বাড়ি ফিরতেই আতবী ধরেছে, গ্যাছেলা?
সমেদ কাশতে কাশতে বলেছে, না।
ক্যা?
সমেদ আর কথা বলেনি।
আতবী আবার বলেছে, কাশতে কাশতে তো মইরা যাইবা!
শুনে খ্যাকিয়ে উঠেছে সমেদ, মরলে মরমু।
আতবী তারপর আর কোন কথা বলেনি।
মনীন্দ্রকে দুচোখে দেখতে পারে না সমেদ। কারণটা আতবী ঠিক জানে না। আঁচ করে তার ব্যাপারটা সমেদ জানে। পরী নুড়ি টুকির ব্যাপারও জানে। হাজার হোক পুরুষ তো। স্বামী হয়ে, বাপ হয়ে, ঘরের বউ মেয়েদের পরপুরুষের সঙ্গে শোয়ার কথা জেনে সেই মানুষকে দেখতে পারবে কেমন করে!
এসব ভেবে ভেতরে ভেতরে রাগও হয় আবীর। বউমেয়েদের যে পুরুষ দুবেলা খাওয়াতে পারে না, তার অত তেজ থাকবে কেন!
মুখে বলে না কিছু। বয়স হয়ে গেছে, ঝগড়াঝাটি ভাল্লাগে না আজকাল। চেপে থাকে আতবী। সব চেপে থাকে। অবশ্য দশ বছর আগে হলে নিজেই মনীন্দ্রর সামনে গিয়ে দাঁড়াত। স্বামীর জন্যে ওষুধ, আর নিজের জন্যে আনত কিছু গোপন সুখ।
কিন্তু আজ আর যাওয়া যায় না মনীন্দ্রের কাছে। বয়স হয়ে গেছে। কাম নেই।
কিন্তু মনীন্দ্রর কথা মনে হলে মনটা এখন বড় আনচান করে। বড় ভালো মানুষটা, বড় দরদী। আতবীর সংসারটা মনীন্দ্রই চালিয়েছে বারো আনা। সমেদের যা রোজগারপাতি তাতে সারাবছর এক বেলা করেও খাওয়া হত না। মনীন্দ্র চালটা ডালটা দিয়েছে, টাকাটা পয়সাটা দিয়েছে। নিয়েছে খুব কম। মেয়েগুলো বড় হওয়ার আগে আতবীকে ওঠতে হত মনীন্দ্রের খাটে। পরী নুড়ি টুকি বড় হয়ে মাকে হাছিব দিয়েছে। ক্ষতি কী! যে মানুষটা তাদের জন্য এত কিছু করেছে, তার জন্যে কিছুই তারা করবে না! পেটের চেয়ে ইজ্জত বড় হল!
সমেদকে এসব বুঝিয়ে বলা যায় না। বড় হিংসুটে মানুষ। তার সংসারের জন্যে যে এতকিছু করেছে মনীন্দ্র, সেসব সমেদ শুনতে চায়না। আতবী জোর দিয়ে কিছু বললে তেড়ে আসে মারতে। বুড়ো বয়সেও জেদ কমেনি মানুষটার। এখন পুবের ঘরে বসে কিরকম খুক খুক করে কাশছে। কেশে কেশে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। কাশি থামলেই মুখ হা করে অনেকক্ষণ ধরে শ্বাস টানবে। বুকের হাড়পাঁজরা শ্বাস টানার তালে তালে নড়বড় নড়বড় করবে। দেখলে মায়া হয়। কিন্তু আতবী কী করবে। মন্দ্রির কাছে সমেদ যাবে না। মরে যাবে। তবুও না।
.
টুকির মা, ও টুকির মা!
কোন ফাঁকে থেমে গেছে সমেদের কাশি। এখন আতবীকে ডাকছে সে।
রান্নাঘরে বসে দেয় আতবী, কী?
