মংলা বিড়ি টানতে টানতে বলল, না, তরে অহন কোনহানে লইয়া যাওন ঠিক অইব না। আছার ওছার খাইলে প্যাড নষ্ট অইয়া যাইব।
আছার খামু না।
তুই জানস আছার খাবি না!
টুকি এবার থেমে যায়। জানে এখন আর কোনও কথা বললেই রেগে যাবে মংলা। মনীন্দ্রের ব্যাপারটা টের পেয়েছে মংলা। একদিন টুকিকে জিজ্ঞেসও করেছিল; ঠাকুরের লগে তর বলে খাতির আছিল!
কে কইছে?
আমার লগে মিছা কথা কবি না।
টুকি তখন উপায় না দেখে ফোঁস ফোঁস করে কেঁদেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, আমারে তুমি অবিশ্বাস কর?
মংলা আর কোনও কথা বলেনি। কিন্তু মংলার কথা না বলার মানে টুকি বুঝতে পেরেছে।
ঠাকুরকে একদিন দেখে নেবে মংলা। সুযোগ পেলেই দেখে নেবে।
সেই থেকে ভয়ে ভয়ে আছে টুকি। মংলা আজ মেদিনীমণ্ডল যাচ্ছে শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করেছে তার। মনীন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে না তো মংলা! শুনে টুকি কেমন একটু রসিকতা করে, কেঐর গলা কাডতে যাইতেছনি। শুনে খ্যাক খ্যাক করে হাসে মংলা, কামই তো মাইনষের গলা কাডন!
নশা তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে ডাকে, নাও আইছে ওস্তাদ। লও বাইর অই।
.
বাঁশঝাড়ের ভেতর ছিপ নাওটা ঢুকিয়ে সাবধানে তিনজন মানুষ নামে। জলে কাদায় মৃদু শব্দ হয়। শব্দ বাঁচিয়ে আস্তেধীরে এগোয় তারা। পচা বাশপাতায় মশার রাজত্ব। অবিরাম ভ্যানভ্যান শব্দ করছে তারা। ঝাঁক বেঁধে মানুষগুলোকে কামড়ায়। মানুষগুলো পরোয়া করে না, শব্দ করে না। তাদের তিনজনের হাতে তিনটে রামদা জ্যোৎস্নায় বিদ্যুতের মতন চমকায়।
পায়ের কাছ দিয়ে সড়সড় করে পিছলে যায় গিরিগিটি কিংবা রক্তচোষা। তিনজন মানুষ একত্রে থামে। এখান থেকে মনীন্দ্রর ঘর উঠোন সব স্পষ্ট দেখা যায়। দুএকদিন আগে পূর্ণিমা হয়ে গেছে। চাঁদের আলো এখনও ম্লান হয়নি। চরাচর ধুয়ে যাচ্ছে জ্যোত্সায়। বাঁশঝাড়ের অন্ধকার ভেঙে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে চারদিকে। তবু ঘুপটি মতন একটা জায়গা খুঁজে বসে তিনজন। মনীন্দ্রর ঘরের দিকে চোখ রেখে বসে থাকে।
কোমর থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করল মংলা। রামদাটা রাখল পায়ের কাছে। তারপর দুই সাঙ্গাতকে দুটো দিয়ে নিজেও সাবধানে ধরাল। টানতে লাগল।
মনীন্দ্রর ঘরে জনা চার পাঁচ লোক বসে আছে। মনীন্দ্র বিছানার ওপর শোয়া। কান পাতলে দু একটা টুকরোটাকরা কথার শব্দও পাওয়া যায়।
মংলা উদগ্রীব হয়ে কথা শোনে।
দূরে কোথায় তখন কী একটা পাখি ডেকে ওঠে। ঝিঁঝির ডাক তো আছেই। আর আছে। জ্যোৎস্না, চাপিলা মাছের মতন চকচকে জ্যোত্সা। বর্ষার ফলে বাঁশঝাড়ের ভেতর শোল গজার কিংবা ইঁদুরলোভী বোয়াল ঘাই দিয়ে যায়। মংলার তিনজন এসবের কিছুই খেয়াল করে না। চোরাস্রোতের মতো বয়ে যায় সময়।
