মনীন্দ্র তারপর বিছানা ছাড়ে।
সারারাত মাথার কাছে হারিকেন জ্বলে। ঘরের ভেতর নিবু নিবু হারিকেনের পাতলা আলোটা আছে। সেই আলোয় সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো লাগে।
দরোজা খুলে বাইরে যায় মনীন্দ্র। বাইরে তখন শেষরাতের মিহিন জ্যোৎস্না পড়ে আছে। গাছপালার দীর্ঘ ছায়া পড়ে আছে। তুলতুলে একটা বাতাস আছে, বাতাসটা টুকির হাতের মতো মায়াময়। বেরোতেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। শরীরটা কেঁপে ওঠে মনীন্দ্রের। মনীন্দ্র খানিক আনমনা হয়ে থাকে। খেয়াল করে শোনে চারদিকের গাছপালায় ঝোপঝাড়ে ডাকছে ঝিঁঝি পোকা। দূরে কোথায় ডাকছে কী একটা পাখি। কি পাখি! শেষ রাতে ডাকে!
মনীন্দ্র খেয়াল করে পাখির ডাকটা শোনে। কু কু করে থেকে থেকে ডাকছে। কুপাখি। পাখিটা চিনতে পেরেই চমকে চমকে ওঠে মনীন্দ্র। শরীরটা শীতকালের জলে নেমে যাওয়ার মতন বারকয়েক কেঁপে ওঠে তার। এই পাখিটা অশুভ। মানুষকে মৃত্যুর ডাক দিয়ে যায়। বুকটা তারপর কাঁপতে থাকে মনীন্দ্রের। সনাতনীর কথা মনে পড়ে। সনাতনী মারা গেছে ত্রিশ বছর। স্বামীর ভালোবাসা পায়নি, সেই দুঃখে কচি বয়সে গায়ে আগুন দিল। সনাতনীর জন্যে আজকাল যখন তখন কীরকম একটা দুঃখ হয় মনীন্দ্রের। নিজেকে বড় অপরাধী লাগে, বড় পাপী মনে হয়।
বইলাঅলা খড়মে চটর চটর শব্দ করে উঠোনে নামে মনীন্দ্র। খালি গা, গলায় পৈতে। দূরে কুপাখিটা তখনো ডাকছে। মিহিন জ্যোৎস্না আর গাছপালার অন্ধকারে তুলতুলে বাতাস সেই ডাক ছড়িয়ে দিচ্ছে দিকবিদিকে। এ ডাক মৃত্যুর ডাক। কার মরণডাক ডাকে পাখি!
মনীন্দ্র ডান হাতে পৈতেটা চেপে ধরে বিড় বিড় করে কৃষ্ণ নাম জপে। তারপর আস্তে ধীরে হেঁটে যায় পুজোর ঘরের দিকে।
চারদিক খোলা চৌচালা ঘর। কিন্তু ঘরের মাঝখানে সাদা শাড়ি পরে কে অমন করে দাঁড়িয়ে আছে! চমকে ওঠে মনীন্দ্র। সনাতনী! চিৎকার করে সনাতনীকে ডাকতে যায় মনীন্দ্র। তার আগেই বুঝতে পারে ঘরের পেছন দিককার কলাঝোপের ওপর জ্যোৎস্না পড়ে মানুষের অবয়ব ধরেছে। সেই ছায়াটা এসে পড়েছে পুজোঘরের মাঝখানে।
আগে ভুল দৃশ্য দেখলে হাসত মনীন্দ্র। আজ হাসি পায় না। বুকের ভেতরটা কাঁপে। সনাতনীকেই যেন দেখল সে। কলাগাছের পাতার ভেতর কীরকম যেন মিলিয়ে গেল। সনাতনী কি তাকে ডাকতে এসেছিল?
ভয় করে মনীন্দ্রর। তিন কুড়ির ওপর বয়েস হল, আর কতকাল!
রান্নাঘরে তখনও নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে মজিদ। দূরে মোরগের বাগ, কোড়লের বাগ। আস্তে ধীরে জাগছে পৃথিবী, জীবজন্তু, গাছপালা। কুপাখিটা আর ডাকে না। মিহিন জ্যোৎস্না গুটিয়ে নিয়েছে চাঁদ। গাছপালা থেকে অন্ধকার কাটতে শুরু করেছে। আর একটি দিন শুরু হল। কিন্তু মনীন্দ্রের আজ ভাল্লাগে না। মনটা কু ডাক ডাকে।
.
