ক্রাচের মতো ব্যবহার করে ডাঙায় ওঠে আসে।
মিয়াবাড়ির গোমস্তা অখিলা বড় চালাক লোক। পুকুর থেকে চারদিক দিয়ে জল উপচাতে দেখে ছোট মতো নালা কেটে দিয়েছে এক জায়গায়। পুরো জলাটা নেমে আসছে, সেই নালা দিয়ে। সঙ্গে নামছে পুঁটি মাছের ঝাঁক। অখিলা সকাল থেকে একটানা সন্ধ্যে পর্যন্ত মাছ ধরে। খালুই খালুই পুঁটি মাছ। তিনটে খুঁটি দিয়ে ভেঁশালের মতো করে ছোট জাল পেতে দিয়েছে নালার মুখে। জল গড়িয়ে নামে জালের ভেতর দিয়ে আর মাছগুলো আটকে থাকে জালে। রুপোলি শরীরে লাফালাফি করে।
এসব ছোট মাছ ধরতে ভালো লাগে না ইরফানের।
পদ্মার জন্যে কাল পুঁটি মাছ দিয়েছিল অখিলা। সেই মাছ দেখে পদ্মা যে কী রকম আফসোস শুরু করল! পুটি মাছেরা ক্যামন শাড়ি ফিনছে দ্যাহ। এইডা বড় সুখের দিন ওগো। এই মাছটিরে তুমরা মার ক্যান?
পদ্মার কথা শুনে রাগ করেছিল ইরফান। তর যত সোয়াগের কতা বউ! মাছের ভালা সুময় দেইখ্যা, সুখের সময় দেইখ্যা আমরা মাছ মারুম না?
এখন অখিলাকে দেখে পদ্মার কথা মনে পড়ল ইরফানের। মনে পড়ে মেজাজ একটু খারাপ হল। মাছের ভালো সুময়, খারাপ সুময়ে মাইনষের কী যায় আহে! বনের বাঘে কি মাইষের সুখ-দুঃখ দেইখ্যা মানুষ খায়! বিলাইতে কি ইন্দুরের সুখ-দুঃখ দেইখ্যা ইন্দুর খায়। এইডা অইল গিয়া দুনিয়াদারির নিয়ম। একটা জীবে আরেকটারে খাইব। যার জোর বেশি হেয় খাইব কমজোরীগো।
ইরফানকে দেখে দাঁত কেলিয়ে হাসল অখিলা। উদোম গায়ে লুঙ্গি কাছা মেরে বসে মাছ ধরছে সে। গন্ধরাজ ফুলের মতো থোকা থোকা পুঁটি মাছ তুলে রাখছে খালুইতে।
অখিলার মেষের মতো কালো শরীরে বৃষ্টির জল গড়াচ্ছে। হাসতেই অখিলার ঠোঁটের দিকে চোখ গেল ইরফানের। উনুনের পোড়া মাটির মতো রং ধরেছে ঠোঁটে। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে মাছ ধরেছে বলে এই অবস্থা। অখিলার হাসির জবাব না দিয়ে তার খালুইয়ের ভেতরটা উঁকি মেরে দেখল ইরফান। তারপর বলল, কী র্যা অখিলার পো, কতডি পাইলি?