মনীন্দ্রের ঘরের লোকগুলো ওঠে অনেক রাত করে। ঘাট থেকে একে একে ছেড়ে যায় অনেকগুলো নাও। মনীন্দ্র উঠে একবার বাইরে আসে। বাঁশঝাড়ের কাছে বসে, জল বিয়োগ করে যায়। মংলারা অন্ধকার হয়ে বসে থাকে। মনীন্দ্র দেখে না। চেঁচিয়ে মজিদকে বলে, যা তাড়াতাড়ি খাইয়া আয়গা মজিদ।
তারপর ঘরে গিয়ে ঢোকে।
তারও কিছু পর নাও ছাড়ে মজিদ। দূরে তার বৈঠার শব্দ মিলিয়ে যেতেই তিনজন মানুষ গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। নিঃশব্দে বাঁশঝাড় থেকে বেরোয়। জ্যোত্সায় হাতের রামদা চকচক করে তাদের।
আজ সারাদিন মনটা বড় খারাপ গেছে মনীন্দ্রের। ভোররাতে কুপাখির ডাকে ঘুম ভেঙেছে। তারপর পুজোর ঘরে কলাপাতা দেখল সনাতনী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই থেকে মনটা বড় কু ডাক ডাকছে। আজ কোনও রোগীবাড়ি যায়নি মনীন্দ্র। সারাদিন শুয়ে থেকেছে ঘরে। বিকেলবেলা পোলাপান এসেছে ধরাছি খেলতে, মনীন্দ্র দেখতেও যায়নি। সন্ধ্যের পর নিয়মিত আড্ডা দিতে এসেছে গ্রামের লোকজন। মনীন্দ্র বড় একটা কথা বলেনি। শুয়ে শুয়ে বই পড়েছে। দুএকজন জিজ্ঞেস করেছে, কত্তার কি শইল খারাপ?
মনীন্দ্র জবাব দেয়নি। আড্ডায় মজা ছিল না দেখে খানিক আগে বেরিয়ে গেছে সবাই। মজিদও গেছে খেতে। এখন এত বড় বাড়িটায় মনীন্দ্র একলা। রাত হয়েছে বেশ। একটু একটু ভয় করে মনীন্দ্রের। মজিদটা যে আজ কেন এত দেরি করছে ফিরতে।
হোমিওপ্যাথির বইটা চোখের ওপর খুলে শুয়ে থাকে মনীন্দ্র। মাথায় এক বর্ণও ঢোকে না। অকারণে বুকটা বার দুই কাঁপে।
ঠিক তখনই মৃদু পায়ের শব্দ হয় ঘরের ভেতর। চমকে চোখ তুলে তাকায় মনীন্দ্র। দেখে তিনজন মানুষ, হাতে চকচকে রামদা তাদের, মুখে কালো কাপড় বাঁধা। দেখেই বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা দ্রুত লাফিয়ে ওঠে, মুখ দিয়ে গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোয় না মনীন্দ্ররে। আনমনে ওঠে বসতে চায় সে, পারে না। তার আগেই ঘাড় বরাবর রামদা এসে পড়ে। ওক করে সামান্য একটু শব্দ করে মনীন্দ্র। তারপর বিছানার ওপরই হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
ঠিক তখুনি মনীন্দ্রর বাড়ির পূর্বকোণের বিশাল দেবদারু গাছে বসে প্রাচীন কোড়লপাখিটা কুউক কুউক করে বাগ দিয়ে ওঠে। পাশের বাড়ির বুড়ি আতবী স্বামীর বুকে আদা তেল মালিশ করতে করতে টের পায় নিজের বুকেও মৃদু একটা ব্যথা হচ্ছে। তার। দূর দামলায় একা ঘরে শুয়ে ঘুমের ভেতর কেঁদে ওঠে টুকি। মজিদ গান গাইতে গাইতে ফিরে আসছিল, আমার এমুন জনম আরকি হবে, মানুষ দেখতে এসেছিলাম ভবে। হঠাই গলা আটকে যায় মজিদের। কেউ ঠিকঠাক বোঝে না এসবের কী অর্থ। হায়রে মানুষ!
জোয়ারের দিন
টুপটাপ টুপটাপ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সারাদিন ধরে হচ্ছে। সারারাত ধরে হচ্ছে।
