আতবী জলে নামে।
ওপারে এসে শাড়ি পরতে পরতে পুরোনো দিনের কথা খুব মনে পড়ে আতবীর। কত দিন পালিয়ে মনীন্দ্রর কাছে এসেছে সে। রাতেরবেলা, দিনেরবেলা। এখন অনেককালের পুরনো স্মৃতি ভাবতে ভালো লাগে। আজও লাগল। শরীরের ভেতরটা বহুকাল পর চনমন করে উঠল আতবীর। মনীন্দ্র যদি আজও খাটে ওঠতে বলে আতবীকে।
আস্তেধীরে উঠোন পার হয়ে মনীন্দ্রের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আতবী। দরোজা খোলা, ভেতরে খাটের ওপর শুয়ে আছে মনীন্দ্র। চোখের সামনে ধরা বই। সবকিছু উঠোন থেকেই দেখা যায়।
দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে খুক করে একটু কাশে আতবী। শুনে চোখের ওপর থেকে বইটা সরায় সনীন্দ্র। শুয়ে থেকেই আতবীর দিকে তাকায়। হাঁটুর ওপর উঠে যাওয়া ধুতিটা টেনে নামাতে নামাতে বলে, আহ। ঘরে আহ।
আতবী কথা বলে না। ঘরে ঢোকে।
ততক্ষণে উঠে বসেছে মনীন্দ্র। আতবীকে বলল, বলো।
আতবী কোনও কথা বলেছিল না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনীন্দ্রকে দেখছিল। তিন কুড়ির ওপর বয়স মানুষটার, কিন্তু এখনো কেমন বয়সকালের পুরুষ মানুষের মতন দেখায়। স্বাস্থ্য চেহারা সব আগের মতনই আছে মনীন্দ্রর। টকটকে ফর্সা গায়ের রঙে একটুও ময়লা লাগেনি। একটাও চুল পাকেনি। ডাক্তার কবরেজ মানুষ, ওষুধবিষুধ খায়, ফলদুধ। খায়, স্বাস্থ্য ভালো থাকবে না কেন!
মনীন্দ্র বলল, শইল ভিজা ক্যা?
আতবী মাথা নিচু করে হাসে। পানি ভাইঙা আইছি।
কী মনে কইরা আইলা?
এই কথাটা মনীন্দ্র বলে সামান্য রসিকতা করে। শুনে বুড়ো বয়সেও শরীরের ভেতর চনমন করে ওঠে আবীর। বয়সকালে এই সুরেই কথা বলত মনীন্দ্র।
আতবী বললো, টুকির বাপের খুব কাশ। কাশতে কাশতে মইরা যায়।
ওষুধ দিমু?
না। তাইলে বুইজ্যা যাইবে আমি আইছিলাম।
শুনে মনীন্দ্র একটু থামে। তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, আদা তেল গরম কইরা পিডে ডইল্লা দিও।
তারপর কেউ কোনও কথা বলে না। আবার সব চুপচাপ। আতবী বসে থাকে লম্বা বেঞ্চের এক কোণে। মনীন্দ্রের বাড়িটা বড় নিঝুম হয়ে আছে। বর্ষার জলে গাছপালা রোদেলা দুপুরে বয়ে যাচ্ছে। মিহিন একটা ঝিমমারা শব্দ উঠছে চারদিকে পৃথিবীর থেকে। দুটো বয়সী মানুষ। মুখোমুখি বসে থাকে, কত কী যে মনে হয় তাদের, তবুও কেউ কোনও কথা বলে না।
এক সময় উঠে দাঁড়ায় আতবী। যাইগা।
মনীন্দ্র বলে, তুমি এক্করে বুড়ি অইয়া গেছ।
শুনে হাসে আতবী। বয়েস কি কম অইল?
মনীন্দ্র আর কথা বলে না। আবার শুয়ে পড়ে বিছানায়। আতবী উঠোনে নেমে আস্তে ধীরে হেঁটে যায়। ভারী একটা দুঃখ হয় তার। মনীন্দ্রে বলল বুড়ি হয়ে গেছে আতবী। এজন্যে তাকে ছুঁয়েও দেখল না। বয়সকালে কাছে গেলেই আতবীর শরীর ঘাটত মনীন্দ্র। আজ তার বয়স নেই, এজন্যে মনীন্দ্র তাকে ছুঁয়েও দেখল না। ভেবে বুক ফেটে যায় আবীর। মনীন্দ্রকে দেখে বহুকাল পর কামভাবটা জেগেছিল। কিন্তু আতবীকে দেখে মনীন্দ্র তা বুঝল না। গভীর গোপন দুঃখ কিংবা অভিমানে বুক ফেটে যায়। আতবীর। চোখ ফেটে যায়। জলে নেমে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদে আতবী। মানুষের শরীর নদীর জোয়ার ভাটা, মানুষ তা বোঝে না। হায়রে মানুষ!
