কী সাপ! জাতটাত নয় তো।
না, জাতসাপ তো মাছ খায় না। ঢোঁড়াটোড়া হবে!
মাছখেকো ঢোড়া সাপের কথা ভেবে সাহস পেল ইরফান। সাবধানে এগিয়ে গিয়ে টেটাটা টানল। যাই হোক, শালা ভালো করে গেঁথেছে। ছুটে কামড়াতে অন্তত পারবে না।
সাপটা ততক্ষণে প্রচণ্ড শক্তিকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। পুরো শরীর টেটার সঙ্গে পাচিয়ে উথালপাথাল করছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না।
সাবধানে ঝোপের ভেতর থেকে টেটা বের করে আনল ইরফান। ইরফানের ভাবনাই ঠিক। একটা পুরোনো কালঢোঁড়া মাছ খেতে বেরিয়ে টেটায় গাঁথা পড়েছে।
কিন্তু সাপটাকে ছাড়ানো যায় কী করে। তাছাড়া তেঁড়ার মধ্যে এ জাতটা আবার খারাপ। কামড়ালে বিপদ আছে।
এসময় বেশ শব্দ করে মেঘ ডাকল। সেই ডাকে সাপের কথা ভুলে চারদিকে তাকাল ইরফান। তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চাপচাপ অন্ধকার জমে ওঠেছে। গাছপালায়। আগের সেই হাওয়াটা আবার হু হু করে বইতে শুরু করেছে। হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাছে কোথাও গলা ছেড়ে ডাকতে শুরু করেছে কোলা ব্যাঙ। বৃষ্টি কমে এসেছে।
মাঠের দিকটা এখনো ফরসা। কিন্তু অন্ধকার হতে দেরি হবে না। মাঠের দিকে তাকিয়ে কী ভাবল ইরফান। তারপর টেটা ফেলে রেখেই বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। সাপটা যদি একা একা নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় তো ভালো, না হয় কাল সকালে এসে যা হোক ব্যবস্থা একটা করা যাবে। এখন অত বড় সাপ ঘটাতে যাওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া সন্ধ্যেও হয়ে আসছে। বাড়ি ফিরে সন্ধ্যেরাতে ছোটখাটো একটা ঘুম দিতে হবে। মাঝরাতে যেতে হবে বিলে। রাতের বেলা পশ্চিমের বিলে বোয়াল মাছ পীর ধরে। এই দিনে পীরের বোয়াল না মারলে সে আবার মাছ শিকার হল নাকি!
বাড়ি ফিরে ইরফান দেখতে পেল আবছা অন্ধকারে গোয়ালঘরে গরু বাঁধছে পদ্মা। বকনাটা হাম্বা করে চেঁচাচ্ছে। লেজ ঝাঁপটে মশা তাড়াচ্ছে। এই রকম বৃষ্টিবাদল অথচ মশার কমতি নেই, গরুগুলো রাতভর লেজ ঝাঁপটে তাড়ায়। এদিকে আঙিনার মাটি পচে ওঠেছে বৃষ্টিতে। একাকার কাদা। পা রাখা দায়। আটালে মাটির কাদা বড় পেছল। আর মাটিতে কেমন সোঁদা গন্ধ।
ইরফানকে শূন্য খালুই হাতে ফিরতে দেখে খুবই অবাক হল পদ্মা। হেসে বলল, টেডা কৈ? ইরফান কথা বলল না। ঘরের সামনে ফেলে রাখা থান ইট দুটোর ওপর দাঁড়িয়ে বদনার জলে পায়ের কাদা ছাড়াতে লাগল। পদ্মা ঘরে গিয়ে কুপি জ্বালল। এখন আর বৃষ্টি নেই। দমকা হাওয়াটা আছে। গাছপালায় শোঁ শোঁ শব্দটা হচ্ছে। শব্দটা এমন শুনে মনে হয়, যেনও ভয়ানক তেজী কোনও সাপ থেমে থেমে ফুঁসছে।
