খানিক বাদে ফকিরকে দেখা গেল ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। দেখেই অন্ধকার ঠেলে তার কাছে এগিয়ে গেল শুকু। ফকির তীক্ষ্ণচোখে শুকুর দিকে তাকাল, কী খবর মিয়া?
ফকিরের ভাঙাচোরা বসন্তের দাগঅলা মুখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে শুকু বলল, বাবার অবস্থা ভালা না, আপনের ইট্টু যাওয়া লাগব।
ফকির একটু থেমে রইল। যেন বিশাল কোনও চিন্তাভাবনা চালাচ্ছে মাথার কোষে কোষে। তারপর ভারি গলায় বলল, ব্যবস্থা করছস?
হ মিয়াবাইরে কইয়া আইছি সব জোগাড় কইরা রাখতে।
খাড়াও, আইতাছি।
বলে ফকির আবার ঘরের ভিতর ঢোকে। লম্বা কোর্তা পরে বেরিয়ে আসতে আসতে কারো উদ্দেশ্যে বলে, মেদিনীমণ্ডল যাইতাছি। রাইতে আমুনা।
ততক্ষণে তেঁতুল গাছের ভিতর দিয়ে চাঁদ ওঠেছে। বাঁকা, ক্ষীণ চাঁদ। পাতলা জ্যোৎস্না পড়েছে আর ঝির ঝির করে একটা বাতাস দিচ্ছে। চরাচর জুড়ে আশ্চর্য মগ্নতা। দেখে শুকুর মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে যায়। ফকিরের সঙ্গে পা চালিয়ে চালিয়ে হাঁটতে শুরু করে সে।
মাঠে নেমে বিড়ি ধরায় ফকির। ফোঁস ফোঁস টানে, ধোয়া ওড়ায়। শুকু দেখে ফকিরের বিড়ির মাথায় চন্দন বিচির মতো দগদগে আগুন টানে টানে ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। আবছা জ্যোৎস্নায় ফকিরের চোয়াড়ে মুখটা অস্পষ্ট। শুধু বিড়ির টানে নাকের ডগাটা স্পষ্ট হচ্ছে।
শুকু তারপর শুধু মাঠের দিকে তাকায়। চাঁদ দেখে গ্রামের মাথার ওপর। তাদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে চাঁদ। বাতাস আছে। ঝিঁঝির ডাক আছে। এসবের ভিতর কেমন শীত শীত করে শুকুর, কেন যে!
ফকির এবার আকাশের দিকে তাকাল। লক্ষ কোটি আলোকবর্ষের ওপারে কোনও নক্ষত্রের ক্ষীণ আলো প্রত্যক্ষ করল যেন। তারপর বলল, হঠাৎই বলল, বুজলা, এই রকম চাঁদনি রাইত আছিল। বাইতে মার দয়া। খালি আমি বাদে হগলতেরই ওঠছে। দুইজন চইলা গেছে। এমুন একখান অবস্থা, কানবারও পারি না। হায় হায়রে আবার। বাঙ্গিও বুনছিলাম হেইবার। হালায় অইছিলও। বেইনের লাহান অইছিল। রাইতে ক্ষেত পাহারা দিতে অয়। চরে থনে ছিপ নাও লইয়া চোর আহে। ভাও বুঝলে নাও ভইরা বাঙ্গি লইয়া যায়। মন ভালনা। অইলে কী অইব, চকে তো না যাইয়া পারুম না। ভাত খাওন লাগবো না।
থেমে বিড়ি ধরায় ফকির। বড় করে টান দেয়। তারপর হাঁটতে হাঁটতে আবার পুরনো কথায় ফিরে যায়। রাইতে যাইতেছি খেত পাহারা দিতে। বুচছি বিয়াইনা রাইত। ফকফইক্কা জোছনা। কে জানে তখন নিশিরাইত। বাইতে অসুখ। আমার মন ভালনা, কেডা অত খ্যাল করে। যাইতে যাইতে হেই বিলের মধ্যিখানে ঠিক গোরস্তানডা বাঁয়ে রাইখ্যা দুই কদম গেছি। এমুন সময় দেহি তেনায় চলছেন। আমি হ্যাঁরে পিছে থনে দ্যাখতাছি। পাও দ্যাহা যায় না। খালি