গণি মৃদু স্বরে বলল, আনছি।
শুকু তারপর চিৎকার করে মাকে ডাকল। ভাবীকে ডাকল। খাওন-দাওন ঠিক কর। শুকুর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ফকির বাধা দিয়ে বলল, আস্তেধীরে করুক। হপায় তো হাঁজ অইল। তারপর ঘরে এসে সারেঙের আড়াআড়ি শরীরটার পাশাপাশি বসে পড়ল। কুপি হাতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সারেঙকে। পাশে দাঁড়িয়ে মা, গণি, গণির বউ আর শুকু কী এক আশায় বুক বাঁধল।
ফকির মুখ ঘুরিয়ে বলল, আগে আল্লা, ভালা অইয়া যাইব। মাহাজনরা যা যা কয় খেয়াল কইরা রাইখেন। ডরের কিছু নাই।
ফকিরের কথায় একধরনের হতাশা টের পায় শুকু। হাবভাব অনিশ্চয়তার এক ছায়া দুলতে দেখে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের শব্দ পাল্টে যেতে থাকে শুকুর। বাবায় কি তয় বাঁচব না। কান্না পায় শুকুর। গলা ভিজে আসে তবু নিজেকে শক্ত করে বলল, ইট্টু ভালা কইরা দেখেন ফকির সাব। আমার বাজানের যেনো কুনো ক্ষতি না হয়।
ফকির মৃদু হাসে। ঘাবড়াইও না। মহাজনরা আহুক।
গণি ছোট্ট জলচৌকির উপর ফুল সাজাতে বসে। ছোট্ট চোঙা খুলে বাতাশ ফুলের। রাখে পাশে। বাটিতে চাল ভরে আগরবাতি দাঁড় করায়। কুপির আঁচে মোমের তলা নরম করে জলচৌকির চারদিকে লাগিয়ে দেয়। গ্লাসে রাখে জল, দুধ।
ফকির তারপর ভাত খেতে বসে। গণির বউ ঘোমটার আড়াল থেকেই সাজিয়ে দিচ্ছে খাবার। গোটা গোটা চালের ভাত, বাটি বাটি তরকারি, শুকুও বসেছে পাশে। একবার চৌকির ওপর বাবার শরীরটার দিকে তাকিয়ে ভাতে ঝোল মাখে সে। মা এখন বাবার পাশে বসে আছে। বুড়িটা পাটাতনের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে থাকলে শব্দ টব্দ করত। জড়ানো স্বরে কথা বলতে চাইত। মিয়াভাইটা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। বাবার অসুখটা যেন তার উপর ভর করেছে। বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার চেহারা শুকু মনে মনে বলল, মিয়াভাইর কি অইল! এত ঘাবড়ানের কী অইছে ফকির যখন আইছে! আর কোনও ডর নাই। বাজানে ভালা হইয়া যাইব।
ভাতের নলা মুখে পুরে শুকু ফকিরের মুখের দিকে তাকায়। ফকির লোকটা ভাবির দিকে অমন করে তাকাচ্ছে কেন। শুকু হা করে ফকিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দেখে ফকির হেসে বলল, ও শুকু। ভাবিরে কও ঘোমটা হালাইতে। শরম কী। ভালা কইরা ইট্টু সুন্দর মুখখান দেহি। কথাটা ভালো লাগল না শুকুর। তবু অকারণে হাসল সেও ফকিরের কথা শুনে। চৌকির উপর বাবার পাশে বসা মা আর ভাত বাড়তে বসা ভাবি দুজনই ঘোমটার ভেতর জড়সড় হয়, শুকু বুঝতে পারে।
গণি বোধহয় ব্যাপারটা বুঝতে পারে। কথা অন্যদিকে ঘোরায় সে। খাওনের কিছু নাই ফকির সাব। মনে কষ্ট নিয়েন না।
শুনে হাসে ফকির। আরে না না খাওনের মধ্যে কী!
