এখন ফাগুন মাস। ধানের চারায় সবুজতা নেমেছে। বিকেলটা কী চমৎকার ছড়ানো চারদিকে। শুকু এসব খেয়াল করে না। হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হয় মেদিনীমণ্ডল থেকে দোগাছী বহুদূর পথ। সামনে ধুধু বিস্তৃত মাঠ। কানি কানি ধানজমি, পাটজমি। পুবদিকে সড়ক সিতারামপুর হয়ে কাজিরপাগলা,তারপর গোয়ালীমান্দ্রা পর্যন্ত চলে গেছে। শুকু হাঁটতে থাকে। আজন্মের চেনা এই পথ কে যেন রাতারাতি টেনে অনেকটা লম্বা করে দিয়ে গেছে। পথ আর ফুরোয় না।
শুকুর খুব বাবার কথা মনে হচ্ছিল। বয়সকালে বিশালদেহী মানুষটা, চুলদাড়িতে কী যে সুন্দর ছিল দেখতে। মালটানা জাহাজের সারেঙ ছিল বাবা। থাকত কোলকাতায়। বছরে দুবছরে বাড়ি আসত। বর্ষাকালে টিপটিপ বৃষ্টির দিনে কেরায় নৌকায় বোঝাই মালপত্র নিয়ে বাড়ি আসত বাবা। শুকু সেই ছেলেবেলায় জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করে ফেলত, দূরের বিলে কুয়াশার মতো বৃষ্টি সরিয়ে একটা কেরায় নৌকা এগিয়ে আসছে। এক সময় সেই নৌকাটি তাদের ঘাটে এসে ভিড়ত। তার ভিতর বাবাকে মহাপুরুষের মতো বসে থাকতে দেখে বাড়ির ভেতর উৎসব শুরু হয়ে যেত। রাত অনেকটা বেড়ে গেলেও মার রান্না শেষ হত না। বাবা বাড়ি এলে কত পদের রান্না যে করত মা! বুড়ি তখন মার কোলে।
দেখতে দেখতে বিকেল ফুরিয়ে আসে। অন্তরীক্ষ থেকে অন্ধকার নামে মাঠে। ধানি জমিতে ঝিঁঝি পোকারা ডাকতে শুরু করেছে। শুকু দুএকবার দোগাছীর দিকে তাকায়। গ্রামের গাছগাছালি এখন অন্ধকারের ভেতর। আকাশের তলা দিয়ে বাদুড় উড়ছে। এসবের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুকুর কেবল বাবার কথা মনে হয়। এমন জোয়ান মর্দ মানুষটা দেখতে দেখতে কেমন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেল। শুকুদের বড় ঘরটাই আসলে দোষী। ঐ ঘরে কেউ বেশিদিন টিকবে না। বুড়িটা জন্মের পর থেকে আতুর হয়ে আছে। ন-দশ বছরের মেয়ে, না পারে কথা বলতে না পারে হাঁটতে। সারাক্ষণ চৌকির উপর কুঁজো হয়ে বসে থাকে। বুড়ির জন্মের আগে ঘরের ভেতর অলৌকিক সব দৃশ্য দেখছিল মা। বুড়ি তখন পেটে। হাজামবাড়ি থেকে কোষা-নৌকোয় করে বাড়ি আসছিল মা। সন্ধ্যা হয় হয়। বড় পুকুরটার মাঝামাঝি আসতে কালো জলের তলা থেকে গভীর বুদবুদ তুলে কী যেন একটা জিনিস কোষার তলায় এসে ধাক্কা মারল। সেই ধাক্কায় ছোট্ট কোষা-নাও কাৎ হয়ে প্রায় ডুবুডুবু। আল্লাহ আল্লাহ করে কোনওরকমে ঘাটে এসে পৌঁছল মা। সেই রাতেই স্বপ্নে দেখল সাতটা কাঁসার ডেগ। হা করা মুখে চকচক করছে কাঁচা টাকা। সবচে বড় ডেগটার ভিতর থেকে মানুষের কথা বলার মতো কেউ বলে, নে, নে। মা স্বপ্নের ভিতরেই জানতে চাইল, তোমরা কোথায়?