মাথালটা খুলে গামছায় শরীর মুছতে মুছতে ইরফান বলল, মনডায় কইছিল হিংয়ের পীর অইব। টেডা মারতেই দেখলাম কালঢোঁড়া। ওরে বাপ র্যা! হালার পুতে পাঁচ আতের কম লম্বা না। টেডা ভাইঙা হালাইতে চায়। টেডা হালাইয়া থুইয়া আইয়া পড়লাম।
ইরফানের কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল পদ্মা। চোখ ড্যাব ড্যাব করে বলল, মাগো! তুমারে হাপেই খাইব একদিন।
পদ্মার কথা শুনে ঠা ঠা করে হাসে ইরফান। ভাত দে। খাইয়ালইয়া ঘুম দেই।
মাটির হাঁড়ি থেকে ভাত দেয় পদ্মা। কাঁঠাল কাঠের চওড়া একটা পিড়িতে দুপা ভাজ করে বসে গপাগপ ভাত খায় ইরফান। পদ্মা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। তারপর বলে, তুমি কী মানুষ গো। ডরভয় নাই পরানে।
ইরফান পদ্মার মুখের দিকে তাকায়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পদ্মাকে দেখে। হাসে। তারপর কথা অন্যদিকে ঘোরায়। তর শরীরডায়ও তো জোয়ার লাগছে মনে অয়।
পদ্মা মাথা নিচু করে হাসে। তুমি আবার এই হগল দ্যাহনি!
ঢক ঢক করে জল খায় ইরফান। দ্যাহি র্যা! দেহি! হগলই দেহি।
মনে তো অয় না।
কী মনে অয় তোর!
মনে হয় চেক্কা মাছ ছাড়া আর কিছু দেহ না তুমি। কানে মাছের ঘাই ছাড়া আর কিছু হোনো না।
খাওয়া শেষ করে বিড়ি ধরাল ইরফান। তারপর টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল হোগলের বিছানায়। চিৎ হয়ে শুয়ে বিড়ি টানতে লাগল।
হারিকলডা আঙ্গাইয়া থো পদ্মা।
ইরফানের কথা শুনে মুখ ঝামটা মারে পদ্মা। না আউজ রাতে আর মাছ মারতে যাইতে পারবা না।
ইরফান কথা বলে না। নির্বিকার ভঙ্গিতে বিড়ি টানে। খুক খুক করে অকারণেই বার কয়েক কাশে। তারপর খাকিয়ে ওঠে। প্যাচাল পারিস না। আঙ্গাইয়া গো হারিকলডা। রাইতে আর তরে জাগামু না।
পদ্মা এক পলক ইরফানের মুখের দিকে তাকায়। মুখটা ম্লান হয়ে গেছে তার। কী এক অভিমানে ভরে গেছে বুক। পদ্ম আর কথা বলে না। কাঁচ পরিষ্কার করে কুপির সলতেয় হারিকেন জ্বালায়। ইরফান শুয়ে শুয়ে দেখে গোমড়া হয়ে গেছে পদ্মার মুখ। বউটা এরকমই। একটুতেই বাচ্চা মেয়ের মতো অভিমানী হয়ে ওঠে। গাল ফুলিয়ে মুখ গোমড়া করে। সহজে কথা বলে না।
কুপি নিভিয়ে হারিকেনটা বিছানায় পাশে রাখে পদ্মা। তারপর ইরফানের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ে। কিন্তু কথা বলে না। শব্দ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ইরফান আস্তে করে জিজ্ঞাস করে, পলোডা কই রাখছস?
পদ্মা কথা বলে না। ইরফান সামান্য বিরক্ত হয়। আরে কথা কয় না ক্যা!
পদ্মা আস্তে করে বলল, গোয়াল গরে রাখচি।
তারপর আবার সব চুপচাপ। কেউ কোনও কথা বলে না। হারিকেন ম্লান আলো ছড়াচ্ছে। ঘরের ভেতর। বাইরে গাছপালায় বইছে সেই দমকা হাওয়া। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। গুড় গুড় করে ডাকছে মেঘ। কিন্তু বৃষ্টি নেই।