তারপর ভাতগুলো নেড়েচড়ে বলল, কী চাই এইডা, সোনাদীগা? গণির বউ ঘোমটার আড়াল থেকে মৃদুস্বরে বলল, না সোনাদীগা একটু লম্বা অয়। এইডা লক্ষীদীঘা।
ফকির মুগ্ধ চোখে গণির বউয়ের মুখের দিকে তাকায়। কতা দেহি ময়না পাখির লাহান, কয়না ক্যা।
গণির বউ হাসে। কথা বলে না।
দরোজা ঠেলে হাজামবাড়ির ছেলে দুটো এল তখন। রবা, নবা। মানিকজোড় ফকিরকে সালাম দিয়ে দ্রুত হাতে তামাক সেজে ফেলে তার। ফকির মুখ মুছতে মুছতে বলল, টান টান। রবা নারকেলের হুঁকায় টেনে টেনে ধোঁয়া তোলে। শেষে বড় বড় কয়েকটা টান দিয়ে ফকিরের হাতে দেয়, ধরেন।
ফকির কপালে হাত ছুঁয়ে ছুঁকা ধরে তারপর টানতে থাকে। লোকটার সবকিছুতে কেমন গা ছাড়া ভাব। রোগী মরে যায়, অথচ সে নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের কাজকর্ম করে যাচ্ছে। দেখে শুকু ভেতরে ভারী বিরক্ত হয়। হালায় কেমুন ফকির! মানুষ মইরা যায় আর ওই হালায় তামুক খায়।
রবা বলল, হোনছেননি ফকিরসাব, আমিন মুন্সী কইলাম মইরা গেছে।
ফকির হুঁকা থামিয়ে বলল, কবে?
কাইল। নাইতে নামছিল। আর উডে না দেইক্কা হ্যার পোলায় নাইম্যা উডাইছে। দ্যাহে শ্যাষ অইয়া গেছে।
আহারে একটা ভালামানুষ গ্যাল।
রবা বলল, মুন্সী বলে কুরান শরিফের ভিতর টাকা পাইত।
হুনছি তো। হকালে উইট্যা কুরান শরীফ খেললেই পাঁচ টাকার একখান নোট পাইত। আপনেও বলে কী পাইছিলেন?
হেই কতা আর কইয়া কী অইবরে ভাই। কপাল দোষে হারাইছি।
ওদের কথা শুনতে শুনতে শুকু ভীষণ বিরক্ত হচ্ছিল। হাত পা নিসপিস করছে। তার চোখ ভেঙে আসছে ঘুমে। ফকির অহনও বইতাছে না ক্যা। ফকির বলল, মাহাজনরা কইল ঘরের উত্তর পশ্চিম কোণায় পাবি। কেঐরে কইতে পারবি না। পরদিন গুমথনে উইট্টা দেহি হেই জাগার মাডি আ কইরা রইছে। বিতরে চকচক করতাছে সোনা। আমার তহন উস গেন নাই, দেইক্কা মাতা গুইরা গ্যাছে। মনেই অইল না মাহাজনরা নিষেধ করছে কেউরে কইচ না। আমি বাড়ির হগলতরে ডাইক্কা আনলাম। দেহাইলাম। রইল না। রাইতে মাহাজনরা আইল। আমারে কয়, তৈতুইল গাছের নিচে যা। গ্যালাম। একটা থাবড় মারল, ঘুইরা পইড়া গ্যালাম। যহন উস অইল দেহি হকাল অইয়া গ্যাছে। আমার মুহের লৌ পইড়া মাডি ভিজ্জা গ্যাছে। থাবড়ের চোডে দুইডা দাঁত নাই। ক এমুন বেক্কেল অয় মাইনষে!
গণি ওঠে এসে ফকিরের পাশে বসল। হাত কচলাতে কচলাতে বলল, ফকিরসাব রাইত অনেক অইছে। হগলতে জিমাইতাছে। বহেন ইবার।
ফকির হুঁকা ছেড়ে সোজা হয়। রবা নবা তার দুপাশ থেকে সরে গিয়ে চৌকির গা ঘেঁষে বসে। শুকু চোখ ডলতে থাকে। ঘুম আসছে তার। তবু সোজা হয়ে বসে। কুপির আলোয় দেখে ভাবি পাটাতনের ওপর বুড়ির পাশে ছোট হয়ে শুয়ে। হাত পা মুখ সব শাড়িতে ঢাকা। মা তো সন্ধ্যে থেকেই বাবার পাশে বসা। এখন ঠায় বসে আছে। ক্লান্তি নাই। ফকির গলা খাকারি দিয়ে আসনের সামনে স্থির হয়ে বসে। বিড় বিড় করে মন্ত্র পড়তে শুরু করল। ঘরের ভেতর কয়েকজন মানুষের শ্বাস ছাড়া অন্য কোন শব্দ নেই। খুব খেয়াল করলে বাইরে প্রকাণ্ড পৃথিবীতে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যায়। চরাচর বিশাল স্তব্ধতায় ডুবে গেছে। বাতাসের চলাচল বড় ক্ষীণ, টের পাওয়া যায় না।