.
মেন্দাবাড়ির ঘাটে নৌকা বেঁধে নাইতে নেমেছে মজিদ। জল তোলপাড় করে সাঁতার কাটছে আর গলা খুলে গান গাইছে। মনীন্দ্রর মুখে শোনা গান। আমার এমন জনম। আর কি হবে। সঠিক উচ্চারণ জানে না মজিদ, শব্দে ভুল হয়। তবুও গায়। বড় আমুদে মানুষ। মনীন্দ্রর সামনে ভয়ে বসে থাকে, আড়ালে এলেই রাজা। গান গায়, হাসে, কাঁদে। এই যেমন এখন মোবাড়ির পোলাপান সব ঘাটে এসে দাঁড়িয়েছে। মজিদকে দেখলেই হৈহৈ করে ছুটে আসে সবাই, হাততালি দেয়। তাতে মজিদ বড় আমোদ পায়। জলে নেমে এখন কত রকমের যে কসরৎ দেখাচ্ছে! মাছের মতন ডুব দিয়ে বহুদূরে চলে যাচ্ছে। তাই দেখে মেন্দাবাড়ির পোলাপান বড় খুশি।
অনেকক্ষণ ডুবোডুবি করে পাড়ে ওঠে মজিদ। নৌকার আগায় বসে লাল গামছায় বিরাট শরীরটা মোছে। ছইয়ের ভেতর থেকে শুকনো লুঙি বের করে পরে। তারপর ভেজা লুঙিটা ছইয়ের ওপর মেলে দিয়ে নৌকা ছাড়ে। দুপুর গড়িয়ে গেছে, পেটের ভেতর বিষম খিদে। আজ বড় খাটাখাটরি গেছে মজিদের। মনীন্দ্রকে নিয়ে চার পাঁচটা গ্রাম ঘুরেছে। মাওয়া জশিলদিয়া কান্দিপাড়া। লগি ঠেলে হাতের ড্যানা ব্যথা হয়ে গেছে।
আর মনীন্দ্র হচ্ছে অদ্ভুত মানুষ। রোগীবাড়ি ঢুকলে বেরুতে চায় না। পান খাবে, গালগল্প করবে। দুনিয়ার মেয়েমানুষের সঙ্গে খাতির মনীন্দ্রের। লোকটা বোধহয় বশীকরণ মন্ত্রও জানে। এতটা বয়েস হল, তবুও মেয়েমানুষের দোষটা গেল না। দেখলেই কুত্তার মতন ছোঁক ছোঁক করে।
মনীন্দ্রের অবশ্য এই একটাই দোষ। এমনিতেই মানুষটা ভালো, দিলদরিয়া আমুদে। গ্রামের সব উৎসব আনন্দে মনীন্দ্রই খরচাপাতি করে বেশি। পয়লা বৈশাখে, গলুইয়ার দিন যে তার বাড়ি যাবে, তাকেই ভরপেট মিষ্টি খাওয়াবে। যাত্রাথিয়েটারেও বেশি চাঁদা দেয় মনীন্দ্র। রাত জেগে পোলাপানের সঙ্গে নাটকও করেছে গেল বছর। মেদিনী মণ্ডলের এমন কোনও মানুষ নেই যার কাছে টাকা না পায় মনীন্দ্রে। সমেদের সংসারটাই তো চলেছে মনীন্দ্রর ওপর দিয়ে। তিন মেয়ের বিয়ে দিল সমেদ, সব মনীন্দ্রর টাকায়।
কিন্তু রসটা আদায় করে নিয়েছে মনীন্দ্র। মেয়েগুলোর রাখেনি কিছু। মজিদ সব জানে। টুকির তো বিয়েই বন্ধ করে রেখেছিল মনীন্দ্র। কিছু তুকতাকও জানে সে। টুকির বিয়ে হয় না বিয়ে হয় না। দিন যায়। টুকির সম্বন্ধ আসে, ভেঙ্গে যায়। সব মনীন্দ্রর কারসাজি।
