ওত পেতে আছে মৃত্যু। ঝুপঝাঁপ করে সাপ দুটোর মুখের ওপর দিয়ে পালিয়ে গেল তারা। সাপ দুটো ছোবল মারল কয়েকটাকে। ধরতে পারল না। ফলে মেজাজ তাদের তিরিক্ষি হয়ে গেল।
রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে ধানি মাঠ থেকে ফিরল তারা। ফিরে সোজা চলতে লাগল নদীতীরের ঝোপঝাড়ের দিকে।
