ইরফানের শরীরে ঘন হয়ে মিশে যায় পদ্ম। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে শোয় ইরফান। গুমাইয়া পড় বউ। পদ্মা যেন সে কথা শুনতে পায় না। ইরফানের পিঠে মায়ামমতা কিংবা অন্যরকম কোনও স্পর্শে হাত রাখে। আস্তে আস্তে হাত বুলায়। গুমাইলা?
ক্যাঁ।
ছকিনার পোলাপান অইব।
হাছা?
হ।
তারপর একটু থেমে স্বামীর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে পদ্মা বলল, আমাগো যদি একটা পোলাপান অইত!
ইরফান কথা বলে না। ঘুমে চোখ টানে তার। ব্যাপারটা টের পেয়ে পদ্মা কাঁদো গলায় বলল, আমারে ইট্টুও মায়া কর না তুমি।
ইরফান আওয়াজ দেয় না। ঘুমের ভান করে। পদ্মা দুহাতে জড়িয়ে ধরে তাকে। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস গলায় বলে, আমারে ইট্টু আদর কর না গো আইজ! আদর করলে আমারও পোলাপান অইব। তুমি দেইখো।
এবার বিরক্ত হয় ইরফান। রাগে গর্জে ওঠে। চুপ কর মাগী। খালি রঙ্গের প্যাচাইল। রাইতে মাছ মারতে যামু। তর লগে পিরীত করতে পারুম না অহন। গুমাইতে দে।
হঠাৎ করে মুখের ওপর যেন চড় মারল কেউ। থতমত খেয়ে গেল পদ্মা। খানিক চুপ করে রইল সে। তারপর গুমরে গুমরে কাঁদতে লাগল। পদ্মার কান্না শুনতে শুনতে অবলীলায় ঘুমিয়ে পড়ল ইরফান।
.
দুপুর রাত চট করে ঘুম ভেঙে গেল ইরফানের।
কয়েকদিন এরকম অভ্যেস হয়ে গেছে। গভীর রাতে ঘুমের ভেতর কেউ যেন ডাক দিয়ে যায় তাকে। ওঠ ইরফান। বিলে মাছ ওঠছে। বোয়াল মাছে পীর ধরছে। দুনিয়া ভইরা গ্যাছে মাছে। মাছ মারতে যাবি না।
সেই ডাকে ঘুম ভেঙে যায় ইরফানের। বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হু হু করে জোয়ারে বাতাসে আসে ঘরের ভেতর। বাতাসে মাছের আঁশটে গন্ধ পায় ইরফান। সেই গন্ধ বিড়ির নেশার মতো কাজ করে। লাফিয়ে ওঠে ইরফান।
আজও ঘুমের ভেতর ওরকম ডাক শুনল ইরফান। শুনে লাফিয়ে উঠল। তারপর হারিকেনটা উসকে দিল। বিড়ি ধরাল। পদ্মাকে দেখল কাত হয়ে ঘুমোচ্ছে। হারিকেনের আবছা আলোয় কান্নার চিহ্ন দেখা যায় পদ্মার চোখে। ঘুমোনোর আগে প্রচুর কেঁদেছে পদ্মা বোঝা যায়। পদ্মার মুখটা দেখে নিঃশব্দে হাসল ইরফান। তারপর হারিকেন হাতে ওঠে দাঁড়াল। না, পদ্মাকে জাগাবে না। টের পেলে বউডা আবার খ্যাচ খ্যাচ শুরু করবে। একলা ঘরে থাকতে ডর করে না আমার!