আমারে ইট্টু তামুক দেও।
দিতাছি।
তারপর আবার সব চুপচাপ।
সমেদের কাশির শব্দ না থাকলে বাড়িটা বড় নিশ্ৰুপ হয়ে যায়। চারদিকে বর্ষার জল, গাছপালা, বাড়িতে বুড়োবুড়ি দুজন মাত্র মানুষ। কথা বলার লোক নেই,শব্দ উঠবে কোত্থেকে! অনেকক্ষণ ধরে যত্ন করে তামাক সাজায় আতবী। সংসারে তেমন কোনও কাজকাম নেই। বুড়োবুড়ির সংসার, একবেলা দুটো রান্না করলে দিনমান চলে যায়। বাকি সময়টা উঠোনে বসে থাকে আতবী। হঠাৎ সমেদ ডাকে, তামাক দিতে বলে। একটা কাজ পায় আতবী। অনেকক্ষণ ধরে যত্ন করে তামাক সাজে। ফুঁ দিয়ে দিয়ে টিকা জ্বালায়। তারপর নিজে খানিক টেনে ধোঁয়া। উঠিয়ে সমেদের হাতে নিয়ে দেয়। সমেদ মনোযোগ দিয়ে তামাক টানে। টানার তালে তার বুকের হাড়পাঁজরা নড়বড় করে। দেখে বুড়ি আতবী ভেতরে ভেতরে কাপে।
মানুষটা মরে গেলে বিধবা হয়ে যাবে আতবী। ভেবে বড় কষ্ট হয়। বিধবা হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরণ ভালো।
এসব ভেবে আবার সমেদকে অনুনয় করে আতবী। হুনছ, একবার যাও ঠাকুরের কাছে।
হুঁকা নামিয়ে ঘোলা চোখে আতবীর দিকে তাকায় সমেদ। তাকিয়ে থাকে। আতবী দেখে মানুষটার চেহারায় ক্রোধ জ্বলছে। যে কোনও সময় ফেটে পড়বে। বয়স হয়েছে, ঝগড়াবিবাদ ভাল্লাগে না। আতবী আস্তে ধীরে উঠোনে নামে। মনে মনে গালাগাল দেয় সমেদকে। মরুগগা গোলামে। আমার কী!
.
দুপুরের পর কাশতে কাশতে কোষা নাও নিয়ে বেরয় সমেদ। বিলে যাবে। আতবী বসে ছিল উঠোনের কোণে। সমেদ একবার তাকাল আতবীর দিকে। কথা বলল না। আতবীও বলল না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল ছোট্ট বৈঠা বেয়ে গাছপালার আড়ালে আস্তে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে মানুষটা। দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল আবীর। মানুষ মরে গেলে আর ফিরে আসে না। এই মানুষটা কাশতে কাশতে মরে গেলে আর কোনদিন ফিরে আসবেনা। আতবী যাবে বিধবা হয়ে।
এসব ভেবে হঠাৎই লাফিয়ে ওঠে আতবী। সমেদ বিলে গেছে, ফিরতে অনেক সময়। এই ফাঁকে মনীন্দ্রর সঙ্গে একটু দেখা করে এলে হয়। সমেদের জন্যে খাওয়ার ওষুধ আনা যাবে না। আনলেই বুঝে যাবে আতবী মনীন্দ্রর কাছে গিয়েছিল। আরেক অশান্তি দেখা দেবে। ঝগড়া বিবাদ হবে। কিন্তু মনীন্দ্রকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললে ব্যবস্থা দিয়ে দেবে মনীন্দ্র। ব্যবস্থামতন কাজ করলে কাশি সেরে যাবে সমেদের। ভেবে আতবী খুব খুশি। বাড়ির পেছন দিক দিয়ে মনীন্দ্রর সীমানায় গিয়ে দাঁড়ায়।
সমেদের বাড়ির পরই জংলামতন খানিকটা জায়গা। কানিখানেক হবে। আগাছায় ভরে আছে জায়গাটা সেখানে এখন বর্ষার জল। সমেদ কোষা নিয়ে গেছে। আতবী এখন। পার হবে কেমন করে।
জলের ধারে দাঁড়িয়ে দুএক মুহূর্ত কী ভাবে আতবী। তারপর পরনের শাড়িটা পুরোপুরি খুলে হাতে নেয়। ওপারে গিয়ে পরে নিলেই হবে। কেউ তো আর দেখছে না। তাদের বাড়িতেও কেউ নেই। মনীন্দ্রর বাড়িতেও মনীন্দ্র ছাড়া আর কেউ নেই। এই দুপুরবেলা মনীন্দ্রর কাছে কোনও রোগী আসে না। উলঙ্গ আতবীকে দেখলে মনীন্দ্রই দেখতে পারে। সে তো কতই দেখেছে। মনীন্দ্রর কাছে আর লজ্জা কী!