দুপুর থেকেই সাঙ্গাত নিয়ে বসেছে মানুষটা। সাঙ্গাতরা গাঁজা ডলছে আর কল্কিতে ভরছে, মানুষটা হরদম টেনে যাচ্ছে। একফাঁকে ডেকে ভাত খাইয়ে দিয়েছে টুকি। মংলা কী উঠতে চায়! টুকি হাত ধরে গাঁজা টেনে এনেছে, ভাত খাইয়া লও। তার বাদে যত ইচ্ছা গাঁজা টাইন্নো। মংলা তবু উঠতে চায় না দেখে তার সাঙ্গাত নশা একটু ঠেলা দিয়ে জড়ানো গলায় বলেছে, যাও ওস্তাদ, বাত খাইয়া আহ। বউ আদর কইরা ডাকতাছে!
টুকির সংসারে আরো দুজন মানুষ আছে। শ্বশুর শাশুড়ি। তারা ধাইধা গেছে মেয়ের বাড়ি বেড়াতে। কদিন পর ফিরবে তার ঠিক নেই। শাশুড়ি বাড়ি থাকলে মানুষটা বাড়ির ভেতর বসে এরকম রাতদিন গাঁজা টানতে পারত না। শাশুড়ি ঝাড়ু নিয়ে যেত পেটাতে।
টুকি অতটা পারে না। মংলা বদরাগী মানুষ। লেংড়াখোঁড়া মানুষরা একটু বদরাগীই হয়। তাছাড়া টুকির এখন শরীর ভারি, আট মাস চলছে। আগে হলে বাচ্চা মেয়ের মতন জোর করতে পারত। এখন পেটের ভারে চলাচল ধীর হয়েছে টুকির। লাফঝাঁপ বন্ধ হয়েছে। তবু মংলাকে হাত ধরে টেনে নিয়েছে ভাত খেতে।
খাওয়া শেষ করে মংলা আবার বসেছে গাঁজার আড্ডায়। চোখ দুটো এখন কোড়াপাখির চোখের মতন লাল দেখাচ্ছে তার। টুকি পাটাতন ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখেছে। তারপর পাটাতনের ওপর হোগলা বিছিয়ে শুয়ে পড়েছে। আজকাল যখন তখন ঘুম পায় টুকির। ক্ষণে ক্ষণে অবশ হয়ে আসে শরীর। বিলকুমড়োর মতন পেটটা বেজায় ভারি, বইতে কষ্ট হয়।
টুকির কী হবে, ছেলে না মেয়ে! একটা ছেলের ভারি শখ টুকির। মনীন্দ্রের মতন টুকটুকে ফর্সা, বড় বড় চোখ, দামাল প্রকৃতির একটা ছেলে যদি টুকির হত!
হবে না। টুকির পেটে তো এখন মনীন্দ্ররটা নয়, মংলারটা। ছেলে হোক মেয়ে হোক মংলার মতনই হবে দেখতে। ভূষিকালো, নাক থ্যাবরা। আবার লেংড়াখোঁড়া না হয়! এই ভয়ে দিনরাত সিঁটিয়ে থাকে টুকি। ছেলে বা মেয়ে যাই হোক মংলার মতন লেংড়া খোঁড়া যদি হয়, এই ভয়ে কেবল ঘুম পায় টুকির।
.
বিকেলের দিকে মংলার ডাকে ঘুম ভাঙে টুকির। ওড বউ, বেইল গেল।
টুকি ধড়ফড় করে উঠে বসে! অনেকক্ষণ ঘুমোবার ফলে চোখ দুটো ফুলে গেছে। তবু খেয়াল করে মংলাকে দেখে। কালো শরীরে কালো রঙেরই পিরান পরেছে, কোমরে লাল গামছা বাঁধা। দেখেই টুকি বোঝে সাঙ্গাত নিয়ে মংলা কোথাও বেরুচ্ছে।
টুকি জিজ্ঞেস করে, কই যাইতাছ?
মংলা বলল, মেদিনীমোণ্ডল যামু।
নিজ গ্রামের নাম শুনে টুকি একটু চমকায়। তারপর খুশি হয়ে বলল, আমারে নিবা? ইট্টু বেড়াইয়া আইতাম!