চুল। সাত আষ্ট হাত লম্বা তো অইবই। হেই চুল দিয়াই য্যান আটতাছে। আমার ডরভয় নাই। বাইতে অসুখ। তেনারে দেইক্কা মনে হইল কামেল দরবেশ অইবেন। পিছে থনে দৌড়াইয়া গিয়া প্যাচাইয়া ধরলাম। একটা ধাক্কা দিল, তিনচাইর কানি জমিনের হেইধার গিয়া পল্লাম। তয় দুখ পাইলাম না। উইট্টা আবার গিয়া দরলাম। তিনবার এইরকম আছার মারল। হ্যার বাদে মুখ গুরাইল। হায় হায়রে কী নুরানি চেহারা! য্যান পুনিমার চান। কইল, কি চাস? আমি কাইন্দা দিলাম। বাবা, আমার হগল গেছে। কইল, ঘর দুয়ার সাফসুতরা রাখিস, হাঁজের বেলায় যামু। আমি বাইতে আইয়া ঠিক কইরা রাকলাম। হাঁজের পর হেরা আইল সাতজন বুঝলা, সাতজন। কইল, ঘরে আসন দে। আর একজন নিতে আইছি।
হ্যার বাদে সব সাইরা যাইব। জিগাইলাম, বাবা আপনারা কারা? কইল জ্বিন ডাকিনি যুগিনি। আমি ডরাইয়া গ্যালাম। কইল, এমুন এমুন কইরা ডাগবি, আমু। পাইয়া গ্যালাম। বুঝলা, পাইয়া গেলাম। তয় হেই রাতেই আমার ছোড ভাইডা মইরা গেল। ওই যে কইছিল আর একজন নিমু। নিল।
শুকু চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল, ফকির থামতেই চমকে ওঠল সে। ফকির আবার বিড়ি ধরিয়েছে। ফোঁস ফোঁস করে টানছে। শুকুর কেমন ভয় ভয় করে। তবু কথা না বললে ভয়টা বেড়ে যেতে পারে ভেবে বলল, অহন কি সাতজনই আছে?
ফকির লম্বা করে বিড়ি টান দেয়। গল গল করে ধোঁয়া ছাড়ে। না চাইরজন আছে। বড় মাহাজন আহে আমাবইশ্যা রাইতে। আর তিন জন তো নাইই। আসামের এক ফকিররে দিয়া দিছি। ইস হেগো কথা আর কইয়ো না। বড় বদরাগী আছিল। ইট্টু কিছুতেই ক্ষেইপপা যাইত। বেদম মাইরধইর করত আমারে। তয় আসামের হেই ফকিরও আমারে দিছে। বাওয়াণডা বান হিগাইছে, ফিরানি হিগাইছে।
আজ যেন কথা বলার নেশা ধরে গেছে সেজাল খাঁর। চৌদ্দ পনের বছরের বয়েসী ছেলেটার কাছে তামাম জীবনটাই যেন খুলে বলবে। অথচ শুকু এসব শুনতে চায় না। তার ভয় ভয় করে। মনে অয় মানুষটা নিজেই জ্বিন! শুকু জ্বিনের গলা শুনেছে। সেজাল খাঁ আগেও অনেককবার জ্বিন নামিয়েছে তাদের ঘরে। বুড়ির জন্য। শুকু চোখ বুজে গভীর অন্ধকারে বাবার পাশে বসে থেকেছে। জ্বিনের একেক জন একেক স্বরে কথা বলে। শিকড়বাকড় ছুঁড়ে দেয়। দীর্ঘক্ষণ শ্বাস রেখে ফুঁ দেয়। এ ফুয়ে বালা মুসিবত কেটে যায়। সেই জ্বিনদের স্বরের সঙ্গে ফকিরের গলার স্বরের আশ্চর্য মিল। এসব ভেবে আজ কেমন ভয় পেয়ে যায় শুকু।
.
সেজাল খাঁকে নিয়ে শুকু যখন বাড়ি পৌঁছল তখন অপার্থিব নির্জনতা চারদিকে। বেশ খানিকটা রাত হয়েছে। আঙিনায় ওঠতেই ঘেয়ো কুকুরটা কেউ কেউ করে ছুটে এল। শুকু তীব্রস্বরে ধমক দিল কুকুরটাকে। শব্দ পেয়ে গণি বেরিয়ে এল কুপি হাতে। শুকু ঘরের ভিতর ঢুকে বদনায় করে জল নিয়ে এল। ফকিরের পায়ে সেই জল ঢেলে দিতে দিতে বলল, মিয়াবাই, সব আনছো তো?
