টুকির বিয়ে হয়ে গেলে তখন কে নিয়ে শোবে কী করে মনীন্দ্র।
কিন্তু একটা কথা ভেবে মজিদ বড় ভয় পায় আজকাল। টুকির যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, মংলা, দামলার সর্দার বাড়ির পোলা। সর্দাররা ডাকাতের বংশ। মংলা যদি জানতে পারে টুকি মনীন্দ্রর সঙ্গে শুত, তাহলে পয়লা টুকিকে তারপর মনীন্দ্রকে কচুকাটা করবে। আল্লারে কী যে হবে তাহলে!
মজিদ আর ভাবতে পারে না। বুকের ভেতর বর্ষার দামাল বাতাস ঢুকে যায়।
.
বাড়ি এসে মজিদ খুব অবাক। বুড়ো বাপ মা, জোয়ান ভাই দুটো হাত-পা ছাড়িয়ে বসে আছে। ঘাটে নৌকা বাঁধতে দৃশ্যটা দেখে মজিদ। টের পায় ঘরে দানাপানি নাই। মেজাজটা বিগড়ে যায় তার। বর্ষাকালটা এরকমই যায় তাদের। ভাই দুটোর কাজকাম থাকে না। বুড়ো বাপের তো শীতকাল ছাড়া কখনোই কাজকাম নেই। সারা বছর অবসর। শীতকালে তবু যাহোক দু চারটে কামকাজ পায় এখনো। বুড়োমানুষ, চোখে ভালো দেখে না। লোকেরা মুসলমানির কাজকাম আজকাল তাকে দিয়ে করতে ভয় পায়। কান্দিপাড়ার আফাজদ্দি খনকারের ছোট পোলাটার মুসলমানি করাল গেলবার। ঘা শুকোয় না পোলাটার। একমাস দেড়মাস সময় নিল। খনকার তাই নিয়ে ম্যালা গালাগাল করেছিল বাপটাকে।
বাপটা নিজেও আজকাল আর সাহস পায় না। বয়স হয়েছে হাত পা কাঁপে। এক চোখে ছানি পড়েছে। তাছাড়া কাজিরপাগলায় সরকারি ডাক্তারখানা হয়েছে, লোকে আজকাল সেখানেই যায়। এসব ভাবলে মজিদের বড় মন খারাপ হয়। মজিদ খুবই সরলসোজা মানুষ। কোন ঝুটঝামেলায় সে নেই। পছন্দও করে না। মজিদ কখনও আগামীকালের কথা ভাবে না, গতকালের কথা ভাবে না। সে আছে আজকের দিনটি নিয়ে। মনীন্দ্রর বাড়ি কাজ করে যা পায় বাড়ি এসে বুড়োবুড়ির হাতে তুলে দেয়। তাছাড়া যখন যা হাতের কাছে পায়, মনীন্দ্রের বাড়ির চালটা ডালটা, আনাজটা চুরি নিয়ে আসে। সংসারে জন্যে এত যে করছে, তারপরও দুবেলা ঠিকঠাক মতন আহার না জুটলে মন খারাপ হবে না!
ঘাটে নৌকা বেঁধে উঠোনে ওঠতেই প্রথমে জ্বলজ্বলে চোখে মজিদের দিকে তাকাল বুড়ো মা বাবা, তারপর আবালের মতন ড্যাবড্যাবা চোখে জোয়ান ভাই দুটো। মজিদ ভেবেছিল একটু রাগারাগি করবে, বলবে, আমি কত টানুম তগো। টানতে টানতে মইরা যামু। আমারে তরা মইরা যাইতে কচ!
কিন্তু মুখগুলো দেখে কীরকম মায়া লাগে বলা হয় না।
মজিদ আবার নৌকায় চড়ে। রবাকে ডেকে বলে, বিয়ালে যাইচ।
কেমন করে যাবে রবা তা জানে। কোনও কথা বলে না। খুশিতে চারজন মানুষের চোখ এখন ঝলসাচ্ছে মজিদ বুঝতে পারে। রাতের বেলা গরমাগরম ভাত খাবে। রবা হয়তো এখন পুঁটি-টেংরাও যোগাড় করে ফেলবে কিছু।
মজিদের একটি দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
.