পুকুরের উত্তর কোণে ছিলাম। সন্ধেবেলা তোর সঙ্গে চলে এসেছি। এখন তার ঘরের মধ্যিখানে ঘুণে খাওয়া খামটার তলায় আছি।
মা আবার জিজ্ঞেস করল, তোমাদের নিতে কী লাগে?
ডেগের ভিতর থেকে শব্দ আসে, জোড়া নারকেল, কমলা আর মাথায় সিঁদুর।
সকালবেলা ওঠেই সেজাল খাঁকে খবর দিল। তখন জাহাজে। মিয়াভাই সেজাল খাঁকে ডেকে আনল। মা সব খুলে বলল তাকে। সেজাল খাঁ বলল, বৈঠক দ্যান। সেই রাতেই বৈঠক দেয়া হল। বৈঠকে মহাজনরা বলল, ঘরে আছর হইছে। যা যা চাইছে তা হইল কপালের সিঁদুর মানে তোর মরদ। জোড়া নারকেল, তোর দুই ছেলে। আর কমলা হইল তোর কন্যা।
মা জানতে চাইল, কন্যা কই বাবা?
হইবো।
শুনে ফুঁপিয়ে ওঠেছিল। এখন তাইলে কী করমু বাবা?
ঘরের মধ্যিখানের খামটা উডাইয়া ফালা।
জাহাজে খবর পাঠানো হল। বাড়ি এসে সেই খামটা পাল্টে ফেলল বাবা। তার কদিন পরে বুড়ি জন্মায়। বুড়ি জন্মের পর মা ঘাটে গেলেই জলের তলায় সেই ডেগেরা এসে হাজির হত। আমাগ তুই ফিরাইয়া দিলি? তর কপাল পুড়ব।
মা তারপর বাড়ির কোথাও একাকী গেলেই সেই স্বর শুনত। রান্না করতে বসলে শুনত। আর রাতের বেলা তো কথাই নেই। কেবল সেই সাতটা ডেগ তার চোখের সীমায় এসে স্থির হয়ে থাকত। সেই অলৌকিক স্বর বাজত কানে। অথচ মার গায়ের পাশে শুয়ে বাবা এসবের কিছুই দেখত না। কিছুই শুনতে পেত না। মা ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে ওঠত ভয়ে, বাবাকে জড়িয়ে ধরত।
তারপর একসময় সেই ডেগেরা আর দেখা দিত না। অলৌকিক স্বরের কথাও আর শুনতে পেত না মা। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুড়িটা ক্রমশ পঙ্গু অথর্ব হয়ে যেতে লাগল।
.
সেজাল খাঁর উঠোনে দাঁড়িয়ে প্রথমে গলা খাঁকারি দিল শুকু। তারপর বলল, ফকির সাব বাড়িতে আছেননি?
সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে মেয়েমানুষের গলায় জবাব এল, আছে। মাজারে বাত্তি দেয়। শুকু উঠোনের কোণে জবাগাছের ঘন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে। কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করে মশা, পায়ের কাছে কুনো ব্যাঙ লাফায়, ছুঁচো দৌড়ে পালায়। সে দাঁড়িয়ে থাকে। ফকির সাব তাহলে আছেন! কথাটা ভেবে বুকের ভিতর কীরকম সুখসুখ একটা অনুভূতি হয় শুকুর। সে জানে, সেজাল খাঁর ঘরে মাজার আছে। ঘরের পশ্চিম-উত্তর কোণে। ফকির রোজ সন্ধেবেলা মোমবাতি জ্বালায় আগরবাতি জ্বালায় সেই মাজারে। সেজদা দেয়ার ভঙ্গিতে সালাম করে আসলে মহাজনরা সবসময়েই আসাযাওয়া করে। পাকপবিত্র না থাকলে ক্ষেপে যায়। একবার কী দোষ পেয়ে তেঁতুল গাছ থেকে ফেলে দিয়েছিল ফকিরকে। পাঁজরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। তখন থেকে ফকির বড় সাবধান।