আবার আগের মতো করে হাসল অখিলা। দুই খালুই থুইয়া আইছি মেবাই। অহন এইডা ভরলে যামুগা। ভারি শীত করে মেবাই।
কথা বলার ফাঁকে দাঁতে দাঁতে ঠুকে যায় অখিলার। হু হু করে কাঁপছে সে।
নালার মুখে পেতে রাখা জালের দিকে এক পলক তাকিয়ে ইরফান বলল, পুডি মাছ এত ধইরা কী করবি? হেরচে বাইত্তে গিয়া গুমা। কাম অইব।
অখিলা কথা বলে না। একটা মেটে সাপ এসে চোখের পলকে জড়িয়ে ধরে তার জালে। পুরো শরীরটা প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে উথালপাথাল করে জালটা। স্বচ্ছ জলের তলার পুঁটি মাছের চলাচল দেখা যাচ্ছিল। দেখে শব্দ করে হেসে ওঠল ইরফান। আর অখিলা হল মহাবিরক্ত।
বিড়বিড় করে গাল দিল সে। হুমুন্দির পুত হাপেই জ্বালাইয়া খাইল। পাঁচটা ছাড়াইলাম। একবার প্যাচাইয়া গ্যালে সহজে ছাড়ান যায় না। জাল ছিঁড়ে যায়।
ইরফান আর কথা বলে না। নালাটা ডিঙিয়ে দক্ষিণের জংলা মাঠে গিয়ে নামে। জায়গাটায় হাগড়া আড়ালি আর বাকসা ঘাসের জঙ্গল। জঙ্গলের কোমর অব্দি ডুবে গেছে। জলে। সেদিকে এগিয়ে গেল ইরফান। শব্দ পেলে মাছেরা সব ছুটে পালাবে। এজন্যে সাবধানে পা ফেলছিল সে।
মাছেরা খুব সচেতন জীব। মেয়েমানুষের মতো। মেয়েমানুষে যেমন চোখ দেখে পুরুষের মতলব টের পায়, মাছেরা তেমন সামান্য শব্দে ভয় পায়।
সাবধানে পা ফেলে ইরফান। পা তোলে।
এক জোড়া কোলা ব্যাঙ লাফ মেরে পালিয়ে গেল পায়ের কাছ থেকে। চমকে টেটা বাগিয়ে ধরল ইরফান। তারপর ব্যাঙ দেখে হেসে ফেলল। কোলা ব্যাঙরাও ডিম ছাড়ে এসময়। আধা জল আধা শুকনোয় পড়ে থেকে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর একটানা ডাকে ব্যাঙগুলো। খানিকক্ষণ পর পর কালো দানা দানা ডিম ছাড়ে জলে। মুহূর্তে জলের ভেতর ছড়িয়ে যায় ডিমগুলো।
মিয়াবাড়ির গাছপালা দমকা হাওয়ায় সাপের মতো শোঁ শোঁ শব্দ ছড়ায়। আকাশের তলায় এসে স্থির হয় কালো মেঘ। বিদ্যুৎ চমকায়। গুড় গুড় করে মেঘ ডাকে। তারপর বৃষ্টির তোড় বাড়ে।
মাথলাটা এক হাতে নেড়েচেড়ে ঠিক করে ইরফান। হিজল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কোমর থেকে বিড়ি আর দেশলাই বের করে। বৃষ্টি এবং বাতাসের আঁচ বাঁচিয়ে কায়দা। করে বিড়ি ধরায়। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মিয়াদের পুকুরের দিকে তাকায়। বর্ষার জলে মিয়াদের পুকুরটা এখন টইটম্বুর। পুকুরের জলে পড়ছে বৃষ্টি। জলের ওপর পড়ছে জল। দেখে মনে হয়, অসংখ্য পোনামাছ পুট পুট করে ভাসছে পুকুরের জলে। একটা ছুঁই লেজ নেড়ে নেড়ে আস্তেধীরে সাঁতার কাটে। হু হু বাতাসটা বয়ে যায়। বাতাসে কনকনে একটা শীত ভাব।
বিড়ি টানতে টানতে হাঁটে ইরফান। বিড়ির ধোঁয়ায় বেশ একটা উত্তেজনা তৈরি হয় শরীরে। পায়ের তলায় শীতল জলের ছোঁয়া টের পাওয়া যায় না।
একটা ছোট ঝোপের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল ইরফান। অল্প অল্প নড়ছে ঝোপটা। মুহূর্তে তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠল ইরফানের চোখ। এটা আড়ালির ঝোপ। ভেতর কেমন খল খল শব্দ হচ্ছে। মুহূর্তে দেরি করল না ইরফান। খচ করে টেটা চালিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে গেল ঝোপটা। বিড়িটা শেষাশেষি চলে এসেছে। হাতে আঁচ লাগে। সুখটান দিয়ে ফেলে দিল ইরফান। তারপর যত্ন করে টেটাটা টেনে তুলতে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে মুখটা হা হয়ে গেল ইরফানের। অস্ফুট একটা ভয়ার্ত শব্দ বেরিয়ে এল মুখ থেকে। টেটাটা অল্প একটু টানতেই শরীর দেখা গেছে জীবটার। কালোর ভেতর হলুদ ডোরাকাটা। গস্তি নাওয়ের কাছির মতো মোটা। হা করা মুখের ভেতর পেট ফোলা বড় সড় একটা রয়না মাছের অর্ধেকটা ঢুকে আছে। ঠিক ঘাড়ের কাছটায় ইরফানের টেটা গেঁথেছে। তবু বেশ ভয় পেল ইরফান। টেটা ছেড়ে সরে এল।