কিংবা জোয়ারের মাছ ধইর না। তোমার আল্লার কছম। এইডা বড় ভালা সুময় মাছেগো। এসব শুনলে হাসি পায় ইরফানের। কী সব পোলাপানের লাহান কথা! মাছের ডিম পাড়ব তাতে পদ্মার কী! দুনিয়ার বেবাক জীবেই তো হয় ডিম পাড়ে, নয় বাচ্চা বিয়ায়। এইডাই দুনিয়ার নিয়ম। এর লেইগা অত হায়আফসোস দয়া দরদ দেহানের কী অইল। ঝাঁপ সরিয়ে ঘর থেকে বেরুল ইরফান।
বাইরে দাঁড়িয়ে ঝাপটা আবার ঠিকঠাক করে লাগিয়ে দিল। তারপর আকাশের দিকে তাকাল। ম্যাটম্যাটে জ্যোৎস্না ওঠেছে এখন। আকাশে মেঘের চলাচল আছে। আমগাছের মাথায় পাতলা শাড়িতে মুখঢাকা সুন্দরী মেয়ের মতো চাঁদ দেখা যায়। মেঘ এসে বারবার ঢেকে দেয় চাঁদ। তখন আবছা আঁধার নামে। আর সাপের মতো শব্দ করে বয়ে যায় বাতাস।
উঠোনের আটাল মাটিতে পা টেনে টেনে গোয়ালঘরের দিকে যায় ইরফান। পদ্মার বুঝি তখুনি ঘুম ভাঙে! ঘরের ভেতর বিড়বিড় করে একাকী কথা বলার শব্দ পাওয়া যায়। তারপর অস্ফুট কান্নার। শুনে নিঃশব্দে হাসে ইরফান। বউডা অহনও পোলাপান রইছে। ঘুমের তালে কথা কয়, কান্দে। গোয়াল ঘরে ঢুকে পলোটা খোঁজে ইরফান।
গরুগুলো লেজ ঝাঁপটে মশা তাড়াচ্ছিল। বকনাটা অতিরিক্ত দাপাদাপি করছে। দেখে হারিকেনটা একটু উসকে দেয় ইরফান। চালার সঙ্গে লটকে রাখা পলোটা টেনে নামায়। তখুনি দমকা একটা হাওয়া ওঠে। গোয়াল ঘরের পেছনে, বাড়ির নামার দিকে ঘ্যাঙ্গর ঘ্যাঙ্গর ডাকে ব্যাঙ। এক হাতে ঘাড়ের ওপর দিয়ে পলোটা ধরে রেখে অন্য হাতে হারিকেন ঝুলিয়ে মাঠে নেমে যায় ইরফান। বুকের ভেতর বিশাল এক উত্তেজনা জোয়ারে জলের মতো দ্রুত ছড়িয়ে যায় তার।
মাঠে এখন গোড়ালি ডুবে যাওয়ার মতো জল ওঠে গেছে। সেই মাঠ দিয়ে ছপছপ শব্দে হেঁটে যায় ইরফান। পশ্চিমের বিল ছাড়া বোয়াল পাওয়া যাবে না। ধানপাটের ক্ষেতে পরী ধরতে ওঠে বোয়াল মাছ। একটা আর একটার গায়ে এমনভাবে লেগে থাকে দেখে দুটোকে একটা মাছই মনে হয়। কোৎ কোৎ করে কী যে শব্দ করে মাছগুলো তখন! মানুষ কাছে গেলেও পালায় না। যৌবন কী অদ্ভুত ক্ষমতায় ভুলিয়ে দেয় মৃত্যুভয়। টেটা দিয়ে পীরের বোয়াল মারা যায় না।
টেটা মারলে একটার বেশি গাঁথে না। পীরের বোয়াল মারতে হয় পলো দিয়ে। পলো দিয়ে আটকে দিতে হয়। তবে পলোতে বোয়াল আটকে সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে হাত দিলে কামড়ে হাত খেয়ে ফেলবে। বোয়াল মাছ এসময় পাগল হয়ে ওঠে। এ যেন দুরন্ত এক বিদ্রোহ মাছেদের! যৌবন বিদ্রোহ।
তবে বোয়ালের মন্ত্র ইরফানের জানা আছে। পলোর ভেতর ঘণ্টাখানেক আটকে রাখলে নরম হয়ে যায় মাছ। তখন ভয় থাকে না। নির্বিঘ্নে তুলে আনা যায়।
ইরফানের পায়ের শব্দে তখন ছোট ছোট মাছ ছুটে পালাচ্ছিল।
লাফিয়ে সরে যাচ্ছিল। ঘাসবনে চুটপুট শব্দ হচ্ছিল। খোলা মাঠে মাঠে জলো বাতাস গড়িয়ে যাচ্ছিল। মরা জ্যোৎস্না ছিল স্থির হয়ে। আকাশপ্রান্তর ছাপিয়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। থেকে থেকে ডাকছিল জোয়ারের মেঘ। কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছিল না। রাত কী রকম আশ্চর্য এক গভীরতায় মগ্ন হয়েছিল। দূরের ছাড়া বাড়ির সামনে টিমটিমে আলো দেখা যাচ্ছিল। বোঝা যায়, মাছে ধরতে বেরিয়েছে কেউ। দেশ ভরে গেছে মাছে। মানুষেরা সব মনের সুখে সেই মাছ ধরছে। অথচ পদ্মা কী অদ্ভুত মানুষ! জোয়ারে মাছ ধরতে মানা করে!