বিকেলবেলা ধরাছি খেলা হয় ঠাকুরবাড়ি। বর্ষাকাল, মাঠঘাট সব জলের তলায়। গ্রামের ছেলেপান সব ধরাছি খেলার মাঠ পেয়ে ঠাকুরবাড়ি ভিড় করে। মনীন্দ্রও উৎসাহ দেয় তাদের। হাতাঅলা চেয়ার নিয়ে বসে খেলা দেখা। কত মানুষজন, কত নাও, কত কোষা! হল্লাচেল্লা। মজিদ এই বিকেলবেলাটা ঘরের কাজকাম করে কাটায়। উঠোন ঝাড়ু দেয়, ওষুধের আলমারি গুছিয়ে রাখে আর চোরা চোখে রান্নাঘরের বাড়তি জিনিসপত্র দেখে। কোনটা সরালে মনীন্দ্র টের পাবে, কোনটা সরালে পাবে না। ঠিক তখনি রান্নাঘরের পেছনদিককার জলে টাবুরটুবুর শব্দ হয়।
মজিদ বুঝতে পারে রবা এসেছে। কোনও কথা বলে না সে। দূরে গাছপালার আড়ালে ধরাছি খেলার মাঠটা একবার তাকিয়ে দেখে। খেলা খুব জমে গেছে। এখন এদিকে ভুলেও কেউ আসবে না। মজিদ আস্তেধীরে রান্নাঘরের পেছন দিকে যায়। সেখানে হাজার রকমের আগাছা জলের ওপর ভেসে আছে।
প্রথমে রবাকে চোখে পড়ে না মজিদের। কালো শরীরটা আগাছার জঙ্গলে ডুবিয়ে বসে আছে। দেখলে মনে হয় নিজেও আগাছা হয়ে গেছে রবা।
মজিদকে দেখে ঝোপের ভেতর থেকে গলা বের করে রবা। মজিদ কোনও কথা বলে না। আস্তে করে ডান হাতটা রবার দিকে বাড়িয়ে দেয়। রবা মাটির বিরাট একটা হাঁড়ি ঝোপের ভেতর থেকে টেনে বের করে মজিদের হাতে দেয়। মজিদ সাবধানে চারদিকে চায়।
তারপর রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে।
ঠাকুরের চাল থাকে কাঠের মাঝারি ধরনের একটা পিপায়। প্রায় ভর্তিই থাকে পিপা। আজও ছিল। মজিদ ঘরে ঢুকে দ্রুত আধ হাঁড়ি চাল ভরে রবার হাতে নিয়ে দেয়। দেখে রবা ভারি খুশি। দাঁত কেলিয়ে একটু হাসে। তারপর হাঁড়িটা জলের ওপর দিয়ে ঠেলে আস্তেধীরে মিলিয়ে যায়। রান্নাঘরের পেছনে মজিদ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। বুক কাপিয়ে ভারি দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার।
.
ভোররাতে ঘুম ভাঙে মনীন্দ্রের। জেগে প্রথমে বুঝতেই পারে না জেগে আছে না ঘুমিয়ে। আজকাল প্রায়ই এরকম হয়। রাতের বেলা হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙার পর অনেকক্ষণ বুঝতেই পারে না ঘুমিয়ে আছে না জেগে। কেন যে এরকম হচ্ছে। বয়স! মৃত্যুর কথা মনে হয় মনীন্দ্রের। তিন কুড়ির ওপর বয়স হল, আর কতকাল, আর কতকাল বেচে থাকবে মনীন্দ্র! মানুষ কতকাল বাচে। আয়ুর সুতো কতটা লম্বা মানুষের! ঘুম ভাঙার পর আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না মনীন্দ্রর। রান্নাঘরে শুয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে মজিদ। চারদিকের পৃথিবীতে কোনও শব্দ নেই। এই সময় জীবজগতের বেশির ভাগ প্রাণীই ঘুমোয়। ঘুমোয় গাছপালা। জেগে থাকে কীটপতঙ্গ, রাতচরা পাখি, ঝিঁঝি পোকা। যাদের বিষয়কর্মের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর প্রচুর ব্যবধান।
